মিডিয়া, প্রকাশনা আর লেখালিখির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এই তরুণ তুর্কির। এছাড়াও তথ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবেও সমাদৃত।

রেলকামরার বিভীষিকা

ট্রেনের কামরার দুই নম্বর সীটে খানিক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তড়িৎবাবু। আসলে হাওয়ার বিপরীত প্রান্তে একদম জানলার পাশের সীটে হাওয়া এসে সরাসরি গায়ে ধাক্কা দিলে বসার আরামটা ঠিক মনোরম হয়ে ওঠে না। তার উপর ধুলোবালিও নাকেমুখে এসে ঢোকে। বরঞ্চ এই দুই নম্বর সীটে জায়গা পেলে হাওয়াটা সরাসরি এসে ধাক্কা খায় জানলার পাশে উপবিষ্ট মানুষটির গায়ে। ধুলোবালিসমেত সেই তীব্র হাওয়া সেখানে ধাক্কা লেগে খানিক পরিশ্রুত হয়ে এবং তার গতিবেগ কমিয়ে কিছুটা মৃদু হয়ে তারপর গরমে হৃদয় জুড়িয়ে দেয় দুই নম্বর সীটের উপভোক্তাকে। তিন নম্বরে যেতে যেতে সেই হাওয়া আরও মৃদু হয়ে চতুর্থ নম্বরের ঠিক আগে বিলীন হয়ে যায়। সুতরাং দুই নম্বর সীটটি বড়ই মনোমুগ্ধকর যে কোনও নিত্যযাত্রীদের কাছে। তাই খানিক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তড়িৎবাবু।
হঠাৎ এক ঝটকায় ঘুম ভেঙে গেল। সামনের থেকে কেউ ধাক্কা দিয়েছে। কৃষ্ণনগর থেকে ট্রেনে উঠেই এমন জায়গা পেয়ে আজ মনটা বেশ প্রসন্ন হয়ে উঠেছিল তার। মোটের উপর গাড়ি ভর্তি থাকলেও ছাড়ার সময় বসার সারির মাঝখানে কেউ এসে তখনও দাঁড়ায়নি। হাওয়াও গায়ে লাগছিল ঠিক যেমনটি চাই। তাই খানিক তন্দ্রা আসায় একটা স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। হঠাৎ ঝাঁকুনিতে জেগে উঠেই তথৈবচ হয়ে পড়লেন মুহূর্তের জন্য। এদিক ওদিক চেয়ে ঠাওর করতে খানিক সময় লাগল তার। স্বপ্নজগত থেকে বাস্তবে ফিরে ভীড়ে ঠাসা ট্রেনে আত্মহদিস পেতে ঠিক যেটুকু সময় লাগে একজন মানুষের। জানলার দিকে চাইতেই চোখে পড়ল তার সামনের জায়গা ততক্ষণে ভর্তি। জানলার সামনে ওইটুকু জায়গাতেও এক ছোকরা বসে একদৃষ্টে তার মোবাইলের দিকে চেয়ে আছে, কানে হেডফোন। বেঁচে থাকা জানলার কোন থেকে একটুও হাওয়া আর ভেতরে আসছে না। জানলার পাশের ভদ্রলোককে ছেলেটার পাশ দিয়ে গলে আসা সামান্য হাওয়ার দিকে নিজের মাথাটি এগিয়ে দিয়ে সেটুকু হাওয়ার স্বাদ নিতে দেখে বড়ই বিমর্ষ হলেন তড়িৎবাবু। বেশ একটা স্বপ্ন দেখছিলেন, বড় বেয়াদপ এই ভীড় তাকে ধাক্কা দিয়ে সেই সুখস্বপ্নটা ভেঙে দিয়েছে।
