মিডিয়া, প্রকাশনা আর লেখালিখির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এই তরুণ তুর্কির। এছাড়াও তথ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবেও সমাদৃত।

এবং সপ্তেন্দ্রিয়…
হাসির কথায় হাসতে মানা – পিঠচাপড়ানি…

পিঠের টনটনে ব্যাথাটা এখনো যায়নি। আর বলবেন না, অনেকদিন বাদে একটু বাজারে গিয়েছিলাম। না, চুরির দায়ে মার খাইনি, এটা ভালোবাসার আলতো চাপড়। দেখা হয়েছিলো অসীমকাকুর সাথে। পিঠের উপর একটা আলতো চাপড় মেরে বললেন, “কি হে ভায়া, অনেকদিন বাদে বাজারে দেখছি!” অসীমকাকু ভদ্রলোকটি বেশ আমুদে, ফুর্তিবাজ। তাই মাঝে মাঝে এক্সাইটমেন্টের পর্যায়টা প্রবল উচ্চতায় উঠে গিয়ে তার যে দুইখান ডাম্বেল-বারবেল ভাঁজা হাত আছে, তা তিনি ভুলে যান। তাই নিউটনের তৃতীয় সূত্রানুযায়ী তার দিকে ফিরে বললাম, “ক্যাঁক!” অর্থাৎ ‘কে রে’ আর ‘হ্যাঁ’-এর বেদনাদায়ক সংস্করণ।
অসীমবাবু যেটা আমার পিঠের উপর দিলেন, সেটার বহুযুগ আগে একটি গালভরা বাঙালি নাম ছিলো, ‘পিঠ চাপড়ানি’। সাধারণত খাঁটি বঙ্গ আসর-জলসায় একে ব্যবহার করা হতো। তবে আসর-জলসা শুনে কেও আমার দোষ নেবেন না, আমি অতীতের কথা বলছি, যখন সংস্কৃতিমনস্ক কিছু মানুষ এটা করে থাকতেন। ডারউইন পড়ে জেনেছি মানবজাতি বিবর্তনশীল ও উন্নয়নকামী। এখন তাই প্রায় প্রতি সন্ধ্যাতেই প্রচুর সংস্কারকর্তাদের জলসা-আসর বসে। আর সেটাও “আমি আছি একইরকম বিদ্রোহী” বলে লাল লাল লাল সেলাম জানায়। খানিক বাদে শরীরে মনে বিপ্লবের ঝড় ওঠে। সকালের নিরীহ লালুও বিপ্লবী হয়ে উঠেছিলো সেদিন। পল্টু বাই এনি চান্স তার পিঠটা চাপড়িয়ে বলেছিলো, “হেব্বি টানিস তো সালা, দেকেই বোজা যায় না।” ব্যস, আর যাবে কোথায়! এমনিতেই প্রতিদিন সকালে পল্টু লালুকে ভেংচি কাটে। আর এই সন্ধ্যায় তার এই পিঠচাপড়ানির গুঁতোতে লালুর লাগে বিষম। তারপরেই শুরু হয় প্রহার। লালুর বিপ্লবীসত্বা আর কি। লালু-পল্টু আপাতত দুজনেই হাসপাতালে। ডাক্তাররা তাদের পাশাপাশি রাখার ঝুঁকি নিতে পারছেন না। সেই যুদ্ধপরিস্থিতিতে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিলো, পরে জেনেছিলাম তাকেই এখন মাতৃভাষা বলা হয়।
