গোলকচাঁপার গর্ভকেশর

ধীরে ধীরে কমে আসছে দিনের আলো, ঘনিয়ে আসছে সন্ধ্যা। অনেকক্ষণ হল হাততালি দেওয়া শেষ করে যে যার মতো নিজেদের ঘরে ঢুকে পড়েছে। কর্নিলিয়াস মাসকারানাস এখনও দাঁড়িয়ে আছে ড্রয়িংরুমের লাগোয়া ছোট্ট বারান্দাটাতে। আনমনা ভাবে তাকিয়ে আছে বাউন্ডারি ওয়ালের লাগোয়া গাছগুলোর দিকে। আজ জনতা কারফিউ-য়ের জন্য মালি আসেনি তাই গাছেদেরও কোনো পরিচর্যা হয়নি। বড় বড় গাছগুলোর বিস্তার মাটির ওপরে যতটা, নীচেও ততটাই। তাই এই একদিনের পরিচর্যার অভাবে কোনো হেলদোল নেই তাদের, মোটা মোটা শিকড় দিয়ে মাটির গভীরে সঞ্চিত জল টেনে নিয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু ছোট ছোট গাছগুলো, যাদের শিকড় মাটি ভেদ করে বেশিদূর যেতে পারেনি, তারা এই সামান্য অযত্নেই হারিয়ে ফেলেছে বেশ খানিকটা জীবনীশক্তি, নিস্তেজ হয়ে ঝিমিয়ে আছে জলের অভাবে। কর্নিলিয়াসের মনে হল এই ছোট ছোট গাছগুলোর অবস্থা অনেকটা ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ মানুষদের মতো। একদিন রুজি বন্ধ মানে সেদিন রুটিও বন্ধ।
মাস দুয়েক আগে, চাকরির মেয়াদ ফুরোনোর পর কর্নিলিয়াস যখন শারজা থেকে দেশে ফিরেছিল তখন ইন্টার-ন্যাশানাল এয়ারপোর্টগুলোতে বেশ কিছু মানুষকে দেখেছিল করোনা ভাইরাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য হাতে গ্লাভস আর মুখে সাদা সাদা মোটা মোটা মাস্ক পরতে। তখনও কি আর ও ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পেরেছিল ওই মারণ ভাইরাসের আক্রমণে ওর নিজের দেশের অবস্থা এতো অল্প সময়ের মধ্যেই এতো খারাপ হয়ে যাবে।
বছর পাঁচেক আগে বেশি টাকা রোজগারের আশায় কর্নিলিয়াস পাড়ি দিয়েছিল বিদেশে। সেখানে অপরিসীম কৃচ্ছসাধন করে বেশ খানিক টাকা সঞ্চয় করেছে। ইচ্ছা ছিল জমানো টাকা দিয়ে এবার একটা ছোটখাটো ব্যাবসা করবে। কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি, তাতে কি হবে কে জানে ? নতুন ব্যাবসা করা তো অনেক দূরের ব্যাপার, অনেক চেষ্টাচরিত্র করলেও এই অবস্থায় কোনো ছোটখাটো চাকরি জোটানোও বেশ মুশকিল।
“কাম কনি, কফি ইজ রেডি”, ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসছে ক্লিপসির গলা। হাততালি দিতে আসার আগেই কফি বানাবার ফরমায়েশ করেছিল কর্নিলিয়াস, এতক্ষনে তাহলে কফি বানিয়ে উঠতে পেরেছে ক্লিপসি। ঠান্ডা কফি একেবারেই পোষায় না কর্নিলিয়াসের, দেরী না করে নেটের ফিনফিনে পর্দাটা সরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল ও।
কম বয়স থেকেই চাকরির খাতিরে স্ত্রী ক্লিপসি আর ছেলে রায়ানকে পুনাতে রেখে দেশে-বিদেশে ঘুরতে হয়েছে কর্নিলিয়াসকে। কিন্তু এখন বয়স হয়েছে, শরীরটাও আর আগের মতো শক্তপোক্ত নেই; ফাস্ট-লাইফের সাইড এফেক্ট-এ সেখানে ঘুনপোকার মতো বাসা বেঁধেছে বেশ কিছু লাইফ-স্টাইল ডিজিস। শরীরের অসুখ প্রভাব ফেলেছে ওর মনের ওপরেও। সেখানেও মাকড়শার মতো জাল বুনেছে ভয়েরা; অসুস্থতার ভয়, অক্ষম হয়ে যাওয়ার ভয়, সর্বোপরি স্বজনবিহীন মৃত্যুভয়। তাই মন বার বার মন্ত্রণা দিয়ে চলেছে, এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি তো অনেক হল, এবার নিজ নিকেতনে, নিজের লোকেদের কাছে ফিরে চল। কিন্তু এতোদিনের দূরাবস্থান, নিজের লোকেরা কি আর নিজের থাকে ?