কী স্বপ্ন যে দেখছিলেন আর মনে পড়ল না তার। এমনিতেও গরমটা বড়ই প্যাচপেচে। কামরায় তিল ধারণের জায়গা নেই মোটে। কয়েকদিন অফিসে খাটনি যাচ্ছে খুব, আরাম করার সময়ও পাননি বেশ কিছুদিন। গতসন্ধ্যায় ছটাক খানেক বৃষ্টি হওয়ায় আশাপূরণে সংযম রেখে দুই পাত্র পান করতেই সেই বৃষ্টি উধাও হয়ে গিয়েছিল। পরেরদিন আবার অফিস থাকার দরুণ বেশি উল্লাস ভালো নয়। অগত্যা রাতে স্ত্রীয়ের সঙ্গে একটু সোহাগ করার ইচ্ছে জেগেছিল। বিছানায় শোওয়ার পর সহবাসের প্রস্তুতিতে নীল নাইট ল্যাম্প জ্বালিয়ে সবেমাত্র বীথিকার গলায় ঠোঁট ঘষতে শুরু করেছেন কী হঠাৎ লোডশেডিং। সন্ধ্যেতে অল্প বৃষ্টির জন্য মাটির থেকে গরম উঠে ভ্যাপসাভাব আরও বাড়িয়ে তুলেছে এই রাতে। এমন লোডশেডিংয়ে পাখা ছাড়া আর উপায় নেই। হাতপাখা দিয়ে হাওয়া খেতে খেতে সহবাস করা যায় না, এমন গরমে বড়ই খাটনির সেই প্রক্রিয়া। তাই গতরাতে উভয়েই তাদের সদিচ্ছায় জলাঞ্জলি দিয়ে একে অপরের দিকে পেছন ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ক্ষোভে আর গরমে ঘুমও বেশিক্ষণ হয়নি। সকাল অবধি কারেন্টও আসেনি। বোধ হয় কোনও গণ্ডগোল হয়েছে।
ট্রেন ছাড়তেই তাই এমন মনোরম পরিবেশ পেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তড়িৎবাবু। তাকে ঘুমের মধ্যে ধাক্কা দিল কে, তাই দেখতে জানলার দিক থেকে চোখ টেনে সামনের দিকে আনলেন তিনি। কামরায় থিক থিক করছে ভিড়ে। সীটের সামনের জায়গাতেও গাদাগাদি করে লোক দাঁড়িয়ে। এদের মধ্যে কে ধাক্কা দিতে পারে সেই তদন্তে সামনে চাইতেই দেখলেন সেখানে একটা কালো মতো গোলগাল তানপুরান্যায় নারীজাতীয় অঙ্গবিশেষ। ঠিক একেবারে তার নাকের সামনে। তার ঘুম ভাঙানোর কারণটিকে দেখে বড়ই অস্বস্তি হল তড়িৎবাবুর। অঙ্গটির থেকে মাথার ভদ্রস্থ দূরত্ব বজায় রাখতে তিনি খানিক পিছিয়ে গেলেন দেওয়ালের দিকে। নিত্যযাত্রী হলেও তড়িৎবাবুর স্বভাবটি বড়ই বিনয়ী। পরিচিতেরা তাই শ্রদ্ধাসম্মানও করে বেশ। পরস্ত্রী তো দূরস্থান, পরনারীর চোখে চোখ পড়লেই তার মাথাটি আপনি থেকে নীচে নেমে যায়। রাস্তাঘাটে মেয়েদের বুক অবধি নেমে আসা আলগা জামার ফাঁক থেকে বিভাজিকা দেখতে পেলেই তিনি সটান অন্যদিকে মুখ ফিরে হন হন হাঁটা দেন। কিন্তু আজ ভীড়টা বড়ই বেশি। তাই সম্মুখের পরিপুষ্ট নারীঅঙ্গটি ট্রেনের দুলুনিতে বার বার তার দিকে আগুপিছু করে তাকে প্রায় দেওয়ালের সঙ্গে ঠেসে ধরেছে এতক্ষণে। এইভাবে বসে থাকা অসম্ভব। কিন্তু একবার উঠে গেলে এমন জায়গা যে এই ভীড়ে আর মিলবে না।
জানলা দিয়ে তিনি দেখতে চেষ্টা করলেন কোন স্টেশন। ছেলেটির পাশ দিয়ে দেখা গেল না। অস্বস্তি কাটাতে তিনি মাথা বাড়িয়ে জানলায় বসে থাকা ছেলেটিকে ডেকে বললেন, “কোন স্টেশন ভাই?”
