অজ্ঞাত

৪০।।

আজ ৪ঠা নভেম্বর । এ জি অফিসে ছুটির জন্য দরখাস্ত আগেই করেছিল সে । সেই অনুযায়ী সাত থেকে এগারো তার ছুটি মঞ্জুর করে অফিস । আজ রাতের ট্রেনে রিসার্ভেশন আগেই করা ছিল । তাই সেদিক নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে জামা কাপড় প্যাকিং নিয়েই ব্যস্ত সে । অফিস থেকে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বেড়িয়ে পড়ে সে আজ । তারপর কিছু জিনিস কিনে নিয়ে পৌঁছে যায় নিজের ফ্ল্যাটে ।
সন্ধ্যা থেকেই কাজ চলতে থাকে দ্রুত গতিতে । একটা ব্যাগে জামা প্যান্ট , মা ও মাসির জন্য কিনে আনা শাড়ি প্যাকিংয়ে ব্যস্ত যখন সে আজ , তখন মায়ের ডাক এসে উপস্থিত হয় তার ফোনে । ফোন রিসিভ করে বেশি কথা বলার সুযোগ পায়নি সে , শুধু জানায়
—– আজ রাতে ট্রেনে চাপবো । ওই ১১:৩০ । ওখানে পৌঁছাবো রবিবার সকালে । একটু পড়ে স্টেশন যাবো । তখন ফোন করছি ।
মা বেশ কড়া গলায় বলে দেয় ,
—– রাস্তায় বেড়িয়ে ফোন করতে হবে না । রাতে ট্রেনে চেপে কল কোরো একটা আর সাবধানে এসো । দুগ্গা দুগ্গা ।
এই বলে মা ফোন কেটে দেয় । সন্দীপন আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ।
তখন রাত ১০:৩০ । স্টেশনে উপস্থিত হয়ে ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই সে বুঝে নেয় , অনেকখন অপেক্ষা করতে হবে আজ ; কারন ট্রেন ১ ঘন্টা লেট ঘোষণা হচ্ছে মাইকে । ঘোষণা শুনতে শুনতেই তাই সে ওয়েটিং রুমের দিকে পা বাড়ায় এবার ।
ওয়েটিং আর কতক্ষন করা যায় । তাই মোবাইলটা বের করে সত্যবতীকে ফোন করে সে । ফোনের সন্দীপনের নাম ভেসে উঠতেই সত্য এক লাফ দিয়ে সেটা তুলে নেয় , তারপর বলে ওঠে ;
—– ট্রেন এলো ? কবে আসছো তুমি ?
সত্যর অবস্থা দেখে তার মা পাস থেকে হো হো করে হেসে ওঠে কিন্তু সে ধমক দিয়ে মা কে চুপ করিয়ে দিয়ে আবার বলে ওঠে —– কবে আসছো তুমি ?
সন্দীপন এতক্ষন পরিস্থিতির মজা নিচ্ছিল । এবার শান্ত গলায় উত্তর দেয় ,
—– রবিবার । স্টেশনেই বসে আছি । ট্রেন লেট আছে । প্রায় ১ ঘন্টা । আচ্ছা তুমি কি উপহার নেবে বলো নি তো ? এখনো সময় আছে । বলো । জন্মদিনে কি চাই সোনার ?
প্রশ্নটা শুনে সত্যবতী বেশ অপদস্তুতে পড়ে গেল । তাই সে টয়লেট করতে যাওয়ার অছিলায় বিছানা ছেড়ে টয়লেটে উঠে গেল । টয়লেটের ভেতর থেকে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো সে ,
—– তুমি আসছো । এটাই বড় উপহার আমার জন্য । আর যদি কিছু দিতেই চাও , তবে পড়ন্ত বিকেলের রোদ মেখে আর্মেনিয়ার ধারে দাঁড়িয়ে কপালে কিছু চুমু দিতে পারো আমায় ?
