গোলকচাঁপার গর্ভকেশর

কিন্তু ওখানে পৌঁছে কিছুক্ষনের মধ্যেই আশিষ বুঝতে পেরেছিল ওর সাধের গুড়ের ভেতর বালি পড়েছে, ও যেমনটা ভেবে এসেছিল তেমনটা বোধহয় আর হওয়ার নয়; ওর থেকেও সুদর্শন এক সুপুরুষ ইতিমধ্যেই নিজেকে সেঁটে দিয়েছে দেবাঙ্গীর সাথে, নির্দিষ্ট দূরত্বে থেকে পরম যত্নে পাহারা দিচ্ছে দেবাঙ্গীকে। তবুও মনের দুঃখ মনেই চেপে রেখে, সুসময় আসার অপেক্ষায় থেকে, সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে সচেতন প্রতিবেশীর দায়িত্ব পালন করেছিল আশিষ। রাজগৃহ হাউসিং সোসাইটির কিছু পরোপকারী আবাসিকদের সহায়তায় এই প্যানডেমিকের সময়, ভরা লকডাউনের মধ্যেও কোকিলাবেনের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি দেবাঙ্গীকে। ওদের হাউসিং থেকে একটু দূরে সালুঙ্কে বিহার রোডের ওপর বাঁশগাছে ঘেরা ছোট্ট শ্মশানটাতে এই করোনাকালেও নির্ঝঞ্ঝাটে সুসম্পন্ন হয়েছিল কোকিলাবেন রিন্দানীর দাহ-সংস্কার। অল্প কয়েকজনের উপস্থিতিতে মায়ের শ্রাদ্ধ-শান্তিও সেরে ফেলেছে দেবাঙ্গী। এই ক’দিন অন্যান্যদের মতোই রুটিনমাফিক ডিউটি করেছে আশিষ। কিন্তু শ্রাদ্ধের খাবার ছাড়া আর কিছুতেই হাত লাগাতে পারেনি। সদ্য ফোটা পদ্মফুলের মতো পবিত্র দেবাঙ্গীকে সব সময় আগলে রেখেছে সেবেস্টিয়ান নামের একটা কালকেউটে।
দেবাঙ্গীর অন্ধকার ঘরের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস নেয় আশিষ, ভেবেছিল গাছেরও খাবে তলারও কুড়োবে; নম্রতা যেমন সংসার সামলাচ্ছে তেমনই সামলাবে, ওকে ওর প্রাপ্য থেকে একেবারেই বঞ্চিত করবে না আশিষ। ও তো শুধু দেবাঙ্গীর সাথে নিজের শরীরটাকে জড়িয়ে নেবে, নিজেকে নয়। নম্রতা এতোদিনেও যা দিতে পারেনি সেটাই উসুল করে নেবে দেবাঙ্গীর কাছ থেকে, পরিবর্তে কোনো দাবিদাওয়া ছাড়াই দেবাঙ্গীকে চরম সুখ দেবে ও, যা দেবাঙ্গী এতোদিন পায়নি।
যত বাধাই আসুক না কেন কোনোমতেই আশা ছাড়বে না আশিষ। ও আবার আদাজল খেয়ে লেগে পড়বে। দেবাঙ্গীর ওই সুন্দর শরীর যতদিন না ভোগ করতে পারছে ততদিন আশিষের মনে শান্তি নেই। কিন্তু তা কি আর এখন সম্ভব? উত্তরহীন প্রশ্নটা একটা গভীর যতিচিহ্ন এঁকে দিল আশিষের কপালের মাঝখানে। কারন, এখানে পদ্মফুলটাকে কালকেউটে জড়িয়ে ধরেনি, ফুলটাই নিজেকে সঁপে দিয়েছে কালকেউটের কাছে, উপভোগ করছে তার বিষাক্ত সংস্পর্ষ।
এই ক’দিনে আর কিছু বুঝুক বা না বুঝুক একটা ব্যাপার বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে আশিষ, শুধু সেবেস্টিয়ানের চোখে নয় দেবাঙ্গীর চোখেও রয়েছে ভালোবাসার ছাইচাপা আগুন…সেবেস্টিয়ানের জন্য…
