সালিশির রায়

কিস্তি – ৭

দিদির মোনামুনির ঘটনাটা মনে পড়লে আজও সে লজ্জায় লাল হয়ে যায়। তার কথা মতোই দুদিন আগে পরে বিয়ে ঠিক হয় দিদি আর দাদার। দুজনের মোনামুনির অনুষ্ঠানও হয় দুদিনের ব্যবধানে। আদিবাসী সমাজে বিয়ের আগে মোনামুনির অনুষ্ঠানটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পাত্রপাত্রীর পাকা দেখা পর্ব চূড়ান্ত হওয়ার পরই হয় সেই অনুষ্ঠান। বিয়ের মাস খানেক আগে পাত্র – পাত্রী সহ দুই পক্ষের আত্মীয়-স্বজন , পাড়া-প্রতিবেশী আলাদা আলাদা ভাবে হাজির হতে হয় দুইগ্রামের মধ্যবর্তী কোন ফাঁকা মাঠে। দুইপক্ষকেই নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ে যেতে হয় মদ, খাবার, দাবার আর সরষের তেল।
পাত্রপক্ষের মেয়েরা পাত্রীকে আর পাত্রীপক্ষের মেয়েরা পাত্রকে দীর্ঘক্ষণ ধরে সেই তেল মাখান। এই নিয়মের কোন ব্যাখ্যা জানা নেই অঞ্জলির। কিন্তু ঠাকুমায়ের মুখে সে শুনেছিল , আসলে নাকি নতুন আত্মীয়তা স্বীকারের জন্যই ওইভাবে তেল দিয়ে তোয়াজ করা হয়। ঠাকুমায়ের ব্যাখ্যাটা আজ অনেকটাই যুক্তিপূর্ণ মনে হয় তার। তেল দেওয়ার অনুষ্ঠানের পরই উভয় পক্ষের লোকেরা গোল হয়ে দাঁড়ান , আর পাত্র পাত্রী আলাদা আলাদা ভাবে ঘুরে ঘুরে গুরুজনদের প্রনাম আর বাকিদের অভিবাদন জানায়। নতুন জীবনে প্রবেশের আগে ওইভাবে আর্শিবাদ আর শুভকামনা প্রার্থনা করে হবু নবদম্পতি। তারপর দুইপক্ষের আনা খাবার-দাবার একসংগে মিশিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে
পাত্র এবং পাত্রীপক্ষকে নিয়ে যে যার বাড়ি ফিরে যায়।
পরে নির্ধারিত দিনে হয় বিয়ে। আদিবাসী সমাজের এই সংস্কৃতিটা বেশ ভালোই লাগে অঞ্জলির। তার আজও স্পষ্ট মনে পড়ে দাদা-দিদির সেই মোনামুনির কথা।দিদির মোনামুনির দিনে বেশ মজা হয়েছিল। দিদির বিয়ের ঠিক হয় সারিপা গ্রামে। লা’ঘাটার রেলসেতুর কাছে বসেছিল মোনামুনির আসর। সকাল সকাল দুটো ভটভটি করে তারা পৌঁচ্ছে গিয়েছিল। পাত্রপক্ষ এসেছিল ম্যাটাডোর ভ্যানে। সে আর দিদি পিঠেপিঠি , দেখতে অনেকটাও একই রকম।তাই পাত্রপক্ষের মেয়েরা ভুল করে তাকেই তেল মাখাতে চলে এসেছিল প্রথমে।ভুল ধরা পড়তেই সবাই হেসে লুটোপুটি। আর সে লজ্জায় লাল হয়ে ওঠেছিল। তাই দেখে সবাই তাকে খ্যাপাতে শুরু করে। এমনি কি হবু জামাইবাবুর দাদুও মজা করতে ছাড়েন নি।
দু’বছর আগে দিদিমাকে হারিয়েছেন দাদু। সেই প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন — তা ভালোই হবে। আমারও গিন্নি নেই। তেলের ও অভাব নেই। তেল আমরা একটু বেশি করেই এনেছি। তোমরা বরং দুজনকেই তেল মাখাও।ছোটগিন্নিকে বিয়েটা না হয় আমিই করব।দাদুর ওই কথা শোনার পরই দুই পক্ষের লোকজন হেসে লুটিয়ে পড়ে। আর সে রাগ করে বলেছিল — ভালো হবে না বলে দিচ্ছি কিন্তু। আমি চললাম বাড়ি ফিরে। আর অমনি দাদু খপ করে তার হাত ধরে বলে — রাগ করছিস কেন দিদি , তোর সঙ্গে মজা করছি বই তো নয়। তোর সঙ্গে তো মজারই সম্পর্ক। একদিন তো চলে যাব। দেখিস সেদিন এই মজাটার কথাই মনে পড়বে।
দিদির বিয়ের বছর খানেক পর দাদু মারা যায়। নিজের দাদুর কথা খুব একটা মনে নেই তার। কিন্তু যতবার দিদির শ্বশুরবাড়ি গিয়েছে জামাইবাবুর দাদুর সঙ্গে হাসি- ঠাট্টা হয়েছে। মনে হয়েছে যেন নিজেরই দাদু। আজ দাদু নেই , কিন্তু দাদুকে ঘিরে নানা স্মৃতি আজও ভোলে নি সে।ভোলেনি দাদার বরযাত্রীর রাত্রিযাপনের অনুষ্ঠানের সেই রাতটার কথাও। দেখতে দেখতে একদিন দিদির বিয়েটাও হয়ে যায়। ধান বিক্রি করে বরযাত্রী এবং গ্রামের লোকেদের খাওয়ানোর জন্য আবার দুটো শুয়োর কেনা হয়েছিল। তোলা হয়েছিল দেদার মদও। গ্রামের সবাইকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল।প্রায় সকলেই ভরপেট মদ – মাংস খেয়ে গিয়েছে।
আসে নি কেবল মোড়লের পরিবার। চক্ষুলজ্জাই হোক কিম্বা দাম্ভিকতার কারণেই হোক তাদের বাড়িতে পাত পাড়তে ওরা আসে নি। কিন্তু তাদের জন্য বাড়িতে বয়ে খাবার দিয়ে এসেছে অঞ্জলিরা। এটাই নাকি দস্তুর। মোড়ল কোথাও না’ই যেতে পারেন, কিন্তু তার ভাগ তাকে পৌঁচ্ছে দিতেই হয়। সে শিকার কিম্বা ভোজ , যাই হোক না কেন মোড়লের বাড়িতে পৌঁছানো চাই-ই- চাই। না হলে মোড়ল কাকে কি ভাবে বিপাকে ফেলে দেবে তা মারাংবুরুও টের পাবে না। দিদির বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগে অঞ্জলির। ছোট থেকে দু’বোন একসঙ্গে থেকেছে। রাতে শুয়ে কত গল্প করেছে। বিপদ – আপদে একে অন্যকে সাহস যুগিয়েছে। সেই দিদি যখন শ্বশুরঘরে যাওয়ার জন্য বাড়ির বাইরে পা বাড়িয়েছে তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না অঞ্জলি।

দিদিকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সনমণি বোনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। দীর্ঘক্ষণ পর অঞ্জলিই দিদির হাত ধরে তাকে ভটভটিতে তুলে দিয়ে আসে। আস্তে আস্তে গ্রাম ছেড়ে চলে যায় ভটভটি। আর এক লহমায় গোটা বাড়িটাকে গ্রাস করে নেয় শুন্যতা । ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে অঞ্জলি। মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে স্বান্তনা দেন — কাঁদিস নে মা। তুই ভেঙে পড়লে দাদার বিয়ের কাজকর্ম কে করবে ? দাদার বৌভাতেই তো সনমণি আসবে। আমরাও যাব। বিয়ের পর মেয়েদের তো শ্বশুরঘরেই যেতে হয়। একদিন তো তোকেও যেতে হবে।

কথাটা মনে পড়তেই তার মুখে ফুটে ওঠে করুণ হাসি। দিদির সঙ্গে তার শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা ছিল অঞ্জলিরও। কিন্তু দাদার বিয়ের জন্যই তার যাওয়া হলো না। সে চলে গেলে বাবাকে সাহার্য্য করবে কে ? তাই মাসির দুই মেয়েকে দিদির সঙ্গে পাঠানো হয়।দিদি–জামাইবাবুকে নিয়ে ওরা একেবারে দ্বিরাগমনে দাদার বৌভাতের দিন ফিরবে। তাই দিদির জন্য মন খারাপ করারও অবকাশ পাই না সে। দিদির বিয়ে চুকতে না চুকতেই দাদার বিয়ের কাজে ঝাপিয়ে পড়তে হয় তাকে। দাদার বিয়ের ঠিক হয়েছিল সুঁন্দিপুরে। তাদের গ্রাম থেকে মাত্র কিলোমিটার তিনেকের পথ সুঁন্দিপুর। বিয়ের লগ্ন সেই মাঝ রাতে।তবু সন্ধ্যা নামতেই চাল-ডাল, তরি তরকারি আর আস্ত একটা শুয়োর নিয়ে চারটে ভটভটিতে করে রওনা দিয়েছিল তারা। কারণ মাঝখানে রান্নাবান্নার ব্যাপার রয়েছে।
আদিবাসী সমাজের বিয়ে ঘিরে এই আর এক নিয়ম রয়েছে নিশিযাপন। বরের সঙ্গে বরযাত্রীরা রওনা হলেও তাদের কিন্তু একসঙ্গে পাত্রীপক্ষের বাড়িতে প্রবেশাধিকার নেই। পাত্রীপক্ষের গ্রামের বাইরে তাদের অবস্থান করতে হয়। পাত্রীপক্ষের লোকেরা এসে শুধুমাত্র বরকে নিয়ে যায়। আর বাকিদের সেখানেই পাত্রপক্ষের বাড়ি থেকে আনা ওইসব জিনিসপত্র রান্না-খাওয়া করে নিশিযাপন করতে হয়। বিয়ে শেষে পাত্রীপক্ষের কেউ এসে আমন্ত্রণ জানানোর পরই বিয়েবাড়িতে যাওয়ার ছাড়পত্র মেলে বরযাত্রীদের। দাদার বিয়েতে সেই আমন্ত্রণ আসতে ভোর হয়ে গিয়েছিল। তাস্বত্ত্বেও বেশ ভালোই লেগেছিল অঞ্জলির। হই হুল্লোড়ে কেটে গিয়েছিল রাতটা। কেমন যেন পিকনিক পার্টির মতো মনে হয়েছিল তার। শীতের মরসুমে সে ফুল্লরাতলা , কংকালীতলায় একই রকম ভাবে পিকনিক পার্টিদেরও হইহুল্লোড় করতে দেখেছে। সেই রকম আনন্দ- ফুর্তির পাশাপাশি অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে গল্প করেই রাত কেটেছিল অঞ্জলিদের।নিশিযাপনের রাতেই আলাপ হয়েছিল দাদার বন্ধু হৃদয় দাসের সঙ্গে। সেই আলাপই তার জীবনধারাটা অন্য গতিপথে বইয়ে দিয়েছিল।

ক্রমশ…