শিব – পার্বতী এবং নন্দীমহারাজ

এই কাহিনীও মহাদেব ও পার্বতীর বিবাহ পরবর্তী বিশ্বভ্রমণ কালের। ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে জগতকে শিক্ষা দিতে আদি পরাশক্তি পার্বতীরূপে প্রথম শিষ্যার রূপ পরিগ্রহ করেন আর তাঁর প্রশ্নের জবাব দিতে আদিগুরু মহাদেব জীবনের চরম সত্য উন্মোচন করেন। এরূপ ই এক লীলায় উমা-মহেশ্বরের সঙ্গী হিসেবে যোগ দেন মহাদেবের চির অনুগত বাহন বৃষরূপী নন্দীমহারাজ। এরূপ ই একদিন মানবচরিত্র সম্পর্কে পার্বতী তথা জগৎকে শিক্ষা দিতে মহাদেব ধারণ করলেন এক বৃদ্ধ ব্যক্তির বেশ। পার্বতী হলেন তাঁর রূপলাবণ্যময়ী তরুণী ভার্যা।
“পার্বতী তুমি নন্দীর পৃষ্ঠে আরোহণ কর।“ স্বামীর কথায় পার্বতী বৃষবেশী নন্দীর পৃষ্ঠে ভ্রমণ করতে লাগলেন। বৃষের পার্শ্বে বৃদ্ধবেশী মহাদেব পদব্রজে চললেন। যখন এই বিসমবয়সী দম্পতি একটি গ্রামে প্রবেশ করলেন তখন গ্রামবাসীরা তিক্তকণ্ঠে বৃষপৃষ্ঠে আরূঢ় পার্বতীর সমালোচনা করতে থাকল।
“কি স্বার্থপর মেয়েমানুষ দেখ, নিজের হাত-পা শক্ত থাকতেও ষাঁড়ের পিঠে আরামে বসে আছে আর বুড়োটাকে হাঁটাচ্ছে।” গ্রাম্য মহিলাদের এহেন তীর্যক উক্তি তাঁদের লক্ষ্য করে উড়ে আসতে লাগল। তখন মহাদেব বললেন “পার্বতী ওরা তোমায় নিয়ে বক্রোক্তি করছে, এরপর বরং আমি বৃষপৃষ্ঠে আরোহণ করি আর তুমি পদব্রজে এস।” পার্বতী স্বামীর কথামত কাজ করলেন। এবার আগন্তুকদের প্রতি গ্রামবাসীদের মন্তব্য কঠোরতর হয়ে উঠতে লাগল। রূপযৌবনবতী পার্বতীর প্রতি মানুষের সহানুভূতি আর বৃদ্ধ শিবের প্রতি ক্রোধ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকল।
“কি শয়তান হতকুচ্ছিত বুড়ো! নিজে ষাঁড়ের পিঠে চড়ে অমন সুন্দরী মেয়েটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে? আহাগো অমন কোমল পায়ে ব্যথা লাগবে না?” এইরূপ রুচিহীন কদর্য বাক্যবাণ শ্রবণ করে এরপর উমা-মহেশ্বর উভয়েই নন্দীর পৃষ্ঠে আরোহণপূর্বক পরবর্তী গ্রামে প্রবেশ করলেন। কিন্তু এখানেও গ্রামবাসীদের সমালোচনার তীব্রতায় কোন পরিবর্তন এল না।
“কি নিষ্ঠুর মানুষ দেখেছিস, দুজনে মিলে ষাঁড়টার পিঠে চেপে বসেছে? আহা অবলা জীব বলে এভাবে কষ্ট দিতে হয়! ওদের চাপে বেচারা মারা পড়বে যে!” এহেন মন্তব্য শুনে দৈব দম্পতি স্থির করলেন সম্মুখে এই সমস্যা সমাধানের একটিই উপায় আছে। সেইমত তাঁরা নন্দীর পিঠ থেকে অবতরণ করে তার দুই পার্শ্বে চলতে লাগলেন। এইবার পথপার্শ্বে উচ্চকিত হাস্য শোনা যেতে লাগল।
“এরকম বোকাও হয়, একটা এত বড় ষাঁড় সাথে থাকতে দুজনেই কষ্ট করে হেঁটে যাচ্ছে!”
“দেখ পার্বতী, এই পৃথিবীতে সর্বদাই কিছু ব্যক্তি তোমার সমালোচনা করতে থাকবে। আমরা যায় করি অনুযোগ আর সমালোচনার কিছু না কিছু কারণ মানুষ খুঁজেই নেবে। তাই সর্বদাই অন্যে কি ভাবল বা বলল সে কোথায় কর্ণপাত না করে অন্তরাত্মা যা সঠিক বলে মনে করে তাই করা উচিৎ। এবং সর্বদা নিজের উপর বিশ্বাস রাখা কাম্য অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে কারণ একজন মানুষের পক্ষে সকলকে সন্তুষ্ট রাখা সম্ভব নয়। একথা মানুষ ভুলে যায় বলেই জীবনে সমস্যার সৃষ্টি হয়। তাই ভক্তি শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের সাথে নিজের কাজ করে যেতে হয়।
এইরূপ শিক্ষাদান করে স্বরূপে প্রত্যাবর্তন করে উমা-মহেশ্বর কৈলাসের পথে যাত্রা করলেন।
প্রসঙ্গত: এই কাহিনীটির সাথে ঈশপের এবং পঞ্চতন্ত্রের কাহিনীর মিল আছে। এর থেকেই বোঝা যায় স্থান ভেদে, গল্পকার ভেদে কাহিনীর চরিত্র ও বাহ্যিক রূপ হয়ত পরিবর্তিত হয় কিন্তু অন্তর্নিহিত শিক্ষা একই থাকে কারণ মনুষ্যচরিত্র মূলগতভাবে অপরিবর্তিত থাকে।