_______
মায়ের মৃত্যুর খবরটা পাওয়ার পর থেকেই একটা অপরাধবোধ জিগনেশকে কুরে কুরে খাচ্ছে। যে মা ছোটবেলা থেকে এতো আদর দিয়ে মানুষ করল, গায়ে একটা আঁচড় পর্যন্ত লাগতে দিল না, তার প্রতি কোনো কর্তব্যই পালন করেনি ও। সারাজীবন শুধু দুঃখ ছাড়া আর কিছুই দেয়নি মাকে। আর এখন অবস্থার ফেরে মাকে শেষ দেখাটা দেখতেও পেল না জিগনেশ। পারলো না পুত্রের জন্য নির্দেশিত পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম করতে। পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে সবকিছুই ঠেলে দিল নিঃসঙ্গ, অসহায় বোনের ঘাড়ে। সেই বোন, যে ওরই জন্য জন্ম থেকেই অবহেলিত। দেবাঙ্গী যদি মেয়ে না হয়ে ছেলে হোতো তাহলে হয়তো ব্যাপারটা অন্যরকম হোতো, ওকে হয়তো এতোটাও অনাদরে বড়ো হতে হোতো না। কিন্তু প্রথমবারেই পুত্রসন্তানের মুখ দেখে ফেলা কোকিলাবেন আর নীতিন রিন্দানী পরেরবারের এই কন্যাসন্তানটিকে একেবারেই মেনে নিতে পারেনি। কন্যাসন্তান মানেই একগাদা ঝামেলা, পণ দিতে একগাদা টাকা খরচ। দেবাঙ্গী ছিল একশো শতাংশ অনাহুত। আর তাই ওর জন্য বরাদ্দ ছিল শুধুই অবহেলা আর অনাদর। জিগনেশের ভালো খাওয়া, ভালো পরার পর যেটুকু অবশিষ্ট থাকতো সেটুকুই দায়সারা ভাবে জুটতো দেবাঙ্গীর কপালে। ওর অবশ্য তাতে কোনো দুঃখ ছিল না, ছিল না কোনো অভিযোগ; ও একরকম মেনেই নিয়েছিল নিজের ভবিতব্যকে। ওর প্রতি অবিচার হচ্ছে জেনেও কোনোদিন মুখ ফুটে কিচ্ছু বলেনি, বাবা, মা, দাদাকে কোনো অশ্রদ্ধা করেনি। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, বিয়ের পর যে ক’দিন মেঘনা শ্বশুরবাড়িতে ছিল সে ক’দিন মা ওর সাথে খুব খারাপ ব্যাবহার করলেও দেবাঙ্গী কোনো ঝামেলা করেনি, মেঘনাকে কোনো কড়া কথা শোনায়নি; হয়তো দাদার স্ত্রী বলেই।
বাইরের গরম থেকে বাঁচবার জন্য জানলা, দরজা বন্ধ করে একতলার এই ছোট্ট গেষ্টরুমটাতে দুপুর থেকেই এয়ার-কুলার চালিয়ে রেখেছে জিগনেশ, এখন পড়ন্ত বিকেল, কুলারের জোলো হাওয়ায় ঘরের ভেতর দমবন্ধ করা ভ্যাপসা গুমোট। কুলার বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এলো জিগনেশ। ঘরের লাগোয়া সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলো উপরের দিকে।
