জন্ম ২০শে সেপ্টেম্বর। অসাধারণ কবি। লেখেন গল্প, প্রবন্ধ।

মুনকে লেখা চিঠিগুলোর থেকে

চোদ্দ

মুন,
পুরন্দর দূর্গের পথে সেই ভয়ঙ্কর দূর্যোগের মধ্যে একটা গাছের নীচে আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম। যে গাছের নীচে আমরা দাঁড়িয়েছিলাম, তার সামনের ইউক্যালিপ্টাস গাছটা প্রবলভাবে বাজ পরে ঝলসে গেল।আমরা ওখান থেকে বেরিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম।রাস্তায় এক জায়গায় কোমর সমান পাথর পড়ে একটা ছোট্ট গূহার মত হয়ে জায়গা‌ হয়ে আছে ।সেই গূহার মধ‍্যে চোখে পড়ল ভেতর থেকে চার জোড়া জ্বলজ্বলে চোখ।বিঠঠল বলেছিল “ভেড়িয়া”, মানে নেকড়ে।
ভারতীয় নেকড়ে সাধারণত দল বেঁধে থাকে বলেই জানতাম।তার মানে ওরা কি দলছুট? বিঠঠলকে জিজ্ঞেস করাতে ও বলেছিল ” ইথে হো ভেড়িয়ালোগানা ঝুন্ড আহে, পাউস ঝালা, তেনচা সাঠি হো পাহাড়ি মধ্যে বসাইসছে।হে লোগ বাহারি ছুট যাইছে।” বলে পথের বাঁ দিকে অনেকটা দূরে কতগুলো জঙ্গলে ঢাকা টিলা দেখিয়েছিল।
মানে ওই নেকড়েগুলোর একটা দল আছে, বৃষ্টি পড়ছে বলে ওরা ওই পাহাড়ের ভেতরে নিজেদের আস্তানার মধ্যে ঢুকে আছে।এরা কজন দলছুট হয়ে বাইরে পড়ে গেছে।
হঠাৎ ওই গুহার মধ্যে দেখলাম মাটি থেকে একটু ওপরে আরো অনেকগুলো চোখ জ্বলে উঠল।বিঠঠল বলল, “বাচ্চা ভি আহে।” সঙ্গে বাচ্চাও আছে।
ওই দলছুট নেকড়ে দম্পতি ওদের শাবক সহ ওই দূর্যোগে ওই গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল।ওরা ওই বৃষ্টির মধ্যে আমাদের দিকে এগিয়ে আসেনি।কিন্তু আমরা ওই জায়গাটা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের দেখা গেছিল, ততক্ষণ ওবধি একটা নেকড়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে গূহার মুখে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল।
আমরা এগিয়ে চললাম।ওই পথ ক্রমশ দূর্গম হয়ে উঠেছে।জায়গায় জায়গায় গাছ ভেঙে পড়েছে।পথ ক্রমশ রুক্ষ হয়ে উঠছে।বহুক্ষণ চলার পর জঙ্গল এবার একটু হালকা হয়ে এল।বিঠঠল সামনের পাহাড়ের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল “হো উপর আহে পুরন্দর কিলা।পন বরসাত সাঠি বাদল মধ্যে ছুপা আহে।” ওই ওপরে আছে পুরন্দর ফোর্ট।কিন্তু বর্ষার জন্য মেঘে ঢাকা পড়ে আছে।
ওদিকে তাকিয়ে মনে হল পাহাড়ের ওপর যেন মেঘের এক দূর্গ।হঠাৎ একঝলক মেঘ সরে গেল।আড়াল থেকে ভেসে উঠল বিশাল দূর্গপ্রাকার, কোন এক রাজকীয় শিরস্ত্রানের মত। সে দূর্গপ্রাকার দেখলে মনে সম্ভ্রম জেগে ওঠে।কিন্তু একপলকের জন্য সেই দূর্গপ্রাকার ভেসে উঠে আবার মেঘে ঢেকে গেল।আর ঠিক তখনই প্রচন্ড আওয়াজ করে ওই প্রাকারের ওপর আছড়ে পড়ল বাজ।দেখলাম সমস্ত দূর্গপ্রাকার জুড়ে বিদ্যুতের অপরূপ খেলা, বারবার বিদ্যুৎ ওই পুরন্দর ফোর্টের ওপর ঝলসে উঠল আর মনে হল যেন আমাদের বলছে, এসোনা এখানে। এখানে বহু যুদ্ধের শেষে শিব্বারাও বিশ্রাম নিচ্ছেন, দূরে থাকো।
আমরা বেশ কিছুক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে অপলকে ওই অপরূপ দৃশ্যের স্বাক্ষী হয়ে রইলাম।তারপর অন্য পথ দিয়ে একটু ঘুরে যখন কিকউয়ী গ্রামে পৌঁছালাম, তখন সহ্যাদ্রীর বুকে সন্ধ্যা নেমেছে।
বিঠঠল রাতে শোয়ার আগে বলল, ” রাজে, হো কিলা মধ্যে আজ পন কভি কভি শিব্বারাও দিসত আহে।” মানে রাজা, ওই দূর্গে এখনও মাঝেমাঝে শিব্বারাওকে দেখা যায়।”
বন পাহাড়ের মানুষদের এসব বিশ্বাস থাকে, তাই ওকে আর আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করিনি।কিন্তু ও বলেছিল নিঝুম দুপুরে, ওই নির্মেঘ দূর্গপ্রাকারে অনেকেই দেখেছে শিব্বারাও মাঝেমাঝে কোমরে হাত দিয়ে দূরের উপত্যকার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

চন্দ্রতাড়িত।