কু ঝিক ঝিক দিন

৩৫.

রবিবর্তিকা তৈরি হবার পর আমরা যেন হঠাৎ করেই ঘোষাল স্যার বা সোনালীদির মেয়ে ছাড়াও যে আমাদের একটা নাম আছে পাড়ায় তা জানতে পারলাম।প্রথমে শুধু নাচ গান হলেও এরপর শুরু হল নাটক।
পাড়ার দাদা বাসব দা,সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের দলে নাটক করতেন।আর কুট্টি দা রুদ্রশেখরের দলে।তবে কুট্টি দা আমাদের দলে যোগ দিয়ে নাটক নয়, স্ক্রিপ্ট বা নৃত্য নাট্যে পুরুষের চরিত্রে ওভার ভয়েস দিতে বেশি ভালো বাসত।অন্য দিকে বাসবদা একেবারেই নাটক অন্ত প্রাণ।তার নির্দেশনায় একের পর এক নাটক মঞ্চস্থ হতে শুরু হল।প্রথম নাটক চতুরঙ্গ।বিজন থিয়েটার।নাটক দেখতে এলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।এরপরের বার ঠিক হল বৃহন্নলা নাটক মঞ্চস্থ হবে।এই নাটকটি সৌমিত্রের লেখা ও পরিচালনা।এবং ভীষণ জনপ্রিয় একটি নাটক,নকসাল আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে। বাসবদা রিহার্সাল দেওয়াতে শুরু করলেন। প্রাথমিক অনুমতি তিনি নিয়ে রেখেছিলেন। এবার দলের পক্ষ থেকে আমাকে যেতে হবে লিখিত অনুমতি ও আর কি কি ফরম্যালিটি আছে তা পূরণ করার জন্য সৌমিত্র বাবুর কাছে।
সেই সময় রঙ্গনাতে তাঁর নাটক চলছে। জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও নাট্যকর্মী রমা গুহর মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে দেখা করার একটা সময় পাওয়া গেল।রমা মাইমা ছিলেন আমার পাশের বাড়ির দাদার (যে দাদার দৌলতে আমার বাবা বেঁচে ফিরেছিলেন) তার নিজের মাইমা।ততদিনে তিনি আমাদেরও মাইমা হয়ে গেছেন।সেই সময় তিনিও ওই দলে সৌমিত্র বাবুর সঙ্গে অভিনয় করছেন।এর আগে তিনি আমাদের নাটক দেখতে এলেও সেভাবে কথা হয়নি।কারণ তখন আমি মেক আপ রুমে। এবার হল।প্রণাম করলাম।অসাধারণ সুন্দর দেখতে, আর তেমনি ব্যক্তিত্ব।বললেন,তোমরা এতটুকু মেয়েরা ওই কঠিন নাটক করছ,আমার অবাক লাগছে।কতদূর এগিয়েছে প্রাকটিস?
সাহস করে বলে ফেললাম,একদিন আসবেন আমার রিহার্সাল দেখতে?যা যা ভুল আছে একটু দেখিয়ে দেবেন তাহলে।
বললেন,আমার তো এখানে নিয়মিত শো।তোমরা কোথায় রিহার্সাল করছ?
বললাম, সিঁথিতে।
উনি তখন রমা মাইমাকে বললেন,তুই তো এদের কাছাকাছি থাকিস।দেখিয়ে দে, আর আমাকে জানাস কেমন করছে।
এরপর লিখিত অনুমতি চাইলাম আর কি দিতে হবে এর জন্য তাও জানতে চাইলাম । কারণ শুনেছিলাম,তাঁর অনুমতির সঙ্গে সঙ্গে কিছু সাম্মানিক দিতে হবে।
আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন,একযুগেরও বেশি আগের একটা নাটক তোমরা এত ছোটো হয়েও করছ এটাই আমার অবাক লাগছে।তোমরা তো জন্মাওনি যখন এটা প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল।আর কেউ এই দুঃসাহসিকতা দেখাবার সাহসও পায়নি।তোমরা করছ এতেই আমি ভীষণ খুশি। তবে কেমন করছ সেটা দেখতে যাব।কবে তোমাদের শো?