শুধু মানুষ কেন, সংস্কৃতিও তো পরিবর্তনশীল। সেই কবে সংস্কৃত পালি-প্রাকৃত ঘুরে এখনকার বাংলার রূপ ধারণ করেছে। বাংলা ভাষা আন্দোলন, মর্যাদারক্ষা আর একুশে ফেব্রুয়ারীর পাশাপাশি তাকে তরলীকরণও করা হয়েছে। ইদানীংকালে দিনের বেলার হাবাগোবা অফিসবাবুটিও রাতে তা পান করে খানিক বিপ্লবী হয়ে পড়ে কিছু সময়ের জন্যে। ফলশ্রুতি গৃহযুদ্ধ। এবং সকালে ঘোর কাটলে ব্যাগ বগলে ফের ষ্টেশন ট্রেন ধরার জন্যে। ফিরে এসে আগের রাতের কথা জনৈক বন্ধুকে শোনালে এবং পিঠের উপড় চাপড়ানির দাগগুলি দেখালে বন্ধুটিও তার পিঠে একটা চাপড় দিয়ে বললে, “বোলানের ঠেকে চল, ওখানেই সব শুনচি।”
মোদ্দা কথাটি হ’ল আমাদের চিরাচরিত বাঙালি বিপ্লবীসত্বা চাগিয়ে তুলতে এই তরলীকরণ করা আবশ্যিক ছিলো। এর অনামী ও অখ্যাত আবিষ্কর্তা ছিলেন দূরদর্শী এবং তার সৃষ্ট এই তরলবঙ্গের ফল হ’ল সুদূরপ্রসারী। পরিবর্তনের পর রাজ্যের যখন দেউলিয়া অবস্থা, তখন এর উপর রাজস্ব চাপিয়ে সেই পরিস্থিতি সামাল পর্যন্ত দেওয়া গেছে। এমনি তার ক্ষমতা। আমি মনে মনে সেই অনামা অখ্যাত নোবেলবঞ্চিত আবিষ্কর্তাকে প্রচুর পিঠ চাপড়ানি দিয়ে থাকি।
এই প্রসঙ্গে একটি কথা মনে পরে। আমাদের পাশের বাড়ির এক স্বনামধন্য গায়ক প্রত্যহ সকালে কালোয়াতি ভেঁজে ঘুম ভাঙাতো। দুপুরবেলা জানতে পারতাম ওটাকে রবীন্দ্রসংগীত বলে। আগে একুশে ফেব্রুয়ারির দিন আমাদের এখানে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হ’ত। এখন সে পাট উঠে গেছে। যাইহোক, গায়কবাবুটিকে একবার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো সেই অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য। সকাল সকাল গান গাওয়ার জন্যে হারমোনিয়াম-টোনিয়াম নিয়ে সে তো হাজির। আমাদেরও সে টানতে টানতে নিয়ে গেলো, বললো, “প্রবলেম হলে একটু দেখিস।” আমরা তার গান শুনতে দর্শকাসনে বসলাম। ষ্টেজে উঠে তার প্রথমেই “আমি বাংলায় গান গাই গাওয়ার সাধ হলো। শুরুও করলো। খানিকবাদে পেছনের সারি থেকে আওয়াজ এলো, “বাংলা নিয়ে কি গান লিখেছে দেখেছিস? ক্যাসেটটা নিয়ে রাখিস। সন্ধ্যেবেলায় বসবো যখন, শোনা যাবে। মজা আসবে।” গায়কবাবু যখন নেমে আসে তখন পিঠচাপড়ানির অন্ত নেই। তাদের মধ্যে সেই ছেলে দুটিকেও দেখতে পেলাম। মনে মনে ভাবলাম যার গান শুনে পাড়ার সকলে প্রাণ ওষ্ঠাগত, তাকে এরকম পিঠচাপড়ানি দেওয়া হচ্ছে কেন! আজও তা নিয়ে দোটানায় ভুগি।
