অজ্ঞাত

৪২।।
নন্দনের বুকে নন্দিত দুজন , নিজস্বীর মধ্যে হারিয়ে যাওয়া দুজন এখনো বোঝে নি , কিভাবে দিনটা পেড়িয়ে যাচ্ছে । স্রোতের গা বেয়ে তারাও চলেছে । ক্লান্তি তাদের কিছুতেই গ্রাস করতে পারে নি আজ , আর পারে নি বলেই হয়তো অজ্ঞাত থেকে জ্ঞাত হতে পারেনি তারা । বেলা বাড়ছে আর ইঁদুর দৌড় শুরু হয়ে যাচ্ছে অন্তরে ।
এমনই এক অবস্থায় সত্যবতী আর সন্দীপন এসে বসলো রবীন্দ্রনাথের মূর্তির তলায় , দেখলে মনে হতে বাধ্য শিষ্য আর গুরুর আলাপ বিলাপের গল্প । গুরুদেব যেন ভালোবাসা শিখিয়ে দিচ্ছে তাদের । এরই মাঝে সত্যর মাথা এসে সন্দীপনের কাঁধ স্পর্শ করতেই , সে বুঝতে পারলো সত্য নিদ্রার কবলে । তাই হালকা ঝাকুনি দিল আর এতেই কোনমতে চোখ খুলে তাকালো সত্য আবার । তারপর মুখটা কানের কাছে নিয়ে এসে আস্তে করে বললো ,
—– খুব খিদে পেয়েছে । ঔধ ১৫৯০ এ যাবো । একটা ক্যাব বুক করো না গো ।
এইটুকু বলে সত্যবতী , সন্দীপনের গলা জড়িয়ে ধরে আবার চোখ বন্ধ করে নিল ।
—– ওই সত্য ওঠো এবার । আমরা রেস্টুরেন্টে এসে গেছি ।
সন্দীপনের গলার স্বরে উঠে বসলো সত্যবতী এবার । দুটো হাই তুলে দরজা খুলে এগিয়ে গেল সে হোটেলের দিকে । কালীঘাটের কাছেই অবস্থিত রেস্টুরেন্টটি বেশ পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী । ভেতরটি বেশ পরিষ্কার , পরিচ্ছন্ন আর খাওয়া দাওয়া ; সে এক এলাহি ব্যাপার । বসার জায়গাগুলি এক একটি বড় সিংহাসন আর সামনের টেবিলে মুঘল বাবুর্চিরা মোগলাই পরিবেশন করে চলেছেন । সত্যবতী আর সন্দীপন পাশাপাশি দুটি জায়গা দখল করে বসে পড়লো আর তারপর ভোজ পালা সাঙ্গ না হওয়া পর্যন্ত চললো নানা খুনসুটি , হাসি আর অবশ্যই নিজস্বী । বিল পে করে রেস্টুরেন্টের দরজা ঠেলে বেরোবার মুখে সত্য হঠাৎই সন্দীপনকে পিছন থেকে টেনে নিয়ে হাত টা হাতের শৃঙ্খলে বেঁধে নিল আর তারপর গুটি গুটি পায়ে , পা মিলিয়ে চলতে চলতেই বলে উঠলো ,
—– আমি সারাটা পথ ঘুমিয়ে ছিলাম , তাই না ? আর তুমি হাতটা লম্বা করে মাথায় বালিশের মত রেখে দিয়েছিলে। তাই তো ?
