আলোক সরকার
লিখলেন – রজতকান্তি সিংহচৌধুরী

‘হাজার ঝরাপাতার বুকে পায়ের  চিহ্ন মর্মরিত আছে’
আজকের বাংলা  কবিতার অলংকার আলোক সরকারের (২৩.৩.১৯৩১– ১৮.১১.২০১৬) তৃতীয় প্রয়াণ বার্ষিকী সদ্যই পেরিয়ে এলাম আমরা।
মাত্র আঠারো বছর বয়সেই বাংলা কবিতার ত্রিবিধ ছন্দ ছিল তাঁর অধিগত। অথচ তখনই তিনি স্থির করেছিলেন এর বাইরে  নতুন ছন্দের অনুসন্ধান করবেন। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত,  অক্ষরবৃত্তে শুধু নতুন চলন আনাই নয়, প্রচলন করেছিলেন এক নতুন ছন্দের,  ‘আলোক সরকারের ছন্দ’ নামেই যা পরিচিত। এই ছন্দে পর্ব বিভাজন থাকবে, তবে পর্বগুলি হবে অসমান:
‘সারারাত খুব বৃষ্টি হয়েছে।
এত বৃষ্টি
জলে ভিজে ভিজে
গোলাপ আর চোখ মেলতেই পারছে না।’
‘উৎসব’, নিশীথবৃক্ষ(১৯৮২)
প্রথম কবিতা-বই ‘উতলনির্জন’ (১৯৫০) ছিল  পাঁচের দশকের কবিদেরও প্রথম বই। পরের বছরেই বেরুল ‘শতভিষা’ (১৯৫১), পঞ্চাশের কবিদের অন্যতম মুখপত্র, দীপঙ্কর দাশগুপ্তের সঙ্গে যে পত্রিকার সম্পাদনা আলোক সরকারের।অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এবং তরুণ মিত্রও ছিলেন ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত। বিশুদ্ধ কবিতাতেই  ‘শতভিষা’র অভিনিবেশ। দু-বছর পরেই বেরুবে ‘কৃত্তিবাস’ (১৯৫৩), সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আনন্দ বাগচি ও দীপক মজুমদারের সম্পাদনায়। স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার অঙ্গীকারে।
আসলে, পঞ্চাশের অব্যবহিত আগে বাংলা কবিতার মৌল লিরিক্যাল স্বর কিছুটা হলেও ব্যাহত হয়েছিল। একদিকে ‘যৌনতার কবিতা চাই’, অন্যদিকে ‘জনগণের কবিতা লেখো’  এই দুই পরস্পরবিরোধী শ্লোগানে বাংলা কবিতার শুদ্ধ স্বর হারিয়ে যেতে বসেছিল। নানা অর্থেই অগ্রজ অরুণকুমার সরকার তাই ‘শতভিষা’র পাতায় ‘বাংলা কবিতার একটি নতুন ধারা’ নামের এক নির্ণায়ক নিবন্ধে লেখেন,
‘সভামিছিল এবং শায়াশেমিজের পিছনে ছোটাছুটি করাটাই সকল যুগের সব কবির স্বধর্ম হতে পারে না।’ আলোক সরকার, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত,  সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখের নেতৃত্বে রচিত পঞ্চাশের নতুন কবিতাকে বুঝতে গেলে এই প্রস্থানটিকে জানা বাঞ্ছনীয়।
‘আমরা কবিতাকে আবার কবিতার কাছে নিয়ে যাব’ এই ছিল ‘শতভিষা’ তথা আলোক সরকারের অভিপ্রায়। যা কিছু কবিতা নয়, তাকে কবিতা থেকে বাদ দিতে হবে একেবারে। শুদ্ধ কবিতা বিষয়ে অনুজ কবি সুবোধ সরকারকে কবি বলেছিলেন, “বিশুদ্ধ কবিতা হচ্ছে সেই কবিতা যা কোনো বিষয়ের সঙ্গে জড়িত নয়। ধরো, বন্যায় অনেক লোক মারা গেছে, আমার মন  খুব খারাপ। সেটাকে বিবৃত করা তো খবরের কাগজের কাজ। বিশুদ্ধ কবিতা হচ্ছে এই মনখারাপটিকে সব কিছু বাদ দিয়ে প্রকাশ করা। যাঁরা পারেন, তাঁরা পারেন।”