স্কুলে হারাধন স্যার যখন ক্লাসের শুরুতে আমার পিঠে উত্তম মধ্যম বেতের বাড়ি কষাতেন, তখন বুকে রাগ হলেও মুখে কিছু বলতে পারতাম না। সারা বছর একই রুটিনে মার খেয়ে যেতাম। সেদিন পাড়ার ক্লাবে অনুষ্ঠান করে মাধ্যমিকে সফল ছাত্রছাত্রীদের সান্মানিক দেওয়া হচ্ছিলো। অবসরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক মাষ্টারমশাই তাদের মধ্যে একজনকে পিঠ চাপড়ে বলতে গেলেন, “বাঃ! ভালো করেছো। এইভাবে জীবনে চলার পথে…।” কথাটি ফুরোলো না, উত্তর এলো, “টাচ করবেন না। ফের করলে খালপার দিয়ে সাবধানে যাবেন।” মনে মনে ভাবলাম সারাবছর হারাধন স্যার আর আমার ঘটনাবহুল ক্লাসযাপন স্কুলের ইতিহাসে উঠে থাকলেও বছর শেষে একদিন অন্তত চাইতাম আজ তার বেতের বদলে হাতের স্নেহস্পর্শটা আমার পিঠে এসে পড়ুক। আর আজ কে কাকে ভয় করে তা বুঝতে পারছি না। শিক্ষাব্যবস্থার পিঠ চাপড়াতে ইচ্ছে করে। আমি স্কুল ছেড়েছি ২০০১ সালে। সেন্সাস বলছে তখন পশ্চিমবঙ্গে সাক্ষরতার হার ছিলো ৬৪.৮%। আর এই গেলো সেন্সাসে তা ৭৪.০৪%। সত্যই শিক্ষা ব্যাবস্থার উন্নতি হয়েছে। পিঠচাপড়ানি সবার আগে তো শিক্ষামন্ত্রীর প্রাপ্য।
মাঝে কবিদের বাজার এখানে পড়ে গেছিলো ২০০১ সালের মতো। তখন কিছুদিন আসলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার হাতে ২০০৩ ক্রিকেট বিশ্বকাপ বাদে তেমন কোনও খবর ছিলো না। তাই তাদের বেশিরভাগ পাতা ফাঁকাই পড়ে থাকতো। তাই তারা স্বল্পমূল্যে উঠতি কবিদের লেখা কবিতা কিনতে শুরু করে। কারণ ফাঁকা পাতা ভরাতে এদের জুড়ি ছিলো না। পত্রিকাগুলোও সেইমতো তাদের পিঠ দেদার চাপড়িয়ে কম দামে কবিতাগুলি কিনতে লাগলো। যত পিঠ চাপড়ানি, তত কম দাম। বহু নামীদামী সাংবাদিক কাজ না পেয়ে পত্রিকাও দিলো ছেড়ে। সেখানে কবিদের রমরমা শুরু হ’ল। ঠিক তখনই ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে আমাদের এখানকার এক কবির। তার একটি কবিতা খুব নামকরা কোনও পত্রিকায় বেড়িয়ে যায় খুব কম দামে। সেই থেকে তার দাপটে চলা দায় হয়ে ওঠে মানুষজনের। রাজনৈতিক বক্তৃতামঞ্চ থেকে শুরু স্কুলে-কলেজে, যেখানে পারছে সেখানেই তার কোট ব্যাবহার করা হচ্ছে। তার হাত পিঠের পরে মানে বুকে সুখ। আমাদের সব্জিবাজারেও পর্যন্ত তাঁর চর্চা।
এমন সুখের সোনার সংসার তার ভেঙ্গে পড়ার কারণ হিসাবে জানা গেলো সেই আমেরিকা। পত্রপত্রিকা বিশ্লেষণ করার একটা মনের মতো জায়গা পেয়ে গেলো। বেশ কিছু সাংবাদিক ফিরে এলো। যারা এলো না তারা নতুন পত্রিকা খুললো। মোটামুটি রিপোর্টারদের বাজার আবার উঠে এলো। বিশ্লেষণ করলেই তখন ছাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যারা এই অবস্থার প্রতিবিধান দিচ্ছে তারা ভাত পাচ্ছে