ছেলেটি মোবাইলের থেকে মুখ না তুলে উত্তর দিল, “মদনপুর ঢুকছে।”
সবেমাত্র মদনপুর। এখনও শিয়ালদা যেতে সওয়া এক ঘন্টা। এতটা সময় দাঁড়ালে অফিসে ঢুকে আর কাজ করার উৎসাহ থাকবে না, যা গরম। আবার বসেও থাকা যাচ্ছে না সম্মুখের বস্তুটির কারণে। তাই ছেলেটিকে বললেন, “ভাই, একটু উঠে দাঁড়াও না। ভেতরে একটুও হাওয়া ঢুকছে না।”
“সরকারকে বলুন, আপনার জন্য এসি লাগিয়ে দেবে।” মুখ না তুলে ছেলেটি উত্তর দিল। আধুনিক পোষাক পরিহিত ছেলে। চুলের কায়দাও সেই রকমই আজব। এদের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। ভরা গাড়িতে গালাগালিও দিয়ে দিতে পারে। আজকালকার ছেলেদের কোনও বিশ্বাস নেই। ভদ্রস্থ কোনও উত্তর পেলে না হয় ছেলেটির দিকে মুখ বাড়িয়ে তার সঙ্গে আলাপ করে এই পরিস্থিতি খানিক সামাল দিতেন। এমন মিতভাষে সে উপায় নেই। সুতরাং তিনি আগের মতনই দেওয়ালের সঙ্গে সিঁটিয়ে গেলেন চুপচাপ।
চোখ তুলে সামনের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। এদিক ওদিকেও চাওয়ার জায়গা নেই আর, জানলাটিও অন্যের দখলে। মাঝে মাঝে হঠাৎই অঙ্গটিতে চোখ চলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে এদিক ওদিক কাঁহাতক চাওয়া যায়। মাথা নীচু করে কোলের দিকে চেয়ে বসে থাকলেন তিনি।
জানলায় বসে থাকা ছেলেটা বোধ হয় একটু নড়ল। খানিক দমকা হাওয়া ঢুকে এসে তড়িৎবাবুর শরীর ছুঁতেই ঘর্মসিক্ত চামড়া যেন শিহরিত হয়ে উঠল। চকিতে সামনের দিকে চাইতেই তিনি দেখলেন সেই হাওয়া তার সম্মুখস্থিত কালো জিন্স পরা অঙ্গ বেয়ে উপরে উঠে মেয়েটির সাদা শার্টের নীচে মিলিয়ে গেল। ফলে শার্টটিও হাওয়ার বেগে খানিক উপরে উঠল। ঠিক তখনই তড়িৎবাবুও কেঁপে উঠে সামনে তাকিয়েছেন। দেখলেন শার্টটির নীচে মেয়েটির দুগ্ধসফেদ কটিদেশ উন্মুক্ত। কালো জিন্স আর সাদা কটিদেশের মাঝে একখানি গোলাপী রঙের রেখা জিন্সের ভিতর থেকে উঁকি দিচ্ছে। এই দৃশ্য তড়িৎবাবু আর সহ্য করতে পারলেন না। বিষম কাশির দমক উঠে এল বুক বেয়ে। মাথাটিকে পাশের লোকটির সামনে এগিয়ে কেশেও নিলেন তিনি কয়েকবার। পাশের লোকটি ‘দাদা আস্তে!’ বলে সামলে নিয়ে আবার দেওয়ালে মাথা রেখে চোখ বুঁজলেন।
এরপর আবার স্বস্থানে ফিরে গিয়ে আর সামনের দিকে তাকালেন না। জানলার ফাঁক দিয়ে যেটুকু বাইরে দেখা যায়, তাকিয়ে থাকলেন সেদিকে। রেলের পাথর ছুটে পেছনের দিকে যাওয়া বাদে আর কিছুই চোখে পড়ল না। কিন্তু উপায়ই বা কী!