ফ্ল্যাট বা পেন্টহাউস নয়, ব্যাঙ্গালোরের দক্ষিণ অংশে কুমারাস্বামী লে-আউট-এ রয়েছে জিগনেশের নিজস্ব দোতলা বাড়ি, বিক্রম নগরে, সিক্সথ ক্রশ রোড অঞ্চলে। ব্যাঙ্গালোরে শিফট করার বছর কয়েকের মধ্যেই এই বাড়িটা কিনেছিল জিগনেশ, বাড়ির মালিক মারা যাওয়াতে তার বিদেশবাসী ছেলে সস্তায় বিক্রি করে দিচ্ছিল ‘নেস্ট’ নামের এই শান্তির নীড়টাকে। জিগনেশ ইচ্ছা করেই দোতলা বাড়ি কিনেছিল, ভেবেছিল বোনের বিয়ের পর যদি কোনোদিন বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক ঠিক হয়ে যায় তাহলে ওদের নিজের কাছে এনে রাখবে। কিন্তু বিধি বাম, দেবাঙ্গীর বিয়ের আগেই নীতিন রিন্দানী দেহ রাখলেন।
বাড়ি কেনার সময় মেঘনার বাবার কাছ থেকে কিছু অর্থ সাহায্য নিয়েছিল জিগনেশ, সে জন্য মাঝে মাঝেই কথা শোনাতো মেঘনা। বাবার মৃত্যুর পর মা আর বোনকে পুনাতে ফেলে না রেখে, নিজের কাছে এনে রাখার ইচ্ছা ছিল জিগনেশের। কিন্তু মেঘনা বেঁকে বসলো। কোকিলাবেনের ওপর একটা চাপা আক্রোশ তো ছিলই ওর, এই সুযোগে বদলা নিতে চাইলো; জিগনেশকে বলল, শাশুড়ি আর ননদকে নিজের সংসারে স্থান দেওয়ার কোনো প্রশ্নই উঠছে না বরং জিগনেশ এবার নিজের পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগ বুঝে নিক, রাজগৃহ হাউসিং সোসাইটির ওই বড় ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে মা, বোনকে কোনো এক কামরার ছোটো ফ্ল্যাটে পাঠিয়ে দিক, আর প্রাপ্য টাকা থেকে শোধ করে দিক মেঘনার বাবার কাছ থেকে ধার নেওয়া টাকাগুলো।
মেঘনার কথাগুলো একেবারে অযৌতিক ছিল না। বাবার শ্রাদ্ধ-শান্তি মিটে যাওয়ার পর সুযোগ বুঝে মায়ের কাছে কথাটা পেড়েছিল জিগনেশ। তাতে হিতে বিপরীত হল, অসন্তুষ্ট কোকিলাবেন এবার জিগনেশকে এক রকম ত্যাজ্যপুত্রই করে দিলেন। সেই থেকে আর পুনায় যায় না জিগনেশ। মাঝে মাঝে দায়সারা ভাবে ফোন করে মায়ের শরীরস্বাস্থ্য সম্বন্ধে খোঁজখবর নেয়, বোনের কবে বিয়ে হবে জিজ্ঞেস করে।
দোতলায় উঠতেই কারুকার্য করা দুটো বন্ধ দরজার দিকে চোখ চলে গেল জিগনেশের। দরজার ওপারে রয়েছে ওর পরম প্রিয় আপনজনেরা, এয়ার-কন্ডিশনারের নিঃশব্দ শীতলতায় বিশ্রাম নিচ্ছে তারা, আরামপ্রদ স্বাচ্ছন্দ্যে এক হয়ে গিয়েছে তাদের দু’চোখের পাতা। দোতলার এই দুটো বেডরুমের একটাতে থাকে জিগনেশের বড় ছেলে আয়ুশ, আর একটাতে মেঘনা আর ছোট ছেলে পিয়ুশ। আয়ুশের যা বয়স তাতে ওকে টিন-এজারই বলা চলে, এই বয়স থেকেই ওর স্পেস চাই, চাই প্রাইভেসি। ওর নিজস্ব দুনিয়ায় ওর বাবা-মায়ের প্রবেশ নিষেধ, একেই বোধহয় বলে জেনারেশন গ্যাপ।