না। কারন ঘা-টাকে খুঁচিয়ে জিইয়ে রাখতে পারলেই পাতা ভরে যাচ্ছে। ওষুধ ছাপালেই যে অসুখ তা সেরে যাবে। অনেক পত্রিকা এই ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে উঠেই গেলো। যাইহোক, এমতাবস্থায় মহা বিপদে পড়ল সেই কবি। তার তখন নুন আনতে পান্তা ফুড়ায় অবস্থা। আবার নিজস্ব ভাবধারাও ক্ষুণ্ণ হতে দিলে চলবে না। যেটুকু নাম সে করেছিলো তাই দিয়ে এর ওর পিঠে হাত বুলিয়ে বাজার থেকে ধারে তরিতরকারি আসে তখনও। আবার শুরু হলো তার পাতার পর পাতা লেখা। সারাদিন সে লিখেই যায় আর আমরা ভাবি সে কত বড় কবি। একদিন কার্তিক তাকে ভালো আছেন কিনা জিজ্ঞাসা করাতে সে সবে শুরু করেছিলো, “এই অন্ধকার দুর্দিনে তুমি…”। কার্তিক দেখলো দোকান খুলতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। সে “দাদা আসছি” বলে সাইকেলটা জোরে চালিয়ে দেয়। একবার সে পেছনে তাকিয়েছিলো, দেখলো তখনও সে হাত-পা নেড়ে কি যেন বলে চলেছে। আর তাকায়নি।
বৌদি সেই সময় একদিন দুঃখ করে বললো তোমাদের দাদার মাথাটা গেছে, একটু দেখে রেখো তো। সবাই কারণটা জিজ্ঞেস করাতে বৌদি তার দুঃখের ইতিহাস শোনালো। কোনও একদিন বৌদি বাজারের ফর্দ লিখিয়ে দাদাকে বাজার করতে পাঠিয়েছিলো। ফর্দে লেখা ছিলো এক কেজি আলু, এক কেজি পেঁয়াজ, পাঁচশ পটল প্রভৃতি। দাদা যখন বাজার করে ফিরলো তখন তার ব্যাগ ভর্তি শাকপাতা, একটা সূর্যমুখী ফুল… আর কিছু নেই। বৌদি কপালে হাত দিয়ে বলে কি আনতে বলেছিলাম, আর কি আনলে! দাদাও হতভম্ব। অনেক পরে জানা গেলো বাজার করতে যাওয়ার আগে দাদা নেচার নিয়ে একটা কবিতা লিখেছিলো। সেটাকেই ফর্দ ভেবে পকেটে নিয়ে চলে গেছে। সব্জিওয়ালা কি আর অত বোঝে? তারা শুধু আলোচনা করে আর দাদাকে দেখে রাঙ্গালুর পরে শাঁকালু লিখে হিসাব করে। দাদার ওই কবিতা পড়ে সে শাকপাতার অর্থ বের করেছিলো আর তাইই দিয়েছে। তারপরে অন্যদের কাছে গল্প করেছে দাদা কবিতা লিখে তাকে জিনিষ দিতে বলেছিলো, সেও মানে উদ্ধার করে বাজার বুঝিয়ে দিয়েছে। তার কাছে শুধু সূর্যমুখী ফুলটা ছিলো না, সেটাও সে নার্সারি থেকে এনে দিয়েছে। তা পেয়ে দাদা তার পিঠ চাপড়ে দিয়ে গেছে। ওদিকে দাদা বৌদির কাছে তা খাচ্ছে।