উত্তরটা শুনে সন্দীপন বেশ অবাক হলেও , ছোট্ট হাসি হেসে জানালো ;
—— বেশ । তাই দেবো । আজ রাখি । ঘুমিয়ে পড়ো এবার । গুড নাইট ।
সত্যবতী টয়লেটের দরজা বন্ধ করতে করতে উত্তর দিলো ,
—– তোমাকেও গুড নাইট । ভালোভাবে এসো ।
দুজনেই এরপর মুচকি হেসে ফোন কেটে দিলো ।
দুলন্ত ট্রেনের কামড়ায় নিস্তব্ধে বসে বসে , নীরবে ঘুমিয়ে কখন যে বর্ধমান পার করে গেছে সে , সে বুঝতেই পারে নি কিছুই । ওদিকে কাঁচা ঘুম চোখে তাড়া , ক্লাসের জন্য ; ভেবেছিল , একবার চোখাচোখি হয়ে যাবে নিশ্চই । কিন্তু রাত জাগা যে চোখে ঘুম জড়িয়ে আছে এখনো , সে চোখ প্রথম দর্শনের আনন্দ পাবে বলে মনে করতে পারে কি ? হন হন করে বেড়িয়ে আসা ভিড় , তবু সে চোখ খুঁজছে হাওড়ায় সেই মানুষটাকে । মনের তর সইছে না আর , মিলন কে জানে হবে আর কত ক্ষণে ।
লোকালে চেপেই ফোন করেছিল সত্যবতী , জানতে কোথায় সে ? স্টেশনে দাঁড়িয়ে একবার মনে করে দেখলো এখন , বলেছিল
—— জিনিসগুলো বাড়িতে রেখে দিয়েই আসছি । হাওড়া স্টেশনে ১ নম্বরের বাইরেটায় দাঁড়িও । ওখানেই থাকবো আমি ।
কিন্তু কোথাও তো দেখা নেই । এদিকে এত ভিড় ! চিনতে পারবে তো আমাকে । এমন নানা ভাবনা গিলে খেয়ে চলেছে তাকে । হঠাৎ এক অচেনা হাতের ছোঁয়ায় হতচকিত হয়ে পিছন ফিরে তাকায় সে । পিছনে ফিরতে ফিরতে তার মন ভীষনভাবে বলছিল যে এ হাত নিষ্পাপ , এ হাত তার জন্য , তারই কাছের কেউ । আর বাকিটা , পিছন ঘুরে সে অবাক …. টু শব্দ নেই কারুর গলায় , পারিপার্শিক কিছু নিত্য কলহ ছাড়া ।
একসঙ্গে দুজন পায়ে পা মেলালেও , অনেক সময়ই বাক রুদ্ধ থেকে বলে চলে অনেক কথাই । সত্যবতীর সাথে সন্দীপনের প্রথম চোখাচুখি হওয়ার পর , দুটি শরীর চলেছে অনেক দূর । বাসের সিটে পাশাপাশি বসে থাকা মুখদুটো কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না । পার্ক স্ট্রিট স্টপেজ আসতে তারা নেমে পড়লো ঠিকই , তবে কথা তখনও ফুটছে না কারুরই মুখে । তারপর একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে সত্যবতী , সন্দীপনের দিকে প্রথমবার ফিরে তাকালো । হা করে দেখে চলেছে সে মনের মানুষটাকে । আজ সে দাঁড়িয়ে তার সামনে । তারপর লাজুক স্বরে ফুটে উঠলো কথা , সামনাসামনি প্রথমবার ,
—— আমাকে আমার কাছ থেকে ছিনতাই করার জন্য ধন্যবাদ । আজ সত্যি বলতে ক্লাস করার ইচ্ছে একটুও ছিল না । হয়তো তোমার ফোন যখন এলো , তখন এটাই বলতাম , কিন্তু তার মধ্যে ওই হাত দুটো ….
