সালিশির রায়

কিস্তি – ২৭

সেই সময় দরজার কড়াটা নড়ে ওঠে। বাবা এসেছে ভেবে সে লন্ঠন হাতে দ্রুত গিয়ে দরজাটা খুলে দেয়। কিন্তু দরজা খুলতেই দুটো হাত এগিয়ে এসে তার মুখটা চেপে ধরে। সে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। ধ্বস্তাধস্তিতে হাতের লন্ঠনটা ছিটকে পড়ে মাটিতে। পলতেটা তেল পেয়ে টিপটিপে বৃষ্টিতে ও দপ করে জ্বলে ওঠে। সেই আলোয় অঞ্জলি দেখতে পায় তার মুখ চেপে ধরে আছে মোড়ল পাড়ার সেই শয়তান ছেলেটা।তার মাথায় খুন চেপে যায়। এক মুহুর্তে ঠিক করে নেয় তার কি করণীয়। শয়তানটা তাকে ওইভাবে রান্নাচালার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। সে’ও বাধা দেওয়ার পরিবর্তে সেদিকেই পিছিয়ে যেতে থাকে। রান্নাঘরের কাছাকাছি যেতেই সে আচমকা বসে পড়ে। আর টাল সামলাতে না পেরে পা পিছলে মাঝ উঠোনে কাদার মধ্যে পড়ে যায় শয়তানটা। সেই সুযোগে পেরেকে ঝোলানো বঁটিটা নিয়ে অশোকের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। তার ওই মূর্তি দেখে ভড়কে যায় শয়তানটা। সে এক দলা থুতু অশোকের মুখে ছুড়ে দিয়ে বলে , তোকে কতবার বলেছি না আমার সামনে আসবি না। দেব এবার এক কোপ ?
—- কাজটা কিন্তু তুই ভালো করলি না।
—- কেন রে , কি করলে কাজটা ভালো হতো ? তোর গলা ধরে মুখে মুখ লাগিয়ে বসে থাকলে? খুব শখ না , মারবো মুখে মুড়ো ঝাঁটার বাড়ি।
—- খুব যেন সতী তুই , কেন ওই ছোঁড়াটার সঙ্গে তো বেশ মুখে মুখ লাগিয়ে বসে থাকিস।
—- বেশ করি, আমি কার সঙ্গে কি করব তা কি তোরা ঠিক করে দিবি ? নর্দমার কীট সব এক একটা।
— এর ফল তোকে একদিন ভুগতে হবে। দাঁড়া না ভোটটা পেরিয়ে যাক তারপর দেখাচ্ছি খেলা।
—- আবার কথা ? যা ভাগ, না হলে এক কোপে একটা পা ঝুড়ে দেব। কাউকে কিছু বলতে ও পারবি না। সারাজীবন ল্যাংচাবি।
সেই সময় বাইরে বাবার গলা পাওয়া যায়। ততক্ষণে শয়তানটা প্রাচীর টপকে পগারপার। সে পরম মমতায় বঁটি’টার গায়ে আলতো ভাবে হাত বুলিয়ে দেওয়ালে ঝুলিয়ে দেয়। বটি’টার দৌলতেই দু’দুটো শয়তানের হাত থেকে সে রক্ষা পেল।রাত পোহালে ভোট। তাই সে বিষয়টি বাবার কাছে চেপে যায়। একেই বাবার মাথায় ভোট নিয়ে চরম দুঃশ্চিন্তা। ভোটের ফলাফলের উপরেই অনেক কিছু নির্ভর করছে। ফল রামবাবুদের দলের বিরুদ্ধে গেলে তাদের পরিবারের উপর যে ঝড় একটা আছড়ে পড়বে তা নিয়ে কোন সংশয়ই নেই অঞ্জলির। শয়তানটাও সেই ইঙ্গিতই দিয়ে গেল। এর আগের দিন শোভন শয়তানটাও ভোটের প্রসঙ্গ তুলেই হুমকি দিয়ে গিয়েছিল তাকে। কানাঘুষোয় নান কথাও কানে আসে তার। বাবা মোড়ল হওয়ার পর আগের মতো আর সালিশি সভা ডাকা হয় না। ডাকা হলেও জরিমানা আদায় করা হয় না। অঞ্জলিই বাবাকে ওইসব কাজ থেকে দূরে থাকতে বলেছে। এর ফলে এতদিন যারা জরিমানার টাকায় আমোদ– ফুর্তি করেছে তারা বাবার উপর একটুও খুশি নয়।বরং বাবাকে মোড়ল পদ থেকে সরাতে ফন্দি ফিকির খুঁজছে। নেহাত রামবাবুরা শাসন ক্ষমতায় আছে বলে সরাসরি কিছু করতে পারছে না। তবে বাবার মোড়ল থাকা না থাকা নিয়ে তার খুব মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু আবার তাদেরকে আগের মতো বিপাকে ফেলা হতে পারে বলেই বাবার মোড়ল থাকার প্রয়োজনীয়তাটা অনুভব করে সে।