অত্যাগসহন কবিবন্ধু অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের প্রথম বই প্রকাশের   সঙ্গেও জড়িয়ে আছেন আলোক সরকার।লিখেছেন অলোকরঞ্জন, “বয়ঃসন্ধিক্ষণের চৌকাঠ পেরিয়েও নিজের নামে কোনো বইপত্র প্রকাশের ব্যাপারে অপরিসীম কুণ্ঠা ছিল আমার।  ‘শতভিষা’ কবিপত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবার কারণও ছিল এর মঞ্চভীরু ধরন-ধারণ। একদিন সম্পাদকীয় বৈঠকে প্রথম কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করার কথা উঠতেই আমার নিভৃতচারী বিবাগী বন্ধু আলোক সরকারকে বললাম : ‘আসুন না, একসঙ্গে আমরা একটা বই প্রকাশ করি।’ দিন সাতেকের মধ্যে তাঁর সঙ্গে যুগলবন্দিতে সম্পন্ন হল ‘ভিনদেশী ফুল’ (১৯৫৭), তাও স্বরচিত কবিতার সংকলন নয়, নির্বাচিত ফরাসি কবিতার অর্ঘ্যপ্রসূন! সেদিক থেকে ‘যৌবনবাউল’ (১৯৫৯) আমার দ্বিতীয়
কাব্যগ্রন্থ। ”
অলোক-আলোক কৃত ভালেরি, ভের্লেন, মালার্মে, বোদলেয়ার প্রমুখের ষোলোটি  বিন্যাসবিধিবিহীন ফরাসি ‘বনফুলের পুষ্পাসব’ নিয়ে ‘ভিনদেশী ফুল’  বর্তমানে পুনঃপ্রকাশিত (আদম)।
অভিন্নহৃদয় কবিবন্ধু অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের প্রেরণাতেই আলোক সরকার এম. এ. পরীক্ষা দেন। তাঁরই উদ্যোগে আলোকের যোগদান বর্ধমানের শ্যামসুন্দর কলেজে,যেখানে বাংলার অধ্যাপকরূপে অবসরপ্রাপ্তি অবধি যুক্ত থেকে তৈরি করেছেন অজস্র উজ্জ্বল ছাত্রধারা। অবসরজীবনেও শ্যামসুন্দরের সঙ্গে তাঁর যোগ অব্যাহত ছিল।
শচীন্দ্রনাথ সরকার ও কনকলতার সন্তান আলোক সরকারের জন্ম ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ। কলকাতার কালীঘাটে। তাঁদের পারিবারিক ভদ্রাসন যদিও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সরিষায়। পাঁচ ভাইয়ের ভেতর তিনি চতুর্থ।  জ্যেষ্ঠ কবি অরুণকুমার সরকার। জননী কনকলতার কাছ থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে কবিতার প্রতি ভালোবাসা পেয়েছিলেন আলোক। কনকলতা তৎকালীন যুগে প্রচলিত বিয়ের পদ্য লেখায় ছিলেন সিদ্ধহস্ত। চোদ্দ বছর বয়সেই পিতৃহীন আলোকের কবিতায় তাঁর বাবার ছায়া এসেছে বারেবারে:
‘চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকছে বাবা বাবা তুমি কোথায় যাচ্ছ!/ দামাল সেই কিশোর তার বাবা পালিয়ে যাচ্ছে দূরে।/ মরা জ্যোৎস্নার বাঁশবন/ তার পাশে দ্রুত নেচে উঠল, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকছে।’
(‘ব্লেকের প্রতি’, যে-কোনো নিস্তব্ধ, ১৯৯৫)
ব্লেকের কবিতার মতো তাঁর কবিতাতেও হারিয়ে যাওয়া ছেলের কথা থাকে। কাদামাটির জগৎ পেরিয়ে উত্তরণের দিকে চলে যাওয়া  তাঁর কবিতা।
মাত্র উনিশ বছর বয়সে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উতলনির্জন’ (১৯৫০) -এর পাণ্ডুলিপি তিনি মায়ের পরামর্শে অগ্রজ অরুণকুমারকে দেখিয়ে নেন।অরুণকুমার যথারীতি কিছু শব্দের অদলবদল করেন। কিন্তু আত্মপ্রত্যয়ী আলোক বইটি ছাপতে দেওয়ার সময় অগ্রজকৃত এই বদলগুলি আর রাখেননি, তাঁর মূল পাণ্ডুলিপিই মুদ্রিত হয়।
এই আত্মবিশ্বাসেই স্বরবৃত্ত ছন্দের অভ্যস্ত দুলুনিকে বাদ দিয়ে নিত্যদিনের কথনভঙ্গিমার দিকে কবি এগিয়ে নিয়ে এলেন  অত্যন্ত অল্প বয়সেই। তৃতীয় কবিতার বই ‘আলোকিত সমন্বয়ে’ই তার পরাকাষ্ঠা।  গোড়ায় উদ্ধৃত ‘হাজার ঝরাপাতার বুকে পায়ের চিহ্ন মর্মরিত আছে’ চরণটি তো বটেই, গোটা বইটিই লেখায়  এই নতুন স্বরবৃত্তে, হঠাৎ দেখলে যাকে স্বরবৃত্ত বলে চেনাই যায় না:
‘মুহূর্তের পরিচয়ে জেনেছিলে অবিরোধী নিবিড় সমর্থন/
কালো কালো  গাছের ম্লান শাখায়-শাখায় করুণ প্রতিবাদ/
এবং সেই বাগান-ঘেরা দেয়াল সব-ই সঞ্চারিত অসীম শ্রদ্ধায়। /