সত্যবতী এক বুক স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে নিজের মধ্যেই হারিয়ে গেল আর সন্দীপন হো হো করে হাসতে লাগলো তার কথায় ।
রেস কোর্সের পাস দিয়ে হেঁটে চলে গেছে পথ । হাতে হাত ধরে কলকাতার বুকে বহু দিন পর একসাথে এগিয়ে চলেছে দুই অভিন্ন হৃদয় । কত দিনের পর এ দেখা তাদের । মাঝে মাঝে খুনসুটি আর দুষ্টুমি , ভালোবাসাকে আরও মাখো মাখো করে দিচ্ছে । প্রায় আধ ঘন্টা এগিয়ে যেতে না যেতেই সত্যের চোখে ধরা পড়লো এক অদ্ভুত তৃপ্তি । উৎফুল্ল মুখ তার যেন অনেক কিছুই বলতে চাইছে , কিন্তু পারছে না । সন্দীপন ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে আর দেখে চলেছে তার হৃদয়কে এভাবেই অনেকক্ষন ধরেই , তারপর , সাবধানে সত্যবতীকে হঠাৎ মাঝপথে থামিয়ে হাতের মুঠোটাকে শক্ত করে ধরে বলে উঠলো ,
—– জীবনটা আজ তোমাকে দিলাম । ছেড়ে যেও না কোনদিন ।
সত্যবতী ভাবেনি এমন মুহূর্ত সে কারুর কাছ থেকে পাবে কোনদিন , জনবহুল পথে দাঁড়িয়ে এ ভাবে কেউ বুকে টেনে নেবে কাছে । এ মুহূর্ত তার কাছে শত চুমুর থেকেও মিষ্টি । তবু বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে সে বলে উঠলো ,
—– কোথাও যাবো না । যাবার জন্য তোমায় ডাকে নি আমি । শুধু ভালোবাসা দিয়ে যেও এভাবেই । ‘ ধরিয়া রাখিও সোহাগে আদরে … ‘ । এবার বলো দেখি আজকের দিনটা কিভাবে কাটানো যায় ?
সন্দীপন সত্যবতীকে রাস্তা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে আসে আগে , তারপর , মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায় । কোন পরিকল্পনা নেই যে আজ । সে তো শুধু সত্যের সাথে দিন কাটাতে চেয়েছিল । কোন পরিকল্পনা তো করে রাখেনি আর । তবু , এ কথা কি বলা যায় আর তাই নরম গলায় উত্তর দেয় ,
—- তুমিই বলো ।
সত্যের মুখে সেই এক কথা ,
—– না না তুমি বলো ।
আর এভাবে কথা চালানের মধ্যেই দুপুরের রোদ ঝাঁপিয়ে পড়লো বড় রাস্তায় । প্রেমিক প্রেমিকাদ্বয়-ও নিস্তার পায় না । সে কি জানে ভালোবাসার মানে ! এ অসহ্য রোদ্দুরের তাপে তপ্ত দুজনে পেক্ষাগৃহের শরনে যাবে বলেই স্থির করে ও সেই উদ্দেশ্যেই ক্যাব বুক করা হয় । সাইলেন্ট সুপারস্টার আজ স্ক্রিনের ভেতরে নয় শুধু , বাইরেও চলবে ; এ কাহিনী কেউ বোঝে না ; শুধু ওরা ছাড়া । প্রথম মিলনের প্রথম সেশন শুরু হলো বুঝি এবার ।

৪১।।

ক্লান্ত সন্ধে তখন মিটমিট করে হাসছে । ওলার পিছনের সিট দুটোতে তখনও খুনসুটি আর ঝগড়া । ঘড়ির কাঁটা দুটো তখন পাঁচ আর তিনের ঘরবন্দি । হালকা হাওয়া আর পড়ন্ত রোদ , আজ আনন্দের গান শীষ দিচ্ছে দু ঠোঁটে বারবার । ছোয়াটা কত গভীর তা সময় বলবে , এখন শুধুই উপভোগ্য হোক ওদের কামনা ।
বেজে ওঠা মোবাইলের কন্ঠে ভেসে এলো গান , ” যদি তারে নাই চিনি গো সেকি … ” । আস্তে করে ফোনটা কানে ধরে সত্যবতী গলাটা বেশ গম্ভীর করে বলে উঠলো ,
—– হ্যালো । হাওড়ায় ঢুকছি । ট্রেন ধরবো তারপর । তারপর বাড়ি ।
এটুকু বলেই কোন উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে সটান লাইনটা কেটে দিলো ।
সন্দীপন অবাক হয়ে সব দেখছিল এতক্ষন ধরে । এবার সত্যবতীর দিকে তাকিয়ে সে সংশয়টা ছুড়েই দিলো ,
—— কে ছিল ? মা নিশ্চই ।
সত্যবতী বেশ লাজুক ভাব করে ঘাড়টা ওপর নীচে নেড়ে দিলো একবার । সন্দীপন এতে আরও অবাক হয়ে বলে বসলো ,
—– মায়ের ফোন কেটে দিলে কথা না বলে !