অনেকদিন আগে আমি একবার একটা চিলিচিকেনীয় কবিতা লিখেছিলাম। তখন লেখার চেষ্টা করা কেবল শুরু করেছি। আর শুরুতেই যত রোখ চেপে বসে, মাথার মধ্যেকার বুদ্ধিগুলো কলম দিয়ে বেড়িয়ে আসার জন্যে ছটফট করে, আর কারো ভালো না লাগুক নিজের কাছে তা অসাধারণ লাগে, অন্যের হাত জোর করে ধরে নিজের পিঠের উপর থাবা মারি আর মনে মনে গর্ব অনুভব করি। এদিকে ওদিকে অনেক জায়গায় পদ্য ছড়িয়ে বেড়াই, কিন্তু তা আমার হাতের লেখা বাদ দিয়ে অন্য ফর্ম-এ দেখতে পাই না কোথাও। মনে মনে বিতৃষ্ণা আসে, মনে হয় শালার রাজ্যে যত পত্রিকা আছে সবকটাই ফালতু। বের করলাম নিজের ক্ষুদ্রপত্রিকা। প্রথম প্রথম চেনাশোনা অনেক লেখকই লেখা দিতে থাকলো। বিক্রিবাট্টাও ভালো চলছিলো, অনেকের নাম দেখে মুদীর দোকান থেকে শুরু করে ফার্নিচারওয়ালারাও এটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পয়সা দিতে থাকলো নিয়মিত। মাঝে মাঝেই বড় কিছু লেখকদের ছোট ছোট সৃষ্টির নিচে লেখা থাকতো “সৌজন্যে – গীতমালা ফার্নিচার” ধরণের আরো কিছু। ভুলটা আমার নয়, কম্পোজারের। সে খালি ভাবতো বড় লেখকদের লেখার নিচে বড় স্পন্সরের বিজ্ঞাপন দিলে দুজনেই বেশ পরস্পরের পিঠ চাপড়াচাপড়ি করবে। তাকে অনেক বুঝিয়েও কোনও ফল পাইনি। মাঝখান থেকে একদিন এক মস্ত লেখক আমাকে বলে বসলেন, “এর থেকে ক্লাবের স্যুভেনির বের কর তোরা। বাড়ির নামটা আর ডুবাস না।” মনে মনে মহা ক্ষেপে গেলেও চুপ করে গেলাম, কারন তখন অনেকেই “নতুন লেখা তৈরি নেইরে” বলে সরতে শুরু করেছে। আর তাদের দেখে বিজ্ঞাপনদাতারাও।
কিন্তু আসল ভুল করলাম অন্য জায়গায়। সবার নজরে আসার জন্যে একদিন আমার লেখাটিকে সবার প্রথমে রাখলাম। ভাবতাম সবার আগে আমার লেখা পড়ে অনেকেই আমার পিঠ চাপড়ে দেবে। এর আগে আমার লেখা থাকতো মাঝের দিকে, এবং তা নিয়ে কাউকে কোনদিন আলোচনা করতে শুনিনি। ভাবতাম সেগুলো বোধহয় সবার নজর এড়িয়ে যায়। মধ্যে অর্থনৈতিক দুর্বলতার জন্যে গ্যাঁটের কড়ি দিয়ে এই পত্রিকা টানছিলাম। আগে পাশে যারা ছিলো, তারাও সরে পড়েছে, সুতরাং এই বুঁদির কেল্লায় আমি একা কুম্ভ। এরমধ্যে একদিন ভজহরি কাকুর সাইকেল সারাইয়ের দোকান থেকে তার বিজ্ঞাপন চাইতে গেলে তিনি বললেন “আমুও একখান কোব্‌তে লেখছি, ছাপায়ে দিলে তোমারে ভালো পয়সা দিবো।” দুঃখের দিনে সবাই সুযোগ নিতে চায়, তাই তাকে কথা দিলাম। সেও আমার পিঠ চাপড়ে বললো “বড়ো ভালো ছেলে”, পত্রিকাকে কেও ভালো না বলুক, এই কথাটি শুনে উৎসাহ গেলো বেড়ে। আর তা এমন বাড়লো যে নিজের লেখা সবার প্রথমে দিলাম ছাপিয়ে। পিঠচাপড়ানি পাওয়া তো দূরের কথা, এরপর আর দুটো এডিশান বেরিয়ে সেটা গেলো বন্ধ হয়ে। এতদিন পত্রিকাটা যারা পড়তো তাদের গাল দিয়ে বেড়াতাম, এবার গাল দিতে শুরু করলাম আমাদের ওই পত্রিকায় যারা লিখতো তাদের। কিন্তু নিজে তখনও ভালো লিখি আর বসে বসে একা একা পিঠচাপড়াই।