যেন নদীর ওই পারের আলোছায়ার আবছা মৃত সুদূর সংবাদ।’.. (নামকবিতা,আলোকিত সমন্বয়)
কোন্ জাদুতে তিনি স্বরবৃত্তে নতুন চাল এনে তাকে মুখের ভাষার কাছে আনলেন? প্রথমত পর্বে পর্বে জোড় বেঁধে, দ্বিতীয়ত স্বরবৃত্তে এতাবৎ বহুলপ্রচলিত চতুঃস্বরের সীমানা ডিঙিয়ে। উদ্ধৃত চরণগুলিতে আমরা দেখব অনেক পর্বেই চিরাচরিত চার মাত্রার পর্বের  বদলে তিন মাত্রার ব্যতিক্রমী পর্ব। অন্যত্র তিনি পাঁচ মাত্রার ব্যতিক্রমী পর্বও এনেছেন : ‘হারিয়ে গেল প্রত্যাশিত প্রতিষ্ঠিত নাম।’
তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (দে’জ) রবীন্দ্র পুরস্কার পায় ২০০৬ সালে। জীবনের উপান্তে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার আসে ২০১৫ সালে,
‘শোনো জবাফুল’ (অভিযান) -এর সূত্রে।
তিনি লিখেছে,  ‘যা কিছু অর্জন সবই অভাবের প্রেক্ষিতে অর্জন’ (‘আশ্রয়ের বহিরগৃহ’,২০০৮)।আজীবন অগণন লিটল ম্যাগাজিন এবং ছোটো ছোটো প্রকাশনার আশ্রয়স্থল ছিলেন তিনি। তাঁর ‘অন্তর্লোক’ বইটি তাঁর কবিতা-ভাবনা এবং জীবনদর্শনের দলিল।
শঙ্খ ঘোষ এবং অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত  -সম্পাদিত বিশ্বকবিতার অনুবাদ-সংকলন ‘সপ্তসিন্ধু দশদিগন্তে’ (১৯৬২) আলোক সরকারের  অনূদিত কবিতার সংখ্যা সতেরো।ওই সংকলনে ধৃত জার্মান কবি ও শিল্পাচার্য শিলারের একমাত্র কবিতাটি তাঁরই অনূদিত।  একদিন বর্তমান প্রতিবেদককে স্মৃতি থেকে  এই কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন স্মৃতিধর কবি। কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’   অনুবাদ তাঁর এক উল্লেখ্য কাজ। তাঁর আত্মজীবনী ‘জ্বালানি কাঠ জ্বলো’।
১৮ নভেম্বর, ২০১৬ তাঁর মৃত্যু, অন্ত্রের ক্যান্সারে।হালতুর নন্দীবাগানের বাড়িতে। যোগ্য সহধর্মিণী মিনু সরকার এবং একমাত্র পুত্র অপ্রতিমকে নিয়ে যে-বাড়িতে  তাঁর দীর্ঘদিন বসবাস। আমৃত্যু তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল, তরুণদের আশ্রয়স্থল।
তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত অভিন্নহৃদয় কবিবন্ধু অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত লিখলেন ‘না-দেখা সে-ও আরেক দেখা’ নামে এক এলিজি। অলোকরঞ্জনের ‘তোমরা কি চাও শিউলি না টিউলিপ’ (২০১৭) বইয়ে বিধৃত এই কবিতার কয়েকটি চরণ দিয়েই আমাদের এই মিতাভিলাষ স্মৃতি-আচমন সমাপন করি  :
‘আসন্ন বইমেলার মুখে
শরৎমেঘের সিংহদুয়ার
তীর্ণ হয়ে চলে গেলেন আলোক সরকার ;
লিটল ম্যাগাজিনের মুখে
আজ নিদারুণ উত্তেজনা
এই তো সময় বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করবার’..
আগেই বলেছি লিটল ম্যাগাজিন ছিল আলোক সরকারের প্রিয় মাধ্যম। এরপরে অলোকরঞ্জন এনেছেন প্রয়াত বন্ধুকে নিয়ে অনেক আগে  লেখা ‘আলোক সরকার’ (ধুলোমাখা ইথারের জামা, ১৯৯৯) নামক আরেক কবিতার প্রসঙ্গ, যে-কবিতা লেখা হয়েছিল নায়েগ্রা জলপ্রপাত দেখে  আলোক সরকারের উচ্ছ্বাস দূরভাষে শোনবার পরে: ‘বস্টনের দিক থেকে যেই / যেই নায়েগ্রা দেখেছিল আলোক/কানাডা থেকে একই প্রপাত দেখতে গিয়ে পুষ্পস্তবক’
অতঃপর অন্তিম স্তবকে  :
‘বন্ধুকে দিই কৃতাঞ্জলি–
ক্ষীণ সাহসে তাই তো বলি:
না-দেখা সে-ও আরেক দেখা, আমার এ শোক না-হোক শোলোক!’