মদনপুর ছাড়িয়ে ট্রেন কল্যানীর দিকে চলেছে। সেখানে ট্রেন একটু হালকা হবে। যদিও পরক্ষণে আবার অন্য এক দল উঠে কামরা আগের চেয়েও বেশি ভরিয়ে তুলবে, কিন্তু সেই ফাঁকে নিশ্চয়ই এই অস্বস্তির কোনও সুরাহা হবে ভেবে তিনি পাথর দেখতে থাকলেন।
গতরাতে অবশ্য বিথীকাও রাজি হয়েছিল বেশ কিছুদিন বাদে। বছর বিশেকের দাম্পত্য তাদের। বিথীকার সঙ্গে তড়িৎবাবুর বয়েসের দূরত্বও মার্জিত। দুই ছেলে হয়ে গেলেও যৌবনের স্ফূর্তি অবশ্য কমেনি কারোরই, এখনও তাতে ঢলানি আসতে বছর দশেক দেরি আছে। আসলে ইদানীং তাদের দূরত্ববৃদ্ধির কারণ এসব কিছুই নয়। গরমই প্রধানত দায়ী। ছাপোষা চাকরি করলেও সংসারে সুখের কোনও অভাব নেই তড়িৎবাবুর। বিথীকার সঙ্গেও ভরপুর প্রেম আছে এখনও। তাকে তুষ্ট করার সব রকম উপায়ই আয়ত্ত করেছেন তিনি, ফলত গৃহে শান্তি বজায় আছে এবং বিথীকার শরীরের বাঁধনও এখনও আলগা হয়নি একটুও। তাকে দেখলে প্রায় প্রাপ্তবয়ষ্ক দুই ছেলের মা আজও মনে হয় না।
পাথরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এইসব কথা ভাবছিলেন। হঠাৎ মনে হল এই কথাগুলো এখন কেন চিন্তা করছেন তিনি! কখনই তো এসব মাথায় আসে না এতদিনের যাত্রা সফরে। মনে মনে ভারি রাগ হল সামনে দণ্ডায়মান মেয়েটির প্রতি। তার ওই নধর প্রত্যঙ্গটিই এর কারণ। তাই এই সব ছাইপাঁশ যত চিন্তা মাথায় আসছে তার। তবে মন্দের ভালো যে অন্য কারোর প্রতি নয়, বিথীকার শরীরের চিন্তাই তার মাথায় আসছে দেখে একটু আশ্বস্ত হলেন তিনি। আর যাই হোক তার চারিত্রিক গুণের অবক্ষয় হচ্ছে না। সামনের দিকে তিনি আর মোটে তাকাবেন না। বরং অন্যদিকে তাকিয়ে এইসব ভাবাই শ্রেয়।
কিন্তু কেন যে বিথীকাকে নিয়ে চিন্তার মধ্যে সামনের মেয়েটিকেও এনে ফেললেন তিনি তা বুঝতে পারলেন না। মেয়েটিও বলিহারি। এরা আইটি চত্বরের মেয়ে, পোশাক দেখে যা মনে হচ্ছিল। ভালো করে বুঝতে আড় চোখে অনিচ্ছাকৃত একবার চেয়েও ফেললেন তিনি। উঁচু লম্বা গড়ন, স্বাস্থ্যবতী। টকটকে চাঁপাফুলের মতো গায়ের রঙ, কানে হেডফোন। একমনে নিবিষ্ট হয়ে গান শুনে চলেছে। মুখের একটুখানিও দেখে ফেললেন তিনি অনিচ্ছাকৃত। ভরা গাল, দেখতেও বেশ হবে নিশ্চয়ই। আপাতত কল্যানী অবধি কোনওমতে যাওয়া যাক। তারপর নিশ্চয়ই পরিস্থিতির বদল হবে। ভাবতে ভাবতে তিনি লক্ষ্য করলেন তার চোখটা কীভাবে যেন আবার সেই প্রত্যঙ্গের দিকে এসে আটকে গিয়েছে। সম্বিত ফিরতেই মুখ ঘুরিয়ে তিনি রেলের পাথর দেখতে থাকলেন।
অঙ্গটি বেশ পুরুষ্টু। অনিচ্ছাসত্বেও কিছু মুহূর্তের জন্য চেয়েছিলেন সেদিকে। বিথীকার থেকেও নধর। আইটি সেক্টরের মেয়েদের ধরণই এমনধারা তিনি আগেও লক্ষ্য করেছেন রাস্তাঘাটে। এর কারণ কিছুই খুঁজে পেলেন না তিনি। ব্যাকপ্যাকটি তার সামনের দিকে ঝোলানো আত্মসুরক্ষার্থে। এই দেখে মেয়েটি নিশ্চয়ই ভদ্রঘরের বোধ হল তড়িৎবাবুর। নেহাৎই পরিস্থিতির চাপে পড়ে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ধৈর্য ধরে থাকলেই খানিকক্ষণ বাদে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। পথেঘাটে তো কত সময়ই কত অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই যেমন সেদিন শিয়ালদা থেকে ট্রেন ছাড়তেই নাকি অফিসের অবনীবাবুর বড় কাজ পেয়েছিল। তিনি বনগাঁ লোকালের যাত্রী। অফিসফেরতা ট্রেনে উঠলে একেবারে বনগাঁ অবধি নড়তেই পারেন না এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, নামা তো দূর অস্ত। তাই একদম চেপেচুপে সটান হয়ে চোখ বুঁজে ঠায় বনগাঁ অবধি ধরে রেখেছিলেন তিনি। শেষে ট্রেন থেকে নামার সময় ভীড়ের ধাক্কায় স্টেশনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আর শেষরক্ষা করতে পারেননি। তবে ধৈর্যে সাফল্য আসবে নিশ্চয়ই। এ তো আর অবনীবাবুর মতো বড় সমস্যা নয়।
কল্যানী স্টেশনে গাড়ি ঢুকতেই একগাদা লোক হুড়মুড় করে নেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তড়িৎবাবুর পাশে তিন নম্বরে বসে থাকা লোকটিও তাদের পিছু ধরল। জায়গা ফাঁকা হতেই চার নম্বর সিটের অর্ধেক ঝুলে থাকা লোকটি খানিক ভিতরের দিকে সরে এল। কিন্তু তখনও তড়িৎবাবুর সামনের অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি দেখে খানিক মনোক্ষুণ্ণ হলেন তিনি। এবার উদ্যোগী হলেন নিজেই। পিঠে একটা সশঙ্কিত আলতো স্পর্শ দিয়ে মেয়েটিকে ডাকলেন, “পাশে জায়গা আছে, বসো।”
মেয়েটি পিছন ফিরে তার দিকে তাকাল। চোখাচোখি হতেই তিনি বুঝলেন তার চিন্তাই সঠিক, মেয়েটি দেখতে বেশ। টান টান করে হর্সটেল চুল বাঁধা। বেশ ফরসা মুখমণ্ডল, একটা লালিত্যও আছে। কিন্তু গড়নে একটু ভারী। ক্ষতি কী, ও বসলেই আবার চারজনে ঠিক অ্যাডজাস্ট হয়ে যাবে। চার নম্বরের লোকটা আবারও ঝুলে যাবে খানিক বাদে আর তড়িৎবাবুও জানলার পাশের লোকটাকে ঠেলে দেওয়ালে চেপে দেবেন। মেয়ে মানুষের জন্য প্রত্যেক যাত্রীই অমন একটু আধটু অভিযোজন করে নেয়। মেয়েটি তার দিকে চেয়ে তারপর ফাঁকা জায়গা দেখে বলে উঠল, “আরে! থ্যাঙ্ক ইউ কাকু।” বলে বসে উদ্যত হল। তড়িৎবাবুও একটু জানলার ধারের লোকটাকে চেপে দিলেন অমনি।
মেয়েটি বসতেই তিনি বুঝলেন পরিস্থিতি যতটা সহজ হবে তিনি আশা করেছিলেন তা হল না। ততক্ষণে কল্যানী থেকে দ্বিগুণ মানুষ উঠে চারপাশ ভরিয়ে তুলেছে। সীটের সামনে এসে পারলে তাদের উপর উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে তারা। পাশের মেয়েটাকেও সীটের সঙ্গে ঠেসে ধরেছে সেই ভিড়। অতটুকু জায়গাতে সে সড়গড় হতে পারছে না বোধ করলেন তড়িৎবাবু। মেয়েটির বসার অঙ্গের অর্ধেকটি তার কোলের উপর উঠে আছে। পিঠের একাংশ দিয়ে তড়িৎবাবুকে চেপে ধরেছে সে দেওয়ালের সঙ্গে। কাঁধটা তার গলার সামনে ও থুতনীর নীচে এমনভাবে চেপে বসেছে যে নিঃশ্বাস নিতেও সমস্যা শুরু হল। এমনিতেই তিনি খুব একটা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী নন, ওই কাজচলতি যেটুকু। এমন অবস্থায় পড়ে কোনও মতে চিঁ চিঁ করে বললেন, “একটু দেখে, কাঁধটা সরান।”
মেয়েটি শুনে বলল, “ওহ স্যরি! যা ভীড়। আজকের ভীড়টা যেন একটু বেশি। শ্রাবণ মাস কিনা। ব্যারাকপুরেই হাল্কা হয়ে যাবে।”
“হ্যাঁ, তা ঠিক। তোমার অসুবিধা হচ্ছে না তো?”
