সংগ্রামী লাহিড়ী নিউ জার্সির বাসিন্দা, বৃহত্তর নিউইয়র্ক বলা যায় | পরিচয় - শিক্ষায় প্রযুক্তিবিদ, পেশায় কন্সাল্ট্যান্ট, নেশায় লেখিকা | শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে বহুকালের সিরিয়াস চর্চা আছে, অল ইন্ডিয়া রেডিওর A গ্রেড শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী | উত্তর আমেরিকায় করোনা ভাইরাসের এপিসেন্টারে বসে বদলে যাওয়া প্রবাস-জীবনের ডায়রী লিখছেন |

করোনা – ধারায় এসো – 3

লকডাউনে ঈস্টার

স্থান – পারসিপেনি, নিউ জার্সি
দিন – বুধবার, এপ্রিলের আট তারিখ
এ ঘটনা এপ্রিলের প্রথম দিকের । আমারই পাড়ার গ্লোরিয়া – নামটা বদলে দিলাম – একাই থাকেন, সদা-হাস্যমুখ । বয়স হয়েছে, মুখের রেখায় রেখায় ফুটে উঠেছে ত্রিকোণমিতি । ছেলেমেয়েরা পালেপার্বণে এসে হাজির হয় । নাতিপুতিদের নিয়ে গ্লোরিয়া সোহাগ করেন । ক্রিস আর জুলিয়া তাঁর দুই নাতিনাতনী । দেবশিশুর মতো দেখতে । তাদের জন্যে লবস্টার বিস্ক মরা আঁচে বুড়বুড় করে ফোটে, আভেন থেকে চকোলেট কেকের সুগন্ধ ছড়ায় বাতাসে ।
গ্লোরিয়া নিয়ম করে দিনে একবার হাঁটতে বেরোন । মাঝেমধ্যে দেখা হয়ে গেলে আমার বাগান-বিলাসে উৎসাহ দেন, নিজের নাতিনাতনীদের খবরাখবর দিয়ে থাকেন । খুব ধর্মপ্রাণ । তাঁরই উৎসাহে তাঁর সঙ্গে গিয়েছি আমার এপাড়ার চার্চটিতে ।
ঈস্টার এবছর একটু তাড়াতাড়িই এসেছিলো । ঈস্টারের আগে আগে একদিন বাড়ীর সামনের মেলবক্স থেকে চিঠি আনতে গেছি, দেখি গ্লোরিয়া আস্তে আস্তে হেঁটে আসছেন । দাঁড়ালাম, একটু কুশলসংবাদ নেওয়ার জন্যে । বিধিসম্মত সোশ্যাল দূরত্ব বজায় রেখে শুধোলাম তাঁর শরীরের কথা । বৃদ্ধা ম্লান হাসলেন একটু । এবার আর ঈস্টারের দিনে চার্চে যেতে পারবেন না । বাড়িতেই কাটাবেন পুণ্য শুক্রবার । কালো কাপড় পরবেন । বাইবেল পড়বেন । খাওয়াদাওয়া যতটুকু না হলে নয় । তবে বাড়ী সাজিয়েছেন ঈস্টার বানি দিয়ে । কেউ আসবে না জেনেও রেখেছেন চিত্রবিচিত্র ডিম । ঈস্টার ট্র্যাডিশন । আমার মনে পড়ে গেলো তাঁর কাছ থেকে শোনা আরো একটি ঈস্টার-কর্তব্য । গুড ফ্রাইডের সকালে হট ক্রস বান খাওয়ার নিয়ম । কথায় আছে সেই মধ্যযুগে এক চার্চের ধর্মযাজক পুণ্য-শুক্রবারের সকালে হট ক্রস বান গরীবদুঃখীদের মধ্যে বিলিয়েছিলেন । সেই থেকেই ধর্মপ্রাণ মানুষ মেনে এসেছেন এই নিয়ম । জিজ্ঞেস করলাম, হট ক্রস বান কি বাড়িতে তৈরী করবে ? গ্লোরিয়া উদাস হেসে বললেন – না । পরক্ষণেই আমায় জিজ্ঞেস করলেন – আচ্ছা, ক্রিস আর জুলিয়া কি এবার ঈস্টারের এগ হান্ট করতে বেরোবে ? তোমার কি মনে হয় ?