বন্ধুরা আমার দুঃখের কাহিনি জানতো। সেই যেদিন প্রথম এডিশান বেড়োয় সেদিন তার সাফল্য দেখে সবাই বোতলীয় হওয়ার জন্যে আবদার করে, আর এই শেষ দিনেও তারাই সঙ্গী, দুঃখ ভাঙানোর জন্যে একইভাবে। গ্যাঁটের কড়ি খরচা করে মাঠের মধ্যে গোল করে বসি বোতল আর চিলিচিকেন নিয়ে। তখন আর ভালো রেষ্টুরেন্ট থেকে কেনার সামর্থ্য নেই আমার, যা জমানো ছিলো সব গেছে মায়ের ভোগে। পচাদা শুনলাম ঘুগ্‌নী বেচা বন্ধ করে আজকাল চাইনীজে মন দিয়েছে। তার থেকেই নিয়ে আসলাম কাগজে মোড়া ‘পচার চিলিচিকেন’। খাওয়া শুরু হল, বিলাপও। বন্ধুরা সবাই পিঠচাপড়িয়ে দিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগলো। এরমধ্যে বিল্টু মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে একখানি মাংস খুঁজছিলো পাতাবাহারের মধ্যে থেকে। হটাৎ করে বলে উঠলো, “হাতের লেখাটা চেনা চেনা মনে হচ্ছে, সতু দেখতো…।” আমিও দেখতে যাই তাই শুনে, যা দেখি তাতে চক্ষু চড়কগাছ, জ্বল জ্বল করছে আমার পান্ডুলিপি। পরিষ্কার আমার লেখার খাতার পৃষ্ঠার টুকরো। যেটুকু বা মাথা ঝিমঝিম করছিলো, সব চলে গিয়ে তা গরম হয়ে উঠলো।
বাড়ি ফিরে এসে তন্ন তন্ন করে খুঁজি কবিতার খাতাটি, পাই না। নন্দিতা দেখছিলো অনেক্ষণ ধরে। তাকে শেষমেশ জিজ্ঞস করাতে সে বলে, “টাকাকড়ি যা ছিলো সবই তো উড়িয়েছো। আজ বাজার করার টাকা ছিলো না, তাই তোমার ওই হাবিজাবি লেখা খাতাগুলো বেচে সব্জিবাজার করে এনেছি।” মনটা হায় হায় করে ওঠে। আমার সাধের খাতা কিনা শেষে পৃষ্ঠা হয়ে পচার দোকানে গেলো! দুঃখের কথা বন্ধুদের বলাতে তারা পিঠে হাত রেখে বললো, “দুঃখ করিস না ভাই। তোর লেখা তো পত্রিকায় কেও পড়লো না, এইভাবে অন্তত বিল্টুর মতো কেও চেয়ে তো দেখেছে। এটাই কি কম বড় পাওনা?”
একদিক থেকে ভালোই হয়েছিলো ব্যাপারটা। কথায় বলে সব সফল পুরুষের পেছনে একটি নারীর হাত থাকে। নন্দিতার গালাগালগুলো খেয়ে উপলব্ধি করলাম আমি মোটেও ভালো লিখি না। অন্য লেখকদের গালাগাল করাটা ছেড়ে দিয়েছিলাম, আর মন দিয়েছিলাম অন্য পত্রিকাগুলো পড়ার দিকে। কিছুদিন বাদে নন্দিতা আমার একটা লেখা হাতে ধরে আমার পিঠের উপর আলতো হাত রেখে বললো, “তোমার লেখার উন্নতি হয়েছে…।” সাধে কি বলে বৌ!!!

ক্রমশ …