ঢাকা টু মানিকগঞ্জ

কিশোর উপন্যাস

: শুধু ভালো, নাকি খুব ভালো?
: খুব ভালো।
: তোমরা শিশু, তোমাদের কষ্ট দেয়া ঠিক না। তোমরা আসবে বলে মুরগির গোশত আর সরু চালের ভাতের ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম।
: ধন্যবাদ।
: ডালটা কেমন হয়েছে?
: ডালটাও খুব ভালো হয়েছে।
: যে জাতি শিশুদের কষ্ট দেয় সে জাতি অসভ্য। সভ্য জাতি শিশুদের সম্মান করে। আমাদের দেশে নানাভাবে শিশুদের কষ্ট দেয়া হয়ে। শিক্ষার নামে কষ্ট দেয়া হয় সবচেয়ে বেশি। পিইসি, জেএসসি হলো শিশু নির্যাতনের নির্মম উদাহরণ। আর বেশির ভাগ মাদ্রাসা হলো শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের টর্চার সেল। রাষ্ট্র যেন অন্ধ ও বধির। শিশুদের দুর্দশা চোখে দেখেনা। শিশুদের কান্না কানে শোনে না। দেশভরা ফ্লাই ওভার আর মেট্রোরেলের কথা ভাবলে আমার বমি আসে।
ওসি সাহেবের কথা আমাদের ভালো লাগলো। এরই মাঝে দুইজন ওসির সাথে আমাদের পরিচয় হলো। দুইজনকেই দেখলাম ভীষণ শিশুপ্রেমি। এরকম শিশুপ্রেমি মানুষ এই দেশে আছে, বিশেষ করে পুলিশ বিভাগে তা আমাদের কল্পনায় ছিল না।
ওসি সাহেব বললেন: তোমরা যার যার বাবা-মাকে ফোন করো। তারা এসে তোমাদের নিয়ে যাবেন।
আমি বললাম: আমার বাবার নাম্বার আমার মুখস্ত আছে।
এ কথা বলতেই ওসি সাহেব তার সেলফোনটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন: ফোন করো।
আমি ফোন করলাম। বাবা রিসিভ করলেন। বললাম: বাবা, তুমি তো জানোই যে, কঙ্কনা আপুকে দেখতে বের হয়েছিলাম মাহাবুব ভাইয়ের সাথে। পথে নানা রকম ঘটন-অঘটন ঘটে। এখন আছি রমনা থানায়। তুমি এসে আমাকে নিয়ে যাও।
: কণে দেখতে গিয়ে কেউ থানায় গিয়ে বসে থাকে? বাস্তবে কোথায় যাচ্ছিলি, কী ঝামেলা করিস সেটা বল।
: তুমি থানায় এলেই সব শুনতে পাবে।
: আমি থানায় যাব না। উপরোন্ত তোর জন্য আরও একটা শিক্ষা রেডি করে রেখেছি।
: কী শিক্ষা?
: আমি সিদ্ধান্ত ফাইনাল করেছি।
: একবার বলো শিক্ষা, আবার বলো সিদ্ধান্ত। কী সিদ্ধান্ত বাবা?
: এখন কিছুই বলবো না।
: বাবা, এমনিতেই থানায় বসে আছি, তার ওপর আরেকটা টেনশনে ফেলে দিচ্ছো।
: আমি আরেকটা বিয়ে করবো।
: তুমি…..। কিন্তু কেন?
: তোকে প্যাঁদানী খাওয়ানোর জন্য।
প্যাঁদানী শব্দটা মানিকগঞ্জ থানায় বারেকের কাছে শুনেছিলাম। আমি বললাম: আমাকে প্যাঁদানী খাওয়ানোর জন্য আরেকটা বিয়ে করতে হবে কেন?
: আমি আরেকটা বিয়ে করলে তোর মা আত্মহত্যা করবে। তখন তুই চলে যবি সৎ মায়ের আন্ডারে। এর চেয়ে রিমান্ড আর হয় না। তোর মতো ঘাড়ত্যাড়া ছেলেদের সৎ মায়ের আন্ডারে দেয়া ছাড়া উপায় নেই।
: সব সৎ মা এক রকম হয় না। কোনো কোনো সৎ মা সৎ সন্তানকে নিজের সন্তানের মতোই আদোর করে।
: তোর কপালে সেরকম সৎ মা জুটবে না সে ব্যবপারে ১১০% নিশ্চিত থাক।
: বাবা!
: বাবা বাবা করবি না। চুপ থাক। বাবা ফোন কেটে দিলেন।
শিবলু বলল: আমার বাবা ভীষণ রাগি মানুষ। থানায় আছি এ কথা তাকে বলতে পারবো না।
বল্টু বলল: আমার বাবা খবর পেলে নিশ্চিত থানায় ছুটে আসবেন। কিন্তু বাবার নাম্বার আমার মুখস্ত নাই।
ওসি চিন্তিত হয়ে বসে রইলেন। মুখের মধ্যে জিহ্বাটাকে গোল করে ঘোরাতে লাগলেন যেন তার মুখে একটা ললিপপ আছে। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন: ঠিক আছে, আমি অন্য ব্যবস্থা করছি। তোমাদের সাথে আমার লোক যাবে। তোমাদেরকে যার যার বাসায় পৌছে দিয়ে গাডিয়ানের সই নিয়ে আসবে। আমি কাঁচা কাজ করি না।
আমরা স্বস্তি পেলাম। আসলে লোকটা অনেক ভালো। এদেশে দেখছি ভালো লোকের অভাব নেই, তারপরও এদেশের মানুষের এত বদনাম কেন? এত ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট কারা করে?
ওসি কলবেল টিপে সেন্ট্রি ডাকলেন। সেন্ট্রি প্রবেশের পূর্বেই হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করলো একটি মেয়ে। মেয়েটা হাফাচ্ছিল খুব। কাঁপছিল থরথর করে। রাগে নাকি ভয়ে কঁপছিল তা বোঝা যাচ্ছিল না। মেয়েটা রাগের সাথে প্রশ্ন করলো: আপনি কি অফিসার ইনচার্জ?
: জি। বসুন।
: বসবো না। বসার জন্য আসি নাই।
: কী বলতে চান বলুন।
: মাত্রই আপনার থানার সামনে থেকে দু’জন ছিনতাইকারী আমার ব্যাগ আর সেলফোন কেড়ে নিয়ে পালালো। থানার গেটের সামনে এরকম ছিনতাই! কল্পনা করা যায়! দেশটা কোথায় আছে একবার ভাবুন।
: আপনার ব্যাগে কী ছিল?
: হাজার দশেক টাকা ছিল। আর ছিল কিছু কসমেটিক্স এবং এমিটেশনের অর্নামেন্টস। আমার সেলফোনটা অনেক দামি। তারপরও বলবো, সেলফোন কোনো বিষয় না। বিষয় সেলফোনের মেমোরির ছবি ও ভিডিওগুলো। শিল্পকলা একাডেমিতে নাটক করতে এসেছিলাম। আমি ছিলাম নাটকের প্রধান নারী চরিত্র। পুরো নাটকের ভিডিওটা সেলফোন মেমোরিতে ছিল, ছিল অনেক স্থির চিত্র। এসব ফিরে না পেলে আমি পাগল হয়ে যাব। প্লিজ ইনপেক্টর, আর কিছু না হোক আমার মেমোরিকার্ডটা ফিরে পেতে হবেই।

চলবে