পজেটিভ

জানলাটা খুলতেই ঘর সকালের রোদ্দুরে ভরে গেল।রায়না আজ অফিস যায় নি। কাল থেকে শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। কাল রাতেই বন্ধু মেঘনা প‌ইপ‌ই করে বলেছে টেম্পারেচার মাপিস,ফেলে রাখিস না। জ্বর বাড়লেই ফোন করবি টেষ্টের জন্য। শরীর ভালো না থাকলে কিছুই ভালো লাগে না। এই জানলাটা দিয়ে সামনের ঝাঁকড়া চুলের গাছটার সবুজ সতেজ বাহার দেখতে বেশ লাগে। এই গাছটায় সকালে নানারকম পাখি আসে। আপনমনে কিচিরমিচির করে চলে। সকালে অফিস থাকে বলে ব্যাস্ততার কারনে দেখা হয় না। এখন অখন্ড অবসর তাই জানলা দিয়ে রায়না সবুজ দেখছে আরওদের কিচিরমিচির শুনছে। দীপ দু’মাস হলো অফিস থেকে বদলি নিয়ে রায়পুর গেছে। এখন এই সাতশো স্কোয়ের ফিটের ঘরে রায়না পুরো একা। আবার মাথাটা টলে গেল। রায়না টেবিল হাতড়ে থার্মোমিটার নিয়ে দেখলো একশো দুই জ্বর। লতিকামাসির রান্নাঘর থেকে সিঙ্কে বাসন ধোয়ার আওয়াজ পেলো। ওর কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে, নিজের মতো ঘরে ঢুকে রান্না করে বাসন মাজে। রায়না আওয়াজ পাচ্ছে কিন্তু ডাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে।মোবাইল হাতড়ে দীপকে ফোন লাগিয়ে কথা বলতে পারলো না। কতক্ষন ঘুমিয়েছে জানে না। একটা চেনা আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেল। কেও জোরে ডোর বেল বাজাচ্ছে।জানলার বাইরে তখন বিকেলের রোদ ফুরিয়ে এসেছে। শরীরটা এখন বেশ ঝরঝরে লাগছে। বাবা! কতক্ষন ঘুমিয়েছে। লতিকামাসি রান্না করে টেবিলে গুছিয়ে চলে গেছে। বাইরের ডোর বেল তীব্র হচ্ছে। তাড়াতাড়ি মাস্ক পরে দরজা খুলে দেখে নামী ক্লিনিকের ব্যাচ লাগানো দুজন দাঁড়িয়ে।দীপ খবর দিয়েছে, ওরা টেষ্ট করতে এসেছে। রায়না ফাইল থেকে আঁধার কার্ড আনলো। চুকলো সোয়াইপ টেষ্ট পর্ব। ওরা পেশাদারী ভঙ্গিতে জানালো রিপোর্টের সফট কপি বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যে মোবাইলে চলে আসবে।রায়না দরজা বন্ধ করতেই দীপের ফোন, তারপর বাপী মা । ফোন পর্ব সেরে রায়না মুখ ধুয়ে টেবিলে বসলো। খুব খিদে পেয়েছে। ক্যাসারোল খুলে দেখছে বিরিয়ানি।এটা লতিকামাসি খুব ভালো রাঁধে। কি গন্ধ ছাড়ে। গন্ধেই অর্ধেক ভাত হজম। কিন্তু রায়না গন্ধ পাচ্ছে না কেন? সন্দেহ হ‌ওয়াতে বিরিয়ানি মুখে দিল, কোন স্বাদ পেলো না। ফ্রিজ খুলে কাঁচা লঙ্কা বের করে কচকচ করে চিবোলো। না কোন ঝাল নেই। অথচ পরশু বাজার থেকে আনা লঙ্কাগুলোর বেশ ঝাল সেটা ও কাল‌ই খেতে গিয়ে বুঝেছে। খাবার ছেড়ে বাথরুমে ডেটলের বোতল খুলে শুঁকলো। না গন্ধ পাচ্ছে না। ভয়ের চোটে দৌড়ে ড্রেসিংটেবিল থেকে সুগন্ধি পারফিউম বার করে শুঁকলো। এবার রায়নার