বছর তিনেক বয়স হয়ে গেলেও যখন মুখে বুলি ফুটল না রায়ানের তখন চেনাজানা সবাই বলল ওর কানে দোষ আছে। সেই শুনে ছেলেকে নিয়ে ই,এন,টি-র দারস্থ হল কর্নিলিয়াস আর ক্লিপসি। কিন্তু অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও রায়ানের নাক, কান, গলায় কোনো দোষ ধরা পড়ল না। অভিজ্ঞ ডাক্তার সবই বুঝেছিলেন কিন্তু নিজের থেকে কিছু বললেন না, শুধু এইটুকুই বললেন, রায়ানকে যেন একবার ভালো কোনো চাইল্ড সাইক্রিয়াটিষ্ট-কে দেখিয়ে নেওয়া হয়। সেইমতো পুনা শহরের নামী চাইল্ড সাইক্রিয়াটিষ্ট ভূষন শুক্লার কাছে ছেলেকে নিয়ে গেল ওরা। বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার পড়ল না রায়ানকে একবার দেখেই ডাক্তার শুক্লা ওর রোগ বুঝতে পারলেন। জানালেন রায়ানের অটিজম স্পেকট্রাম ডিসওর্ডার আছে।
একমাত্র ছেলে অটিস্টিক জানার পর কর্নিলিয়াস আর ক্লিপসি দুজনেই খুব ভেঙ্গে পড়েছিল। তবে ডাঃ, শুক্লা আশার আলো দেখালেন। উনি বললেন, অটিস্টিক মানে পাগল নয়, ঠিকমতো থেরাপি করালে রায়ান জীবনের মূলস্রোতে ফিরতে পারবে। উনি এটাও সাজেস্ট করলেন যে রায়ানকে ফর্ম্যাল স্কুলের বদলে কোনো স্পেশাল স্কুলে ভর্তি করতে। ডাক্তারের কথামতো রায়ানকে সুন্দরজি ইন্সটিটিউট অফ স্পেশাল স্কুল-এ ভর্তি করিয়ে দিল কর্নিলিয়াস।
সংসার সামলে আধপাগল ছেলের দেখাশোনা করতে করতে নাজেহাল অবস্থা হলেও হাল ছাড়ল না ক্লিপসি। একই রকম যত্ন নিয়ে দিনের পর দিন একটু একটু করে প্রশস্থ করতে লাগল ছেলের উন্নতির পথ। আত্মীয়স্বজনেরা ঝুড়ি ঝুড়ি সহানুভূতি দেখালেও সাহার্য্যের হাত বাড়িয়ে দিল না কেউই। আসলে কেউ সফল হলে, প্রতিষ্ঠিত হলে সবাই তার সাথে আত্মীয়তা রাখতে চায়। তাছাড়া কানা, খোঁড়া বা অন্য কোনো ভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী হলে তবু কথা ছিল কিন্তু রায়ান যে মানসিক প্রতিবন্ধী আর সাধারন মানুষের কাছে মানসিক প্রতিবন্ধীর কোনো রকমফের হয় না; তাদের কাছে মানসিক প্রতিবন্ধী মানেই বদ্ধ পাগল। আর সেই জন্যই রায়ানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বেশি টাকা উপার্যনের আশায় নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সারাজীবন এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়িয়েছে কর্নিলিয়াস। মুখ ফুটে একবারও ক্লিপসিকে বলেনি ওর একা থাকার যন্ত্রনার কথা। কর্নিলিয়াস বলেনি বলেই কি ওর দুঃখ চোখ এড়িয়ে গিয়েছে ক্লিপসির ? আর তাই ও এখন ক্লিপসির কাছে মানি ভেন্ডিং মেশিন ছাড়া আর কিছুই নয়।
ক্লিপসি অনেক আগেই কফি শেষ করে রায়ানকে নিয়ে রুটিন মাফিক কাজকর্মে মেতে উঠেছে। আর সেই রুটিনের কোথাও কর্নিলিয়াসের জায়গা নেই। এতোদিন পর ও আর ক্লিপসির জীবনযাত্রার কোথাও খাপ খায় না।
সন্ধ্যে হতে না হতেই ড্রয়িং-রুমের সব জানালাগুলোকে বন্ধ করে দিয়েছে ক্লিপসি। সুইচ অন করে দিয়েছে মসকুইটো রিপেলেন্টের। বোতলের ভিতরে থাকা স্বচ্ছ বিষময় তরলের জমাট বাঁধা সুগন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল কর্নিলিয়াসের। ও আবার বেরিয়ে এলো বারান্দায়।
সন্ধ্যে নামলেও চারিদিকের বৈদ্যুতিক আলোয় অনেকটাই কমে গিয়েছে প্রাকৃতিক অন্ধকারের তীব্রতা। কৃত্রিমতা, স্বাভাবিকতার সাথে অসম লড়াইয়ে নেমেছে। বিল্ডিং আর বাউন্ডারি ওয়ালের মাঝে পথচলা রাস্তায় পড়েছে কর্নিলিয়াসের ছায়া। কালো ছায়াটা যেন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে ধীরে ধীরে। এখন সন্ধ্যেগুলোকে কেমন মরা মরা লাগে কর্নিলিয়াসের; কেমন যেন নিস্তেজ, প্রাণহীন। ক্লিপসির সাথে ওর সম্পর্কের মতো।
লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিল কর্নিলিয়াস। এতো অপ্রাপ্তির মধ্যে শুধু একটাই পাওনা; দূরদেশে নিঃসঙ্গ অবস্থায় নয়, জীবনের শেষ সময় কাছে থাকবে স্বজনেরা। আর তাই এখন মৃত্যু এলেও দুঃখ নেই।
আবার ঘরের দিকে পা বাড়ালো কর্নিলিয়াস। এখনও সময় আছে। যে ভাবেই হোক ক্লিপসি আর রায়ানের রুটিনের মাঝে নিজের জায়গা করে নিতেই হবে ওকে।