সত্যবতী এবার সন্দীপনের ঘাড়ের ওপর মাথাটা এলিয়ে দিয়ে জানালো যে এ মায়ের রোজের অভ্যেস । আর তাই প্রশ্নগুলো তার জানা । জানা প্রশ্ন পেয়ে সে উত্তরও দিয়ে দিলো এক সাথে । সন্দীপন সত্যের কথার কোন উত্তর না দিয়ে তাকে কাছে টেনে নিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো । আর আমাদের সত্যবতী , চুপ করে তার বুকে মুখ গুজে বসে উপভোগ করতে লাগলো ভালোবাসা ।
অনেক কথা বলতে হয় না , নীরবতায় প্রকাশ্য হয়ে ওঠে ওরা । ঠিক যেমন আজ ওলার মধ্যকার নীরব ভাষ্যকার দুইজনা ; কথা বলছে ঠিকই , তবে গোপনে ।
সিনেমালয় পথের আগে সৃষ্ট ওদের প্রেম , আপাতত কমা পড়লো হাওড়ার লোকালের হুইসালে । দিন কেটে রাত নেমে এলো ঠিকই , তবে প্রেম কি শেষ হয় ! পরদিন থেকে তাদের অফিসিয়াল প্রেম দিবস শুরু , একথা ভুলতে পারছে না সত্য কোনভাবে । ফেসবুকের পাতায় তাই যার ভাষা বলতে নেমে আসতো এতদিন কিছু ছবি আর বোকা বোকা কিছু কথা ; তার ওয়ালেও রাতের অন্ধকারে লিখে গেল হৃদয় একটা আস্ত কবিতা —-
” জানি আবার একদিন দেখা হবে ,চোখে চোখেই না বলা কথাগুলো
কাব্যের পাতা হয়ে ফুটে উঠবে , আমার কাছে তুই , আর তোর কাছে আমি ; এক গোটা পৃথিবী ; সুস্থ স্বাভাবিক ; শুধু দুজন পাগল আমরা সকলের চেয়ে দামি ।।
আমার গলায় তোর হাত দুটো জড়িয়ে ধরবে ,চোখের জল
হারানো কিছুর প্রাপ্তির আনন্দে বাঁধ ভাঙবে দুদিকেই ,
ভিজে যাবে শরীর , তবু এ সুখের কি শেষ হয় কোনোদিন ??
ভালোবাসি , তোকে ভীষণ ভালোবাসি বলে উঠবো ;
প্রথমে তুই আর তারপর আমি ।।
তাহলে বলিস নি কেন , হতভাগী ;
চেয়েছিলাম , তবু পারিনি একটিবার ,তুই যদি খারাপ ভাবিস ।। কিন্তু তুই তো পারতিস ?
চেয়েছিলাম খুব , তবে এখানেও ভয় ; রাগ করে যদি তুই কোথাও হারিয়ে যেতিস ।। স্বপ্ন , এসব স্বপ্ন , আমি রোজ দেখি আর স্বপ্নেই ভবিষ্যতের কত ছবি আঁকি ।।
তুই বিশ্রাম কর বরং , বিশ্বাস কর স্বপ্নই একদিন গড়ে তুলবে
স্বপ্ন পূরণের পথে , এক পথের গঠন ।। শুধু ভেঙে পড়িস না , তোর ভেঙে পরা মুখ আমার একটুও ভালো লাগে না ।।
বিশ্বাস কর , আবার একদিন দেখা হবেই ” ।।
পরেরদিন সকাল থেকেই আকাসে রোদ মেঘের লুকোচুরি খেলা । ভোর বেলায় ঘুম ভেঙে গেছে সত্যের । ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সকাল সাতটা , এদিকে সাজুগুজু করতে এখনও অনেক বাকি তার । সন্দীপনের ঘুম অবশ্য যখন ভাঙলো , তখন প্রায় সাড়ে আটটা , তাও ভোপাল থেকে আসা একটা ফোন কলের শব্দে ।
—- আরে দাদা , ঠিক ঠাক পহচ গয়ে হো না ,
ওপাশ থেকে ভেসে এলো অজিতের কন্ঠস্বর । সন্দীপন হাই তুলে নিতে নিতে জানায় ,
—- ঠিক ঠাক নহি । বহত সহি আ গয়ে হম । ঔর আকর ….
কিছু বলতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালো সে । সত্যবতী নিয়ে সে কিছুই বলতে রাজি নয় সে । গোপন কথাটি গোপনেই থাক । আর কথা না বাড়িয়ে পরে কল করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে ফোনটা কেটে দিলো আর তারপর হরিণের গতিতে তৈরি হয়ে নিতে ছুটলো সে ।

ক্রমশ…