সন্দীপন বিশেষ কিছু বললো না , শুধু হু বলে এগিয়ে চললো ।
সত্যবতী অবশ্য নিজের খেয়ালেই বলে চললো ,
—— একা পেয়েছিলে আজ আমায় । সুযোগ নিতেই পারতে । কিন্তু কোন সুযোগ নাওনি তুমি । উল্টে আমার জন্য নিজেকে কষ্ট দিয়ে গেছো ।
সন্দীপন বেশ অবাক হয়ে কথাগুলো শুনছিল , তবে একটা ধর্মতলাগামী বাস চলে আসায় সে মুহূর্তে কোন উত্তর দিলো না ।
বাসের ভিতর আজ বেশ ফাঁকা । পিছনের কোনার সিটে দুজন পাশাপাশি গিয়ে বসলো । সন্দীপনের মুখে কোন কথা নেই । বেশ কিছু দূর যেতে না যেতেই সত্যবতী একই প্রসঙ্গ আবার পেস করলো । সন্দীপন তখন ভাড়া মেটাতে ব্যস্ত থাকায় কোন উত্তর দিলো না আবার । তবে কিছুক্ষণ পর সত্যের দিকে ফিরে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে উঠলো ,
—– ভালোবাসা মানেই কষ্ট । ভালোবাসা মানেই বেদনা । সুযোগ নিলে তো ভালোবাসা হতো না । জীবন সঙ্গী হিসেবে যাকে ঠিক করে রেখেছি , তার শরীর নিয়ে খেলবো ; তাও তার ইচ্ছে ছাড়া , সেটা ধর্ষণ হবে ; আদর নয় । তুমি আমার জীবন আর জীবনের জন্য ওই টুকু কষ্ট সহ্য করা যায় , তবে … ( বেশ কিছুক্ষণ বিরাম নিয়ে ) … আমি প্রেমিক । ধর্ষক নই ।
সন্দীপনের কথায় সত্যবতী অবাক হয়ে গেল এবং তার কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে তাকে জড়িয়ে নিল নিজের সাথে ।
৪৩।।
—— হ্যালো , তুমি কোথায় ? আমাকে একলা ছেড়ে কোথায় চলে গেলে তুমি ?
আতঙ্কে , ভয়ে , কাঁদো কাঁদো গলায় মোবাইলে ভেসে এলো সত্যবতীর কন্ঠস্বর । সন্দীপন কয়েক মুহুর্ত আসে পাশে তাকিয়ে নিয়ে উত্তর দিল ,
—— মনে হচ্ছে আমি ময়দান তাঁবুর কাছে আছি । তুমি কোথায় ?
সত্যবতী প্রচন্ড ভীত হয়ে পড়েছিল । তার ওপর কান্নার স্রোতে বাঁধ দিতে গিয়ে কথাগুলো হোঁচট খাচ্ছিল বারবার । সেই অবস্থাতেই প্রচন্ড অভিমান নিয়ে বলে উঠলো সে ,
——- যেখানে ফেলে গেচিলে । ফাঁকা রাস্তায় । চলে এসো । এখুনি । খুব ভয় করছে ।
সন্দীপন নিজেকে শক্ত করে উত্তর দেয় যে সত্য যেন না ঘাবরায় । সে আসছে । তারপর সে রাস্তা পার করে পেছনে হাঁটা লাগায় , যদিও গন্তব্য কত দূর তার বিন্দু বিসর্গ জানা নেই কিছুই । এদিকে এগিয়ে চলেছে সময় , ওদিকে এগিয়ে চলেছে পাগল হয়ে ওঠা সন্দীপন ও তার হৃদয় আর অন্যদিকে মুহুর্মুহু বেজে ওঠা রিংটোনে এক আতঙ্ক ,
— তুমি কোথায় ?
সত্যবতী-র কাতর প্রশ্নগুলো আজ নিরুত্তর দেখে সন্দীপন আরও বিচলিত হয়ে পড়ে । গতি বারে পায়ের , গতি বারের মোবাইলের কান্নার অন্তর্বতী সময়ের । অবশেষে নিরুপায় ছেলেটি একটা ধার দেখে দাঁড়িয়ে , সত্যকে বলে
—- আশেপাশে কেউ আছে তোমার ?
সত্য কয়েক মুহূর্ত ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে দেখে চারপাশ , তারপর করুন স্বরে ভেসে আসে তিনটি অক্ষর ,
—- পু লি স ।

( চলবে )