বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপিকা পদে নিযুক্ত আছেন। ইতিহাসের অধ্যাপনা ও গবেষণা ছাড়াও পুরাণ ও ভারতীয় সংস্কৃতিচর্চায় তিনি প্রবল আগ্রহী। বাঙালির জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনা তাঁর স্বপ্ন। এছাড়া ভালোবাসেন ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ করতে এবং লেখালিখির চেষ্টা করতে।

কলকাতার চার্চ (কোম্পানীর আমল) – পর্ব ১৪

আগের পর্বে কলকাতার প্রথম রোমান ক্যাথলিক তথা প্রথম পর্তুগীজ চার্চ কথা আলোচনার পর আজ আসা যাক দ্বিতীয় পর্তুগীজ রোমান ক্যাথলিক চার্চের আলোচনায় যার নাম Our Lady of Dolours-Nossa Senhora Desdores। বর্তমান শিয়ালদহ রেলস্টেশনের পশ্চিমে ফ্লাইওভারের নীচেই এই চার্চটি অবস্থিত।১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দে Grace Elizabeth নামক পর্তুগীজ বংশোদ্ভূত এক ধনী বিধবা বৈঠকখানা এলাকায় এই চার্চটি প্রতিষ্ঠা করেন।এলিজাবেথের সম্প্রদায়ের চারজন ব্যক্তি Deogo Praira, Joseph Praira, Philip Lees এবং Charles Cornelius তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন।১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল First Earl of Minto র কাছে তাঁরা এই চার্চ নির্মাণের অনুমতির জন্য আবেদন করেন যদিও অনুমতি পাওয়ার পূর্ব থেকেই চার্চের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসের মধ্যে এই নির্মাণকার্য সম্পন্ন হয়েছিল। ১৮১০ খ্রিস্টাব্দে চার্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে লর্ড মিন্টোকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি তাঁর অপারগতা জানিয়ে এক উৎসাহব্যঞ্জক পত্র নির্মাতাদের প্রেরণ করেছিলেন। পুত্র যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর পর শোকার্তা মাতা মেরীর উদ্দেশে গীর্জাটি উৎসর্গীকৃত হয়েছিল। কলকাতায় এটিই একমাত্র ক্যাথলিক চার্চ যেখানে বাংলায় প্রার্থনাসঙ্গীত গীত হত।
এলিজাবেথ বেলেঘাটা এলাকায় একটি জমি ক্রয় করে সমাধিক্ষেত্র রূপে ব্যবহারের জন্য চার্চটিকে দান করেন। খ্রিষ্টান ছেলেমেয়েদের জন্য ১৮১০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যার নাম ছিল St. Crysostom’s School. বাইবেল ছাড়াও ইংরাজি, পর্তুগীজ আর পাটিগণিত ও এখানে শেখানো হত। এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁকে সাহায্য করেন চার্চের প্রথম মিনিস্টার অগাস্টানিয়ান মিশনারী Antonio D’ Padua. বর্তমানে কলকাতার St. Lawrence’s School এই বিদ্যালয়ের উত্তরাধিকার বহন করে।এলিজাবেথ গ্রেস ১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দে এক পর্তুগীজ পিতা ও ভারতীয় মাতার ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সে কারণেই চার্চের নথিতে তিনি সুন্দরী ভারতীয় মহিলা নামে অভিহিত হয়েছেন। ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হলে চার্চের পশ্চাতে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। পর্তুগীজ ভাষায় রচিত তাঁর একটি এপিটাফ বা সমাধিলিপি চার্চে রক্ষিত থাকলেও মুর্গিহাটা চার্চের ন্যায় এখানেও তার কোন অনুবাদ অনুপস্থিত। নথি থেকে আরো জানা যায় Bishop of Malayapore এই চার্চের প্রাথমিক পর্বে যাঁর কোন একসময় আগমন ঘটেছিল তাঁর স্বাক্ষর সম্বলিত শ্রীমতী গ্রেসের একটি তৈলচিত্র ও চার্চে একদা সংরক্ষিত ছিল যা সময়ের সাথে চিরতরে হারিয়ে গেছে। অনুমান করা হয় চার্চের নামকরণ এলিজাবেথের ব্যক্তিগত শোকের স্মৃতি ও হয়ত বহন করেছিল।
অন্যান্য রোমান ক্যাথলিক চার্চের মতোই চার্চের অভ্যন্তর রঙ্গীন চিত্র, ধর্মীয় মোটিফ ও মূর্তির দ্বারা সুসজ্জিত। একটি নারীমূর্তি ভারতীয় পোশাকে সজ্জিত হয়ে ‘Our Lady of Success’ লেখাটি বহন করছে। চার্চের দেওয়ালে রঙ্গিন চিত্রের দ্বারা ‘The Station of the Cross’ প্রদর্শিত হচ্ছে। চার্চের দেওয়ালে কিছু স্মৃতিফলক বর্তমানকাল অবধি অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। সব মিলিয়ে এই দ্বিতীয় পর্তুগীজ চার্চটিও ইতিহাসের মৌন সাক্ষীরূপে বিদ্যমান।