বাবাকে খেতে দিয়ে শুয়ে পড়ে সে। কাল সকাল থেকেই দম ফেলার ফুরসত মিলবে না। তাদের বাড়িতেই ক্যাম্প করেছে রামবাবুরা। ভোটারদের জন্য চা-বিস্কুট তো রয়েছেই , রয়েছে মুড়ি-ঘুগনি আর বুঁদিয়া। নেতা-কর্মীদের জন্য ভাতের ব্যবস্থাও থাকছে।আগের দিনই জিনিসপত্র কিনে রেখে গিয়েছেন।কাজকর্ম সব করার জন্য অবশ্য আলাদা লোক থাকবে। কিন্তু যেহেতু তাদের বাড়িতেই রান্না বান্নাটা হবে তাই তাকেই ফাইফরমাশ খাটতে হবে। সেদিন ভোর থেকে একে একে রামবাবুরা এসে পৌঁছোন। শুরু হয়ে যায় রান্নার তোড়জোড়। তারই মাঝে খবর আসে সুহাস কবিরাজের দলও ক্যাম্প খুলেছে ও পাড়ার সনাতন টুডুর বাড়িতে। শুনেই ভ্রু কুঁচকে যায় রামবাবুদের। এতদিন সামনাসামনি কোন বিরোধীদল ক্যাম্প খুলে বসতে পারে নি। এত সাহস সনাতন পেল কি করে তা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চর্চা চলে রামবাবুদের। ভাদু নামে দলের এক কর্মীকে ডেকে রামবাবু চুপিচুপি কি যেন বলেন। আর সে দ্রুত একটা ঝোলা হাতে বেরিয়ে যায়। সকাল থেকেই দেখছে ঝোলাটা সবসময় আগলে আগলে রাখছে ওই ছেলেটা। সকালে সেই যে ঝোলাটা এনে শুয়োরের খালি হুদরোতে ঢুকিয়ে রেখেছে , তারপর থেকে কাউকে আর যেতেই দিচ্ছে না সে দিকে।
ঝোলাটাতে কি এমন দামী জিনিস আছে ভেবে পায় না সে। ভাবার ফুরসতও পায় না সে। রামবাবু তাকে তাদের পাড়ার ভোটারলিষ্টটা আর অন্যান্য কাগজপত্রগুলো ঘরের ভিতর থেকে এনে দিতে বলেন। সেটা হাতে পাওয়ার পর রামবাবু রমেশ নামে আরও এক কর্মীকে বলেন , তুমি ১৮০০ ভোটারের মধ্যে কতজন ভোট দিল আর কতজন আমাদের এখানে মুড়ি ঘুগনি খেল তার হিসাবটা রাখো। তাহলেই কতজন আমাদের ভোট দিয়েছে তার একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে।রামবাবুর কথা শেষ হতে না হতেই সনাতনের বাড়ির দিকে বেশ কয়েকটি বোমা ফাটার শব্দ শোনা যায়। সেই সময় ভাদুকে ছুটে বাড়ির ভিতরে ঢুকতে দেখে অঞ্জলি। ব্যাপারটা আর বুঝতে কিছু বাকি থাকে না তার। ঝোলা রহস্যটা পরিস্কার হয়ে যায়। ঝোলাতে তাহলে বোমা রাখাছিল। এই জন্যই নিরাপদ দুরত্বে রেখে পাহারা দেওয়া হচ্ছিল!কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা শোরগোল শুনতে পায় সে।বাইরে বেরিয়ে দেখে পুলিশ সনাতনের ছেলে শোভন এবং মোড়ল পাড়ার অশোক সহ আরও কয়েকজনকে মারতে মারতে জীপে তুলছে। পুলিশের কথাবার্তা শুনে অঞ্জলি বুঝতে পারে , বোমা ফাটানোর অভিযোগে ওদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যায় তার।পুলিশ যাদের ধরেছে তাদের মধ্যে শোভন আর অশোক শয়তান হলেও কেউই বোমা ফাটাতে পারে বলে তার মনেই হয় না।
আসলে অলক্ষ্যে সবই রামবাবুর কারসাজি। তাহলে দীর্ঘদিন রামবাবুদের ক্ষমতায় থাকার এ’ও একটা চাবিকাঠি ? বিষয়টা আরও পরিস্কার হয়ে যায় রামবাবুর কথায়। বাড়ির ভিতরে ঢুকতে ঢুকতেই সে শুনতে পায় রামবাবু ভাদুকে জিজ্ঞেস করছেন , হ্যা রে তোকে কেউ দেখতে পায় নি তো ?