“না না, দাঁড়ান, ঠিক করে বসছি।”
মেয়েটি একটু নড়েচড়ে উঠল ঠিক করে বসতে। এতে যদিও তড়িৎবাবুর শ্বাসরক্ষা হল বটে, তবে মেয়েটি তার কোলের উপর আরও খানিকটা উঠে পড়ল যেন। আর তক্ষুণি তিনি টের পেলেন তার কোলের একেবারে মাঝখানে সে উপবিষ্ট।
সমস্যাটা হতে শুরু করল কাঁচড়াপাড়া ছাড়ালে। ততক্ষণে ট্রেনের দুলুনিতে তার নিম্নাঙ্গের সঙ্গে মেয়েটির বসবার অঙ্গের বারংবার সংযোগস্থাপন ও প্রসারণ ঘটে চলেছে ট্রেনের দুলুনির তালে তালে। ফলত তড়িৎবাবু খানিকক্ষণ পর থেকেই তার কোলের একেবারে নিম্নপ্রদেশে তাপান্তর পরিস্থিতি উপলব্ধি করলেন। সেখান থেকে একটা গরম হল্কা যেন উপরে তলপেটের দিকে ধাবমান। অবস্থা বুঝে তিনি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে স্বগতোক্তি করলেন, “হে ঈশ্বর রক্ষা কর।”
এমনিতে তড়িৎবাবুর মতন মানুষই হয় না। পাড়ার মহিলারা পর্যন্ত তার সুখ্যাতিতে সারাদিন রত। মিতভাষী তড়িৎবাবুকে পাড়া বা অফিসের মহিলা কোনও দায়িত্ব দিলে তিনি স্মিত হেসে মাথা নীচু করে সেই দায়িত্ব পালন করে। তার মতো বিনয়ী মানুষ মেলা ভার। কিন্তু আজ যেন সেই স্থিতি বদল হতে চলেছে পরিস্থিতির চাপে। তিনি প্রাণপনে অন্য কথা ভাবতে চেষ্টা করলেন।
পাশের বাড়িতে তড়িৎবাবুর এক ছোট বন্ধু আছে। অফিসে বেরোনোর আগে বা ফেরার সময় সে জানলা থেকে ‘টা টা কাকু’ বলে। ছোটবেলার থেকেই বলে। এখন রাস্তায় দেখা হলেও তার নাম হয়ে গেছে ‘টাটাকাকু’। ছেলেটি বড় ভালো পড়াশোনায়। তার ছেলেদুটোর মতো বখাটে নয়। সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পাড়ায় আড্ডা, ক্লাবে ক্যারাম, রাতে ফূর্তি—পাকামীর আর কিছুই বাকি নেই। কে জানে দু-একটা প্রেম-টেমও করছে কিনা! প্রেমের কথায় মনে পড়ল বাচ্চাছেলে মিন্টুর মা সেদিন তাকে বাড়িতে একা পেয়েই চিনি চাইতে আসেনি তো! তড়িৎবাবু লক্ষ্য করে দেখেছে বিথীকা না থাকলেই মিন্টুর মা তার বাড়িতে কখনও চিনি, কখনও দুধ, কখনও ধারের টাকা শোধ করতে আসে। তড়িৎবাবু রান্নাঘরের খোঁজ রাখেন না। তাহলে মিন্টুর মা আসে কেন? নিশ্চয়ই কোনও মতলবে। যদি একদিন তাকে একা পেয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে! যদি ফাঁকা বাড়ির সুযোগ নেয়, তিনি পারবেন তো সামলাতে? ঢুকে কী কী করতে পারে মিন্টুর মা? বেডরুমে নিয়ে গিয়ে শার্টের বোতাম ছিঁড়ে তার ঊর্ধাঙ্গ নগ্ন করে—না না, ছি ছি—এসব কী ভাবছেন তিনি? এসব ভাবা উচিত না। মেয়েটির বসবার অঙ্গ তার সংযমসীমার উপরে উপবীষ্ট।
ঠিক তক্ষুণই তিনি বুঝতে পারলেন তার অন্তর্বাসটা হঠাৎ টাইট হতে শুরু করেছে। অবশ এক নিঃসাড় আগ্নেয়গিরি যেন বিস্ফোরণোন্মুখ। ধাপে ধাপে বেরিয়ে আসতে পারে গলিত লাভা। আগ্নেয়প্লাবিত করতে পারে প্রান্তর ও অরণ্যাদি। বড়ই কঠিন পরিস্থিতি।
