সালিশির রায়

কিস্তি – ৮

সেই আলাপই তার জীবনধারাটা অন্যখাতে বইয়ে দিয়েছিল। এর আগেও দাদার সঙ্গে বার কয়েক তাদের বাড়ি এসেছে ছেলেটা। তখন সে আলাদা করে তেমন মনোযোগ দেয়নি। দাদার মুখেই শুনেছিল, ওদের বাড়ি কাগাস গ্রামে।সে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।কিছু জমি-জমা আছে। বাবা সে সব দেখাশোনা করে।হৃদয়দা রাজমিস্ত্রির কাজ করে। এরই মধ্যে দিল্লি, মুম্বই,ব্যাঙ্গালোর থেকে হাত পাকিয়ে এসেছে। এলাকায় রাজমিস্ত্রি হিসাবে এখন তার নাকি খুব নামডাক। তার অধীনেই রোজ অনেক রাজমিস্ত্রী খাটে। দাদার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে বর‍যাত্রী হয়ে এসেছিল হৃদয়দাও।
সেই দিনই প্রথম সরাসরি কথা হয়েছিল তার সঙ্গে । খাওয়া– দাওয়ার পর হৃদয়দা মুম্বই — দিল্লির গল্প বলে মাতিয়ে রেখেছিল। সবাই মন্ত্র মুগ্ধের মতো গিলছিল সেই সব গল্প। মাঝে মধ্যে বড়ো মোবাইলে আদিবাসীদের নাচ-গানের ভিডিও দেখিয়েছিল। হৃদয়দার জন্যই কখন যে নিশিযাপনের রাত কেটে গিয়েছিল তা কেউ বুঝতেই পারে নি। মাঝে মাঝে মোবাইলে সবার ছবিও তুলছিল। তাকেও বিভিন্নভাবে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলেছিল সেইসব ছবি দেখিয়ে জানতে চেয়েছিল কোনটা তার পচ্ছন্দ। তার পচ্ছন্দের ছবিটা আমোদপুর থেকে বাঁধিয়ে এনে দেওয়ার কথা বলেছিল। সে ভীষণ লজ্জা পেয়েছিল, কোন কথা বলতে পারে নি। তাদের ওইভাবে কথা বলতে দেখে মাসতুতো, খুড়তুতো বোন এবং পাড়ার সমবয়সী মেয়েরা মুখ টিপে হাসাহাসি করে। ইঙ্গিত পূর্ণ নানা কথা বলে। আর তত লজ্জায় লাল হয়ে যায় অঞ্জলি। ভালো করে মুখ তুলে চাইতে পর্যন্ত পারে না।
হৃদয়দা অবশ্য কোন কথা গায়েই মাখে না। সমানে সবার সঙ্গে হাসি- মসকরা চালিয়ে যায়।খাওয়ার সময় তার সামনা-সামনি বসেছিল হৃদয়দা। খেতে খেতে যতবার সে মুখ তুলে চেয়েছে ততবারই দেখেছে হৃদয়দা আড়চোখে তাকেই দেখছে। কেমন যেন একটা শিহরণ খেলে যায় তার সাড়া শরীরে। এক অন্যরকম ভালো লাগায় ভরে যায় তার মন। ভেবে পায় না হলো কি তার ? ফেরার সময় হৃদয়দা তাদের ভটভটিতেই চেপে বসে। আর তার অস্বস্তি কয়েক গুন বেড়ে যায়। ভটভটি চালু হতেই হৃদয়দা তার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করে — কই বললে না তো কোন ছবিটা বাঁধিয়ে আনব , কোনটা তোমার পচ্ছন্দ ?
—- সে -তু —- বলতে গিয়েও কথা গিলে নিতে হয় তাকে। একে সম্পর্কিত বোনেরা সব তাদের দিকে চেয়ে আছে। তার উপরে হৃদয়দাকে কি সম্বোধনে কথা বলবে তা ঠিক করে উঠতে পারে না।
এমনিতে তাদের সমাজে লাটসাহেবকেও তুই-তোকারি করে কথা বলাটাই চল। কিন্তু এখন যারা বাইরে ঘোরাফেরা করে, স্কুল- কলেজে পড়ে তারা তুমি — আপনি করে কথা বলা শুরু করেছে। সে’ও স্কুলের স্যার কিম্বা অপরিচিতদের আপনিই বলে।কিন্তু সদ্য গোঁফ গজানো দাদার বন্ধুকে আপনি বলাটা কিছুটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে বলেই তার মনে হয়। আবার তুমি বলতেও কেমন যেন লজ্জা -লজ্জা লাগে। তাই সে দুদিক এড়িয়ে বলে — নিজের যেটা ভালো মনে হবে সেটা বাঁধিয়ে আনলেই তো হয়।ভাববাচ্যে এভাবে কথা বলাটা সে অরুণ স্যারের মুখে শুনেছে। মাঝে মধ্যে স্যারের বাড়িতে বিজ্ঞান পড়তে যায় সে। স্যার এমনিতে মানুষ হিসাবে ভালো।কিন্তু খুউব বদরাগী। নিজের এক আত্মীয়াকে বিয়ে করেছেন। দুজনে-দুজনকে চোখে হারায়। আবার খিটিমিটি লেগেই আছে।তখন দুজনে ভাববাচ্যে কথা বলে। স্যার যদি বলেন , এক কাপ চা দেওয়া হলে ভালো হত না। ওমনি স্যারের স্ত্রী বলতেন , আগে হাট ঘুরে আসা হলে ভালো হত না ?
