লেন্স কি কিসসা

ভদ্রলোক একটু খ্যাপাটে ছিলেন। আতশ কাঁচের ব্যাপারে তাঁর ছিল ভীষণ কৌতুহল। উনি নিজে চাইতেন আতশ কাঁচ তৈরি করতে । কিন্তু সেযুগের চশমা বিক্রেতাদের কাছে গিয়ে সে প্রক্রিয়া জানতে চাইলে , তারা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলো যে মোটেই নিজেদের ট্রেড সিক্রেট একটা আধপাগলা লোকের কাছে খোলসা করে দিতে তারা একটুও রাজি নয় ।

ভাগ্যিস উনি হাল ছেড়ে দ্যান নি !
একরাশ কাঁচ কিনে নিজেই ঘষে-টসে আতশ কাঁচ বানাবার চেষ্টা উনি চালিয়ে গেছিলেন ।

প্রথমেই কি আর সাফল্য আসে ? ওনার বেলাতেও আসেনি।
বেশ কিছুদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর , উনি অবশেষে আতশ কাঁচ তৈরির প্রক্রিয়ার কাছাকাছি পৌঁছলেন। ছোট জিনিস বড়ো দেখার সাধ পূরণ হলো ঠিকই , কিন্তু ততদিনে এই ভদ্রলোকের মারাত্মক নেশা চেপে গেছে।

ধীরে ধীরে নিজের কাঁচ ঘষার প্রক্রিয়াকে আরো উন্নত করে একটুকরো কাঁচ থেকে তিনি ভীষণ শক্তিশালী আতশ কাঁচ বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। ভাবলেন , বড়ো বড়ো চশমার দোকানী গুলোকে দেখিয়ে দেবেন যে তাঁদের চাইতেও ঢের ভালো লেন্স কেউ চাইলে তৈরি করে নিতে পারে।

যেমন ভাবা তেমন কাজ । তা বেশ কয়েক-সপ্তাহ-ব্যাপী খাটাখাটনির পর সেই কাঁচ তৈরি হলো ! খ্যাপা লোকটার আনন্দ আর ধরেনা । যাবতীয় ছোটখাট জিনিস সে বিরাট বড়ো দেখতে পাচ্ছে !

শুধু বইএর অক্ষর – টক্ষরের ম্যাগ্নিফিকেশন দেখে এবার আর তাঁর শখ মিটলো না। হঠাৎ কি যেন মনে হওয়ায় , উনি এক বিন্দু জল ফেললেন কাঁচের এক পিঠে । এবার , কাঁচের অন্য দিক থেকে সেই জলের বিন্দুতে তাকাতেই , চোখ কপালে উঠলো ওনার !

একি!! জল কোথায়! এ তো হাজার হাজার অচেনা প্রাণী শুঁড় নেড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরা কারা !

ভয় পেয়েছিলেন উনি , কিন্তু সেসবে আমল না দিয়ে , কাঁচটাকে একটা ফ্রেমে এঁটে , সাচ্চা বিজ্ঞানীর মত উনি মন দিয়ে নিরীক্ষণ করে গেছিলেন এই প্রাণীদের । এছাড়াও ভীষণ কাছ থেকে দেখেছিলেন ক্যাপিলারিতে রক্তচলাচল , মাসল ফাইবার , শুক্রাণু , এছাড়াও আরো অনেক কিছু ।

আমাদের চোখের সামনে কিন্তু দৃষ্টির অগোচরে যে অতিক্ষুদ্রদের এক অভাবনীয় পৃথিবী আছে , এটা উনিই বিশ্বের সামনে প্রথম তুলে ধরেছিলেন।

জলের মধ্যে ঝাঁকে ঝাঁকে যেসব প্রাণীদের উনি দেখেছিলেন , তাদের নাম দিয়েছিলেন ডিয়েরকেনস । আজ প্রমাণিত সেগুলো সবই ছিল এককোষী প্রাণী।

জীবনে একটিও বই লেখেন নি। কিন্তু যা দেখতেন , ভীষণ যত্ন নিয়ে , অনুপুঙ্খ বিবরণ সমেত তার ব্যাপারে লিখে পাঠাতেন রয়াল সোসাইটিকে । সেই প্রায় ৫৬০টি অমূল্য চিঠি বহুপরে প্রকাশ করেছিল রয়াল সোসাইটি।

উনিই বৈজ্ঞানিক গবেষণার উপযুক্ত প্রথম শক্তিশালী সিঙ্গেল-লেন্স মাইক্রোস্কোপের আবিষ্কর্তা আর মাইক্রোবায়োলজির জনক । খালি চোখে যাদের দেখা যায়না , তাদের নিয়ে আজ বৈজ্ঞানিকমহলে চলছে যত ঘাঁটাঘাঁটি , সেই সব কিছুর মূলে এই ডাচ বস্ত্রব্যবসায়ীর এক বিচিত্র খেয়াল , যার জন্যে আশপাশের লোকজন ওনাকে ভেবেছিল বদ্ধ উন্মাদ।

যে লেম্যান দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে পুঁথিগত বিদ্যা না থাকলেও স্রেফ ইচ্ছে , অনুসন্ধিৎসা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে বিজ্ঞানের অজানাকে জানার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব , সেই অ্যান্টনি ফিলিপস ভন লিউয়েনহক-এর আজ ৩৮৮তম জন্মজয়ন্তী।
শুভ জন্মদিনের প্রণাম এবং আজকের সমাজের কাছ থেকে অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানাই এই ডাচ বিজ্ঞানীকে।