কিন্তু তার এই অবস্থা যদি মেয়েটি বুঝতে পারে! ঘর্মাক্ত হয়ে উঠলেন তিনি। ভরা ট্রেনে যদি মেয়েটি শ্লীলতাহানির দাবী তুলে বসে তবে পাবলিকের একটা মারও মাটিতে পড়বে না। ভাবতে ভাবতে তার সংজ্ঞা যেন বিলুপ্ত হতে থাকল। কিন্তু কিছুতেই নীচের পরিস্থিতি বাগে আনা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে দুই ধরণের চিন্তা তাকে মানসিকভাবে পর্যূদস্ত করে তুলল। ফ্রয়েড সাহেবও বোধ হয় মানুষের মনের এমন পরিস্থিতির কথা কল্পনাও করে যেতে পারেননি। তড়িৎবাবুর নিম্নবর্গীয় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে কঠোর থেকে কঠোরোতর হয়ে উঠেছে। তিনি একবার ভাবলেন মেয়েটিকে বলেন পাশে সরে বসতে। কিন্তু তাকিয়ে দেখলেন চার নম্বরের পাশের হাঁটার জায়গার ভীড় এমনভাবে তার ঘাড়ের উপর এসে পড়েছে যে সে বেচারী মেয়েটির কোলের উপর শায়িত। মেয়েটি তড়িৎবাবুর কোলের উপর উপবিষ্ট এবং তড়িৎবাবু তার পাশের লোকটির কাঁধে মাথা রেখে ক্রন্দনোন্মুখ। আবেগে তার জামাটিও খামচে ধরলেন তিনি। লোকটি দেওয়ালের থেকে মাথা তুলে তার দিকে তাকিয়ে, “আঃ, কী হচ্ছে দাদা!” বলে আবার দেওয়ালে মাথা রেখে চোখ বুঁজল।
ট্রেনের দুলুনিতে বারংবার দুই প্রত্যঙ্গের এক চৌম্বকীয় ঘর্ষণে শেষ মুহূর্তের বিদ্যুদ্বাহ পরিস্থিতি ততক্ষণে তৈরি হয়ে গেছে তিনি নিশ্চিৎ হলেন। এতক্ষণে নীচের আগ্নেয়পর্বতটি জাগরিত হয়ে সদর্পে মাথা তুলে বিস্ফোরণের অপেক্ষায়। আর কয়েকবার কম্পনজনিত কারণ ঘটলেই গিরি তার ভিতর থেকে লাভা উদ্গীরণ শুরু করবে। কেন যে গতকাল বিথীকার সঙ্গে সহবাসোন্মুখ হতেই লোডশেডিং ঘটল! গতরাতে লোডশেডিং না হলেই আগ্নেয়য়গিরি আজ নিস্পৃহ থাকত। কম্পনজনিত কারণে তার এই হেন বিপর্যয় ঘটত না। কেন যে গরমের মধ্যেও তিনি নিজে থেকে অগ্রসর হয়ে বীথিকাকে রাজি করালেন না। কে বলতে পারত বীথিকাও রাজি হত না? কেন যে তিনি এই ভুল করলেন। বীথিকা তো কখনও তাকে না বলে না।
মেয়েটি এখনও কি কিছুই বুঝতে পারেনি? তার নীচের অবস্থার সমূহ পরিবর্তন কী সে ভীড়ের চাপে আদৌ টের পায়নি? নাকী টের পেয়েও চুপ করে আছে তা তড়িৎবাবুর বোধগম্য হল না। তিনি অফিস থেকে একবার দীঘাতে গিয়েছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে পত্নী ছাড়া। অমিয়টা এমন অসভ্য, কলকাতা থেকে এসকর্ট তুলেছিল কারোকে না জানিয়ে। মেয়েটি সারা ট্যুরে তাদের সঙ্গে ছিল। এরা এত প্রফেশনাল যে একটি বারের জন্যও কেউ বুঝতেও পারেনি যে মেয়েটি তাদের নব্যপরিচিত। এতই বন্ধুত্বপূর্ণ ও পরিস্থিতি সাবলীল এরা। এই মেয়েটিও সেইরকম কিছু নয় তো! কে জানে হয়ত বুঝতে পেরেও চুপ করে আছে। তড়িৎবাবু ভাবলেন নিজের কোমরটাকে নড়িয়ে গিরিগম্বুজকে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার থেকে সরিয়ে আনবেন। কিন্তু এই ঘটনায় মেয়েটি যদি কিছু বুঝতে পারে! হয়ত ভীড়ের চাপে অতটা খেয়াল করেনি। কিন্তু তিনি নড়েচড়ে উঠলেই যদি টের পেয়ে যায় গুপ্ত আগ্নেয়গিরি সম্পর্কে! যদি সে চেঁচিয়ে ওঠে ভীড়ের মধ্যে! নাঃ, তড়িৎবাবু আর কিছু ভাবতে পারছেন না। কোনও মতে এই অবস্থার থেকে চোখ বন্ধ করে মুক্তি চাইতে থাকলেন পরমেশ্বরের কাছে মনে মনে। কতক্ষণ তিনি চোখ বুঁজে ওইভাবে ছিলেন, সেই সময়ের হিসেব কেউ রাখেনি।