বুকটা ধড়াস ধড়াস করতে লাগলো। তাহলে রিপোর্ট পজেটিভ আসবেই। জ্বরের সাথে সাথেই স্বাদ গন্ধ চলে গেছে। রায়না মনে মনে ভাবলো ছোট থেকেই বাপী বলতো মনটাতে নেগেটিভ কোন কিছুর বাসা বাঁধতে দিবি না। সব সময় মনে যেন পজেটিভিতে ভরা থাকে। রায়না সবসময় পজেটিভ মাইন্ডের। দীপকে ও কত বকুনি দিয়েছে নেগেটিভ কিছু ভাবার জন্য। কিন্তু কি অদ্ভুত আজ পৃথিবীর সব মানুষ তার রিপোর্টের দিয়ে তাকিয়ে আছে যেন নেগেটিভ আসে। পজেটিভ নয়। এক‌ই কথা কিন্তু সময় বিশেষে কত তারতম্য। দীপ আসতে চাইলে ও রায়না বারন করলো কারন ওর যদি রিপোর্ট পজেটিভ আসে তাহলে তো দীপ ও রায়নার সাথে চৌদ্দ দিন বন্দী। তারপর আবার দীপের টেষ্ট, নেগেটিভ এলে তবেই অফিসে জয়েন করতে পারবে। এত হ্যাপার চেয়ে রায়না একা ম্যানেজ করে নিতে পারবে। ফোন করে লতিকামাসিকে আসতে না করে দিল। শুধু ওর ছেলেকে হোয়াটসঅ্যাপে ওষুধ জিনিসপত্র যা যা লাগবে কিনে দরজায় ঝুলিয়ে দিতে বললো। ওর একাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেবে। বাকি অনলাইন ভরসা।
রিপোর্ট যথারীতি পজেটিভ। টেলিফোনে ডাক্তারের পরামর্শ মতো সব ওষুধ খাচ্ছে। হোম ডেলিভারি একটা মিল‌ই শেষ করতে পারছে না । মুখে রুচি নেই। খুউব দুর্বল। ইলেকট্রলটা পর্যন্ত জলে গুলে খেতে পারছে না। বন্ধু মেঘনা গাদা গাদা ফল হরলিক্স কিনে দরজায় ঝুলিয়ে চলে গেছে। কিন্তু সেগুলো নিয়ে খাওয়ার শক্তি নেই।
রায়না আজ বিকেলে একটু জানলাটা খুলেছিলো কারন এসি চালাতে পারছে না। তাই গুমোট গরম লাগছিলো। ফোনে সোসাইটি থেকে অবজেকশন জানালো জানলা খুলতে। পজেটিভ রোগীর জানলা খোলা থাকলে উল্টোদিকের মেসোমশাইদের অসুবিধা। রায়না তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করে দিল। অথচ দিন পনেরো আগে এই মাসিমাদের বাড়ির বাজার ওষুধ অফিস থেকে ফেরার পথে করে এনে দিয়েছে। প্রায় করে দেয়। গ্যাস বুকিং থেকে প্লাম্বার ইলেকট্রিশিয়ান ডাকা সব রায়না আর দীপের দায়িত্ব। ছেলে কানাডায় থাকে, বুড়ো বুড়ি একলা। রায়নার বুকটা মুচড়ে উঠলো। রায়না খুব পজেটিভ স্পিরিট বলে মাসিমারা কত প্রশংসা করতো, আজ পজেটিভ পেশেন্টের জানলা দিয়ে আসা হাওয়া ও বিষ। রায়না নিজের মনকে নিজেই ধমকালো, ছিঃ ছিঃ কি ভাবছে! রোগটা তো সত্যি ভয়ের। আসলে একা থাকতে থাকতে ওর মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেছে। কোন মানুষের মুখ দেখতে পারছে না। শুধু ডোরবেল শুনছে। খুলেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