জানালাম।তখনো যেহেতু লিখিত অনুমতি পাইনি তাই কার্ড ছাপা হয়নি।তিনি বললেন,কার্ড দিও।
আমি তখন আনন্দে আত্মহারা।আমার মায়ের প্রিয় অভিনেতা,বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অথচ তাঁকে এর আগে সেভাবে দেখার ও চেনার সৌভাগ্য হয়নি,তিনি বৈশম্পায়ন ঘোষালের মেয়ে না জেনেও নিজে থেকে সম্পূর্ণ অচেনা একটা দলের সতেরো বছরের কর্ত্রীকে বলছেন,কার্ড দিও,দেখতে আসব তোমাদের অনুষ্ঠান, এ যে কতখানি প্রাপ্তি।
তিনি জানতে চাইলেন, এই বয়সে এত পয়সা খরচা করে আমরা কিভাবে এসব করছি?
মায়ের উৎসাহে ও প্রাথমিক টাকা মায়ের দেওয়া শুনে বললেন,মাকে আমার শ্রদ্ধা জানিও। তোমরা তো এখন মঞ্চ পাচ্ছ,আমি কিন্তু বাড়িতেই প্রথম নাটক করেছিলাম।
আমিও মাত্র বারো বছর বয়সে আমাদের পাড়ার বাচ্চাদের নিয়ে প্রথম ছাদে চৌকি পেতে অনুষ্ঠান করেছি শুনে খুব উৎসাহ নিয়ে বললেন, জানো তো,শৈশবকালে আমরাও বাড়িতে তক্তাপোষ দিয়ে মঞ্চ তৈরি করে, বিছানার চাদর দিয়ে পর্দা খাটিয়ে ভাইবোন ও বন্ধুবান্ধবরা মিলে ছোট ছোট নাটিকার অভিনয় করতাম। বাড়ির বড়রাও প্রচুর উৎসাহ দিতেন। ক্লাস ফোর ফাইভে পড়ার সময় থেকেই আমার নাটকের নেশা প্রচুর বেড়ে গেল।
তখনই জানলাম,স্কুলের মঞ্চে প্রথম তিনি অভিনয় করেছিলেন ইংরেজি একটি নাটক- ‘স্লিপিং প্রিন্সেস’। যার জন্য পদক ও মেডেলও পেয়েছিলেন ।
তিনি বললেন,তুমি অভিনয় করছ?তোমাকে দেখতে ভালো,ফটোজনিক চেহারা।
আমি বললাম,না,আমার ইচ্ছে নেই অভিনয়ের।আমি নাচ করি।
বললেন,অভিনয় করতে পারো।নাচের সঙ্গে অভিনয়ের তীব্র যোগ আছে।
আমার খুব অবাক লাগছিল।আমার গলার স্বরের কারণে স্কুলে একের পর এক অনুষ্ঠান থেকে আমাকে বাদ দিয়েছে এই অজুহাতে, আর ইনি বলছেন অভিনয় করতে! মজা করছেন কি?
রমা মাইমা বললেন,এর পরের দুই বোনের অভিনয়ের শখ।এই নাটকে দুজনেই অভিনয় করছে।
আচ্ছা, বলে তিনি বললেন,তুমিও চেষ্টা করো।পারবে।
প্রায় উড়তে উড়তে বাড়ি এলাম।
এরপর রমা মাইমা কদিন প্রাকটিসে এলেন।একটা ডায়লগ ছিল,মিনতিকে ওরা গুলি করেছে.. এই ডায়লগটা আমাদের বন্ধু শাশ্বতী ঠিক ভাবে বলতে পারছিল না।মাইমা দেখিয়ে দিলেন।আর মিনতির বেশে আমার ছোটো বোন রম্যানির একটা ডায়লগ ছিল,ওরা ঘরে ঘরে তল্লাশি চালাচ্ছে, আমার ভীষণ ভয় করছে..