“কাকু, ও কাকু। ওরম বিড় বিড় করছেন কেন? আপনার কী অসুবিধা হচ্ছে? জল খাবেন?” পাশের থেকে মহিলাকণ্ঠের আওয়াজ পেয়ে সম্বিত ফিরল তড়িৎবাবুর। মেয়েটি ততক্ষণে তার কোলের থেকে নেমে পাশে বসেছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলেন ট্রেন সবে দমদম পেরোচ্ছে, ভীড় হালকা হওয়ায় চার নম্বরের লোকটি নেমে গেছে। বিস্তীর্ণ এলাকা ফাঁকা। তড়িৎবাবু দেহে আর কোনও সাড় পেলেন না। অবশ চিন্তায় আগ্নেয়গিরির কথা মনে পড়ল একবার। তার পরিস্থিতি ভালো কী মন্দ আর বোঝার ক্ষমতা নেই। সম্ভবত প্রদীপের শেষ সলতের মতো অবস্থা। প্রচণ্ড বাথরুম পেয়েছে, শিয়ালদহ নেমেই এক নম্বরে ছুটতে হবে।
“কাকু, আপনার অসুবিধা হচ্ছে না তো? আমি বিধাননগর নামব। আপনাকে কী কোনও হাসপাতালে দিয়ে আসব?”
চোখ মেলে দেখলেন সেই মেয়েটি তার দিকে চেয়ে প্রশ্নগুলি করে চলেছে। অস্ফূটে তিনি বললেন, “নাঃ, তার কোনও দরকার নেই। আমার শরীর ঠিকই আছে।”
“কী হয়েছে? ও দাদা, ঠিক আছেন তো? কী হয়েছিল দিদি” পাশ থেকে কে একজন প্রশ্ন করল।
“আজকে ট্রেনে প্রচণ্ড ভীড় হয়েছিল। তাই যা হয় আর কী এই গরমে। লাইনে ট্রেনও বাড়াবে না, যাত্রীদের ভোগান্তি। বলি অফিসটাইমে এই নয় বগির বদলে বারো বগি দিলে হয় না? এত পয়সা নিয়ে লোকে বিদেশে ভাগছে, আর মরছি আমরা। কাকু, আপনি যদি ঠিক থাকেন তো আমি এবার নামব। স্টেশন আসছে।”
“তুমি যাও মা। ভালো থেক, সুস্থ থেক। আমার চিন্তা করতে হবে না। আমি ঠিকই আছি।” বলে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
বিধাননগর স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াতেই মেয়েটি নেমে গেল। তড়িৎবাবু শেষ অবধি চেয়ে দেখলেন তাকে আর ধন্যবাদ দিলেন ঈশ্বরকে কোনও রকম দুর্ঘটনা না ঘটার জন্য। নইলে পাবলিকের মার কাকে বলে একবার তিনি দেখেছিলেন।
কিন্তু মেয়েটি কিছুই টের পেল না কেন—এই প্রশ্ন হঠাৎ তার মাথায় আসাতে ফাঁকা গেটের দিকে সরে গেলেন তিনি। পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখলেন অগ্নুৎপাত ঘটে গেছে কিনা। তেমন কিছুই বোধ হল না। কিন্তু এত সত্ত্বেও মেয়েটি কেন টের পেল না বুঝতে তিনি অন্য পকেটে হাত দিলেন।
হাতে ঠেকল অনেক অনিচ্ছা, বারণ সত্ত্বেও গেল মাসে ছোট ছেলে বল্টুর কথায় নতুন কেনা বড় স্ক্রীণের স্মার্টফোনটা। তড়িৎবাবু মনে মনে তার তারিফ করলেন। বল্টুর মুখে তিনি শুনেছেন ডমিনোজের পিজ্জার কথা। ফিরতি পথে সেখানে ঢুকবেন।