__ শোন তোর কি সিম্পটম হয়েছিল রে? ইস্ একা আছিস? কি যে খারাপ লাগছে । কিন্তু এ এমন রোগ যে কেও যেতে পারবে না। জানিস তো আমাদের পাশের বাড়ির কুড়ি বছরের ছেলেটা আজ জ্বর হলো কাল শেষ! রায়না ফোনটা কেটে দিলো। এইরকম হাজার আত্মীয় প্রতিবেশীদের রায় শুনতে শুনতে ও ক্লান্ত। সব থেকে অবাক লাগে মানুষ একটা পজেটিভ মানুষ কে কি করে এত এত নেগেটিভ খবর দেয়, বোঝে না যে পজেটিভ ভাইব্রেশনে তাড়াতাড়ি ওর রিপোর্ট নেগেটিভ আসবে। ফোনের গ্রুপে, হোয়াটসঅ্যাপে ও গাদা গাদা মৃত্যু সংবাদে ওর ফোন ভরে গেছে।

টুকটুক করে আওয়াজে চোখ খুলে দেখলো জানলার। ওপারে দেবু দাঁড়িয়ে। ওদের ফ্ল্যাটের সিকিউরিটি গার্ডের দশ এগারো বছরের ছেলে। গতবছর লকডাউনের সময় থেকে ওর সাথে রায়নার ভাব। গতবছর তো দীপ আর রায়নার টানা ওয়ার্ক ফ্রম হোম ছিল।সেই সময় দেবু স্কুল ছুটি বলে বাবার সাথে আসতো। রায়না তখন ওকে ডেকে ঘরে বসিয়ে পড়াশোনা করাতো। ছেলেটার লেখাপড়ায় খুব মাথা। মাস্ক পরতো না। মাস্ক পরানো, হাত পা কিভাবে ধুতে হবে শেখানো সব রায়নার কাজ ছিল। ওর বেশ সময় কাটতো। পুজোর সময় দেবুর পছন্দের জামা , জুতো,গেম সব কিনে দিয়েছিল। এখনো এখানে এলেই দেবুর রায়নার কাছে চকোলেট আইসক্রিম বাঁধা।
রায়না বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ওপাশের নিয়নের আলোয় দেবুর মুখটা খুব অসহায় লাগছে। ও বোধহয় জেনে গেছে রায়না পজেটিভ। দেবু বন্ধ জানলার সামনে দাঁড়িয়ে ইশারায় বোঝাচ্ছে ও মাস্ক ঠিক মতো পড়েছে। হাত পা নাড়িয়ে আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করছে রায়না কাল ঠিক ভালো হয়ে যাবে। নানারকম অঙ্গভঙ্গি করে রায়নাকে হাসানোর চেষ্টা করছে। যেটা একসময় ওদের খেলা ছিল। রায়না এতদিনে প্রাণখুলে হাসলো। হঠাৎ দেবু পেছন ফিরে তাকালো, বাবা ডাকছে বোধহয়। বদ্ধ কাঁচের জানালার এপারে রায়না শুনতে পেলো না। দেবু ওকে টাটা করে দৌড়ে চলে গেল।
রায়নার মনটা আবার কালো অন্ধকার ডুব দিলো। ফোনে দীপ কলিং দেখো ও ধরতে ঈচ্ছে করছে না। বিছানায় এলিয়ে গেল। ভোর রাতে ওষুধের কল্যানে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়তেই ঘুমিয়ে গেছিল। ঠকঠক! ঠকঠক! এবার আওয়াজটা জোরে এলো। চোখ খুলে দেখে জানলার ওপারে দেবু ঢিল দিয়ে ঠুকছে। পর্দা সরানো ছিল, তাই খাটে শুয়ে সরাসরি ওকে দেখা যাচ্ছিল । ওপাশে তখন কড়া রোদ। দেবু একগাল হেসে ইশারায় দেখালো বক্স জানলায় রাখা একগাদা নাম না জানা বাহারি ফুল আর তার পাশে রাখা একটা কাগজ।
দেবু চলে যাবার পর রায়না জানলা খুলে ফুল আর পাতলা ফিনফিনে খাতার পাতা ছেঁড়া কাগজটা নিয়ে দেখলো অপটু হাতে আঁকা একটা খোলা চুলের মেয়ে জানলা খুলে রয়েছে। নীচে পরিস্কার ইংরেজিতে লেখা পজেটিভ + পজেটিভ= নেগেটিভ।
রায়না কাগজ হাতে চুপচুপ করে দাঁড়িয়ে র‌ইলো। শুধু দেওয়ালে থাকা টিকটিকিটা ঠিকঠক করে উঠলো।