—– কি যে বলেন দাদা , এতদিন আপনি আমাকে এই চিনলেন ? আপনাদের হয়ে এই তো প্রথম কাজ করছি না। কখনও আমার জন্য আপনাদের মুখ পুড়েছে ?
— না না, তা নয়। তবে জানোই মিডিয়া ব্যাটারা এখন আমাদের খুব পিছনে লেগেছে। কোন রাজনৈতিক দল নয় , ওরাই যেন আমাদের বিরোধীপক্ষ। কোথাই কখন ঘাপটি মেরে বসে থাকবে তার ঠিক নেই। আর চুপি চুপি ছবি তুলে ছেপে দেবে। পার্টির কড়া নির্দেশ জেতার জন্য যা করতে হয় করবে , যতদুর যেতে হয় যাবে , কিন্তু জনসমক্ষে
ভাবমূর্তিতে কালি লাগানো চলবে না। তাই তখন তোমার ছবি দেখেও আমাদের বলতে হবে তুমি দুস্কৃতি মাত্র , আমাদের দলের কেউ নও।
—- সে তো দাদা আপনারা হামেশায় বলেন। তাতে অবশ্য আমাদের রাগ–অভিমান নেই। পুলিশে ধরলে কেবল ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থাটা করে দেবেন তাহলেই হবে। তবে এখানে আর সেটাও করতে হবে না। পুলিশ তো ওই শালাদেরই পাঁচজনকে তুলে নিয়ে গিয়েছে। ভয়ে আর ওদের কেউ আর ভোটকেন্দ্র মুখো হবে না। দাদা, আপনাদের মাথা বটে একখানা , কম্পিউটারও ফেল মেরে যাবে।
ভাদুর কথা শুনে রামবাবুর মুখে ফুটে ওঠে চওড়া হাসি। আর বিপদের আশঙ্কায় বুক ঢিপ ঢিপ করে তার। ভোট ফুরোলেই তো রামবাবুরা চলে যাবেন আর বিনা অপরাধে ওদের জেল খাটার জন্য তাদেরই তো আক্রোশের শিকার হতে হবে। রামবাবুর সে নিয়ে কোন দুঃশ্চিন্তা নেই। বরং দিনের শেষে ভোটের হিসাব কষতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। হিসাব করে দেখা যায় , ১৮০০ ভোটারের মধ্যে ভোট পড়েছে ১৭০০। মুড়ি খাবার জন্য পাতা লেগেছে ১৯০০।এর মধ্যে কর্মী, বাচ্চা এবং একই ব্যক্তির দু’বার খাওয়া বাবদ ৩০০ পাতার হিসাব বাদ দিলেও ১৬০০ ভোটার খেয়েছে তাদের শিবিরে। সেই হিসাবে তাদের কমপক্ষে ১৬০০ ভোট পাওয়ার কথা। হিসাবটা কষার পরই রামবাবুর মুখে আত্মবিশ্বাসের হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু অঞ্জলি বাইরে বেড়িয়ে দেখতে পায় তাদের বাড়ির পিছনে ডাই হয়ে পড়ে থাকা এঁটো পাতার সমপরিমাণ পাতা তো সনাতনের টুডুর বাড়ির পিছনেও পড়ে রয়েছে। তাই তার হিসাবটা কিছুতেই মেলে না।

ক্রমশ…