তাঁর ব্যথা আমি বুঝলাম । গতবছরের এপ্রিলেও ঈস্টারের দিনে গ্লোরিয়ার সবুজ ব্যাকইয়ার্ড মুখর হয়েছিল শিশুদের কলকাকলিতে । কোথায় লুকোনো আছে ডিম – খোঁজ খোঁজ । রংবেরঙের বাস্কেট নিয়ে ক্রিস আর জুলিয়ার সে কি ব্যস্ততা । রঙীন ডিমের মধ্যে আবার উপহার – উফ, এ আনন্দ তারা রাখবে কোথায় ?
মনে পড়লো এক বন্ধু বলছিলো ঈস্টার এগ হান্ট নাকি এ বছর অনলাইনে হচ্ছে । অনেকেই নাকি জুম্ দিয়ে মিটিং সেট আপ করে নিয়েছেন । বাচ্চারা বাড়িতে ডিম খুঁজবে আর ক্যামেরা তাদের পিছে পিছে যাবে । যতক্ষণ না প্রার্থিত ডিম পাওয়া যায় । একবার নাকি রিহার্সালও দিয়ে নেওয়া হবে যাতে আসল সময়ে গন্ডগোল না হয়ে যায় । বললাম – তোমার ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞেস করো দেখি, তারা এমন ভাবছে কিনা ? গ্লোরিয়ার মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো । কিন্তু সে শুধু ক্ষণিকের জন্যে । পরক্ষণেই হতাশ হয়ে বললেন, হ্যাঁ, সেদিন প্যাট্রিক ফোনে বললো বটে অমনি একটা কিছু । কিন্তু জেনে আমার কি লাভ বলো ? আমি তো আর ওসব ব্যবহার করতে জানি না ।
মনে পড়ে গেলো আটহাজার মাইল দূরে কলকাতায় আমার একলা থাকা একাশী বছরের মায়ের কথা । অবলীলায় শিখে নিয়েছেন ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ, স্কাইপ – যোগাযোগের সবকটি মাধ্যম – শুধু আমায় দেখবেন বলে । গ্লোরিয়াকে বললাম, চিন্তা নেই, আমি শিখিয়ে দেব । বৃদ্ধার ত্রিকোণমিতি-আঁকা মুখ আবার নিমেষে উজ্জ্বল । বললেন – তুমি আসবে ? এই লকডাউনে ?
আমি বললাম – যদিও বাড়ীতে বন্দী হয়ে আমার তিন সপ্তাহ কেটে গেছে, হাঁচি-কাশিও নেই, তবুও সাবধানের মার নেই । তোমার বাড়ী যাবো না, সেটা অনুচিত হবে, কিন্তু তোমায় শেখাবো কোন উপায়ে তুমি ঈস্টারের দিন তোমার নাতিনাতনীদের সঙ্গে ডিম খুঁজে বেড়াতে পারবে । প্যাট্রিকের ফোন নম্বরটা আমায় দিয়ো তো ।
এর পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত । সেদিনই প্যাট্রিককে ফোনে ধরে অনলাইন এগ হান্টের তথ্য সংগ্রহ করা হলো । গ্লোরিয়া তাঁর আইপ্যাড হাতে বাড়ীর বাইরে এলেন । এই কূলে আমি আর ওই কূলে তিনি । মাঝখানে সরকারী রাস্তা । সোশ্যাল দূরত্ব একশভাগ বজায় রইলো । গ্লোরিয়া বুদ্ধিমতী, আমার নির্দেশ মতো ঝটপট ইনস্টল করে ফেললেন যাবতীয় দরকারী সফটওয়্যার । লগ-ইন করে একবার দেখে নেওয়া গেলো প্যাট্রিকের বাড়ীর রান্নাঘর । ক্রিস আর জুলিয়া তাদের ঠাকুমাকে স্ক্রিনে দেখে তো মহাখুশি । আর গ্লোরিয়া? তাঁর মুখে ফুটে ওঠা অনির্বচনীয় আনন্দটুকু আমায় মনে করিয়ে দিলো আমার সাগরপারের মায়ের হাসিমুখ, যে মুখ একবার শুধু আমায় চোখের দেখা দেখতে পেলেই খুশি হয়ে ওঠে ।
গ্লোরিয়া চলে গেলেন । আমি বাড়ী এলাম । আমার ইয়ার্ডের খরগোশ দম্পতি দু’জোড়া কান নেড়ে লাফিয়ে পালালো, পীচ আর চেরীর ফুলভরা ডাল দুলতে দুলতে বললো – হ্যাপি ঈস্টার !