এই ডায়লগের পর যখন পুলিশ এলে তখন কিভাবে সে নকসাল নেতাকে বাঁচাতে গিয়ে পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দিল,এই সিনটা আর ওই মিনতিকে গুলি করেছে এই সিন এত রিয়াল হয়ে উঠল যে দর্শক বেশ কিছুক্ষণ চুপ। অনেকের চোখেই জল।তারপর হাত তালিতে হল ফেটে পড়ল।
পরদিন রমা মাইমা বাড়ি এসে জানিয়ে গেলেন পুলুদা খুব খুশি হয়েছেন।তিনি পিছনে দাঁড়িয়ে পুরোটা দেখেছেন এবং তোদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। সৌমিত্র চ্যাটার্জির ডাকনাম যে পুলু তখন প্রথম জানলাম।
আরও জানলাম কে তুমি নন্দিনীর ট্যুইস্ট নাচা, ফেলুদা,কোনীর বিখ্যাত খিদ্দা কখন যেন আমাদের খুব আপন হয়ে গেছেন।যদিও এরপর তার সঙ্গে বহু বছর আর দেখা হয়নি।যখন দেখা হল তখন আমি নাচ, রবিবর্তিকা সব ছেড়ে ভিন্ন এক পেশায়।
তবে রবিবর্তিকা শুধু একটা নাচ গান নাটকের দল ছিল না,তা ছিল আমাদের হৃদয়ের একটা অংশ,তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠল আমাদের স্বতন্ত্র পরিচয়।আমরা ক্রমশ এগিয়ে চলছিলাম আলোর বৃত্তের দিকে,যেখানে এরপর এক এক করে মঞ্চ মাতাবেন নচিকেতা সহ একাধিক জনপ্রিয় শিল্পী।আর আমরা সেই দলের মুখ্য স্থপতি হয়ে দাপিয়ে বেরাব কলকাতা সহ আশেপাশের সব নাম করা হল।
আসলে আমরা সাতজন বালিকা, যার প্রধানের বয়স তেরো,আর সর্বকনিষ্ঠের পাঁচ, আমার মায়ের উৎসাহে একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম,আর সেটাই পূরণ করার জন্য জানপ্রাণ লাগিয়ে দিয়েছিলাম।
আমাদের মনের যাবতীয় অশুভ, অন্ধকার, হিংসা,লোভ,প্রতিযোগিতা ত্যাগ করেছিলাম শুধু মাত্র একটা দলকে ভালোবেসে,উজার করে দিয়েছিলাম নিজেদের।
ক্রমশ বিজন থিয়েটার,রঙ্গনা,রবীন্দ্র সদন,শিশিরমঞ্চ,কলামন্দির থেকে তার ব্যপ্তি ছড়িয়ে পড়ছিল সমগ্র শহর জুড়ে, তারপর আমরা পাড়ি দিয়েছিলাম মফস্বলের পথে।
মা বলতেন,জীবনের অমূল্য সময়গুলো আনন্দে ভরিয়ে রাখতে হয়,শিল্প সংস্কৃতি সাহিত্য এগুলো হল পার্ট অফ লাইফ।জীবনের সবচেয়ে কাছের সঙ্গী এগুলোই।তাই অহেতুক জটিল ভাবনা,তুচ্ছতাচ্ছিল্য, মনোমালিন্য এসবকে স্থান না দিয়ে যখনই মন খারাপ হয় তখনই এগুলোর আশ্রয় নিতে হয়।তাহলে বাইরের হাজার ঝড় ঝাপটাও মনকে বিভ্রান্ত করতে পারে না।
মা নিজেও দেখতাম কোনও কারণে কষ্ট পেলে জোরে জোর নানান গান কবিতা করতেন,যতক্ষণ না মনের ভার লাঘব হত।আমার স্পিরিটুয়্যালিস্টিক বাবা যেখানে ধ্যানের মাধ্যমে মনকে শান্ত করতে বলতেন,সেখানে মা বারবার আমাদের সাংস্কৃতিক যোগসূত্র গড়ে দিতেন নাচ গান কবিতার মাধ্যমে। একটা সময় বুঝতে পারলাম, এই দুটো সমান্তরাল ভাবে কখন যেন সত্যি আমাদের ছোট ছোট দুঃখ, রাগ অভিমান,সব ভুলিয়ে দিল।আমাদের অজান্তেই মন বলল,
“তুমি, নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে॥
তব, পূণ্য-কিরণ দিয়ে যাক্, মোর মোহ-কালিমা ঘুচায়ে।”- (রজনীকান্ত সেন)

ক্রমশ…