পারস্পরিক ওই কথোপকথন শুনে তারা ছাত্র-ছাত্রীরা কত মুখ টিপে হেসেছে। কিন্তু দিদির সঙ্গে মনোমালিণ্য হলে কতবার যে তারা ভাববাচ্যের আশ্রয় নিয়েছে তার ঠিক নেই। তাকে ওইভাবে পরোক্ষে কথা বলতে দেখে কিছুটা হকচকিয়ে গিয়ে হৃদয়দা বলে — আমার পচ্ছন্দহলেই হবে , তখন রাগ দেখিয়ে কিছু বলবে না তো ? অবশ্য তুমি তো হিরোইন রেখার মতো সুন্দরী। রেগে কিছু বললে আমার ভালোই লাগবে। হৃদয়দার কথা শেষ হয়না বোনে্রা আড়ালে তার পিছনে রামচিমটি কেটে কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। যন্ত্রনা হলেও কিছু বলতে পারে না অঞ্জল। শুধু কটমট করে তাকায় বোনেদের দিকে। তারপর থেকে লজ্জায় সে আর কোন কথা বলতে পারে না। হৃদয়দা কিন্তু সমানে হাসি ঠাট্টা করে যায়। খুব সুন্দর কথা বলে হৃদয়দা। বোনেরা তাই তার কথাতে মজে যায়। খুব রাগ হয় তার। হৃদয়দা ওদের সঙ্গে কেন এত ভালো ভালো কথা বলবে ? সে মনে মনে চাই হৃদয়দা কেবল তার সঙ্গেই ওইভাবে কথা বলুক।
কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। মন খারাপ করে বসে থাকে। হৃদয়দার কথা ভাবতে ভাবতে কখন ভটভটি বাড়ির দোরগোড়ায় থামে টের পাই না সে। সম্বিত ফেরে হৃদয়দার কথায়। তাকে উদ্দেশ্য করে সে বলে – কই নামো , না বরকনের মতো তোমাকেও কোলে করে নামাতে হবে ? ওই কথা শুনে মুখে আবার রক্ত জমে তার। কোন কথা বলতে পারে না সে। ভাগ্যিস বোনেরা সব নেমে বাড়ি ঢুকে গিয়েছে। নাহলে ওরা শুনলে খেপিয়ে মারত। দাদার সঙ্গে দেখা করে তখনকার মতো বাড়ি চলে যায় হৃদয়দা। আর কেমন যেন এক মনখারাপে পেয়ে বসে তাকে। একদিন পরে বৌভাত। তার মানে হৃদয়দাও একদিন পরে আসবে। অঞ্জলি ভেবে পায়না, একদিনের আলাপেই হৃদয়দার জন্য কেন তার মন এতটা উতলা হয়ে পড়ল। বিয়েবাড়ির নানান ব্যস্ততার মাঝেও সে হৃদয়দার চিন্তা দুরে সরিয়ে রাখতে পারছে না। আচ্ছা হৃদয়দারও কি তারই মতো অবস্থা ? তারও মন কি এমনই উতলা ?
ভটভটিতে হৃদয়দা বলেছিল , সে নাকি রেখার মতো দেখতে। তাদের বাড়িতে অমিতাভর সঙ্গেরেখার একটা ক্যালেণ্ডার আছে। কাজের ফাঁকেই একবার সেটার সামনে আর একবার আয়নার সামনে নিজেকে মেলে ধরে। আর নানা রকম মিল খুঁজে পায়। ওই তো রেখার মতোই তার টানা টানা চোখ, পাতলা ঠোট, টিকালো নাক। ছিপছিপে শরীর। এর আগে তো কেউ তার রূপের সুখ্যাতি করে নি। তাই হৃদয়দার প্রতি এক অন্যরকম ভালো লাগায় ভরে যায় তার মন-প্রান। তাকে দেখতে, তার সঙ্গে কথা বলার জন্য তার মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কিন্তু বৌভাতের আগে সেটা সম্ভব নয় ভেবে মনটা খারাপ হয়ে যায় তার। কিন্তু বিকালেই একরাশ খুশিতে ভরে যায় তার মন। একটা প্যাকেট হাতে বাড়ির দিকে আসতে দেখা যায় হৃদয়দাকে। প্যাকেটটা তার হাতে তুলে দিয়ে বলে — আর্জেন্ট চার্জ দিয়ে বাঁধিয়ে নিয়ে এলাম। মিলিয়ে দেখো একেবারে রেখার মতো লাগছে।
— রেখা না আরও কত কিছু। ছবির দামটা কিন্তু নিতে হবে।
—– সে সময় মতো চেয়ে নেব সুদ সহ। দেবে তো তখন ?
চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে সে কেবল বলতে পেরেছিল —- জানি না যাও।

ক্রমশ…