সংগ্রামী লাহিড়ী নিউ জার্সির বাসিন্দা, বৃহত্তর নিউইয়র্ক বলা যায় | পরিচয় - শিক্ষায় প্রযুক্তিবিদ, পেশায় কন্সাল্ট্যান্ট, নেশায় লেখিকা | শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে বহুকালের সিরিয়াস চর্চা আছে, অল ইন্ডিয়া রেডিওর A গ্রেড শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী | উত্তর আমেরিকায় করোনা ভাইরাসের এপিসেন্টারে বসে বদলে যাওয়া প্রবাস-জীবনের ডায়রী লিখছেন |

করোনা – ধারায় এসো – 2

বাচ্চাদের স্কুল

কথা হচ্ছিলো পড়াশোনা নিয়ে ।  করোনা-কালে সব স্কুল-কলেজ বাড়িতে এসে গেল ।  মানে সকাল সাতটায় স্কুলবাস ধরার তাড়া নেই, ক্যাফেটেরিয়াতে লাঞ্চ নেই, আফটার স্কুল হরেক কিসিমের খেলাধুলো, কাজকম্মো – যার বেশিটাই অবিশ্যি অকাজ, কিছুই নেই ।  এখন বিফোর, আফটার – সবটাই বাড়িতে ।  চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট বলে কনসালট্যান্সির অভিধানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা আছে ।  মহামতি হেরাক্লিটাস যতই বলুন না কেন – The only constant in life is change – যে কোনো বদল ঘটাতে গেলেই তার একগাদা পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া মানে, সাইড এফেক্ট আসে ।  সেই প্রতিক্রিয়াদের সামলে-সুমলে মনুষ্যজাতিকে বুঝিয়ে-বাঝিয়ে বদল ঘটানোই হলো চেঞ্জ ম্যানেজারদের কাজ ।  তা এই করোনার ঠ্যালায় চেঞ্জ এমন হুড়মুড়িয়ে ঘাড়ের ওপর এসে পড়লো যে সব্বাই বেসামাল ।  শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী, বাবা-মা – সব্বাই ।

প্রমিতা আর অয়ন যেমন চেঞ্জ ম্যানেজ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে ।  অয়ন আই টি, এই জরুরী অবস্থা জারি হওয়ার আগে পর্যন্ত সে নিষ্ঠাভরে প্রতিদিন ক্লায়েন্টের আপিসে হাজরে দিয়েছে ।  এখন বাড়িতে বেসমেন্টে কম্পিউটারের স্ক্রিনে সেঁটে বসে থাকে, যার গালভরা নাম ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম ।  প্রমিতা ছিল এক প্লেস্কুলের দিদিমণি ।  একেবারে দুগ্ধপোষ্যগুলো সেখানে দিনের কিছুটা সময় কাটিয়ে যেত ।  করোনার কারণে তারা এখন সব্বাই বাড়িতে, প্লেস্কুল বন্ধ ।  প্রমিতা এখন পুরোসময়ের হোমমেকার ।
প্রমিতা-অয়নের দুই যমজ ছেলেমেয়ে – মলি আর রায়ান ।  দুজনেই থার্ড গ্রেড, একই স্কুল, কিন্তু সেকশন আলাদা ।  অতএব তাদের জিম্মাদারীও আলাদা আলাদা ক্লাসটিচারের ।  তাই যখন স্কুলের ক্লাসরুম বাড়িতে গিয়ে উঠলো, তাঁরা দুজনে দুরকম ভাবে অবস্থা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেন ।  আর সেখানেই বাধলো গন্ডগোল ।
রায়ানের ক্লাসটিচার দূরদর্শী, এরম একটা অবস্থা হতে পারে অনুমান করে নিয়ে আগেই তাঁর ক্লাসে গুগল ক্লাসরুম কি করে ব্যবহার করতে হয় সেটা মোটামুটি বাচ্চাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ।  তাই স্কুল যখন বন্ধ হলো, রায়ান সহজেই সকাল নটার মধ্যে গুগল ক্লাসরুমে অ্যাটেনডেন্স দিয়ে দিলো ।  তাকে এখন আর সকাল সাতটায় ঘুমচোখে স্কুলবাস ধরে ঢুলতে ঢুলতে ক্লাসে ঢুকতে হয় না ।  রায়ান মহাখুশি ।  টিচার হোমওয়ার্ক গুগল ক্লাসে দিয়ে দেন ।  এই করোনার বাজারে হোমওয়ার্কও সংক্ষিপ্ত ।  রায়ান তা শেষ করে ফ্যালে দুপুর বারোটার মধ্যে ।  ব্যাস, এবার সে সারাদিনের জন্যে মুক্ত ।  ট্যাবলেট, স্মার্টফোনে তার অবাধ বিচরণ।  ভিডিও গেমে তার পারদর্শিতা দিনে দিনে চন্দ্রকলার মতো বাড়ছে ।

অন্যদিকে মলির ক্লাসটিচার আগে অতোটা তলিয়ে ভাবেন নি ।  স্কুল বন্ধ হওয়ার ঘোষণা হবার পর তিনি বিশ্বাস রাখলেন Classdojo বলে আরেকটি সমতুল্য আন্তর্জালিক ক্লাসরুমে ।  কিন্তু সে সফটওয়্যারটি না জানেন তিনি, না জানে তাঁর ক্লাসের পড়ুয়ারা ।  ফলে মলির, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে তার মা প্রমিতার হাঁড়ির হাল হলো ।  ক্লাসে অ্যাটেনডেন্স দেওয়া যে এতো শক্ত – তা কে কবে জেনেছে ? মা-মেয়ে দুজনে ধ্বস্তাধ্বস্তি করে কোনোমতে দশটা নাগাদ নিজের উপস্থিতি ঘোষণা করতে পারে ।  তার পরের হার্ডল হলো হোমওয়ার্ক ।  হয় সেটি পাওয়া যায় না, নাহলে আধাখ্যাঁচড়া ।  শেষেরটা তো আরও ভয়ঙ্কর ।  একদিন হলো কি, দুপাতা হোমওয়ার্কের শুধু শেষ পাতাটি পৌঁছলো পড়ুয়াদের কাছে ।  মলি আর প্রমিতা তাই নিয়ে গভীর গবেষণায় মগ্ন হলো ।  ইতিমধ্যে বিপন্ন বাবা-মাদের নিয়ে অসংখ্য হোয়াটস্যাপ গ্রুপ তৈরী হয়েছে ।  তাতে আলোচনার ঝড় বয়ে গেলো এবম্বিধ দুর্বোধ্য হোমওয়ার্ক নিয়ে ।  প্রমিতার মনে পড়লো কলকাতায় স্কুলের সামনে একফালি জায়গা খুঁজে নিয়ে মায়েদের আড্ডা, টিচারদের আদ্যশ্রাদ্ধ, হোমওয়ার্কের খুঁটিনাটি আর কার বাচ্চা কোন টিউটরের কাছে পড়তে যাচ্ছে তার খোঁজ নেওয়া ।  অনেকে আবার ভেঙে সবকিছু বলতো না, জানতে পারলে যদি অন্যদের বাচ্চাগুলো ভালো রেজাল্ট করে ফ্যালে ? তা এভাবে হোয়াটস্যাপএ ঘন্টাদুয়েক তুমুল আলোচনার পর মলির টিচারের কাছ থেকে আকাশবাণী শোনা গেলো – হোমওয়ার্কের সব পাতা তোমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় নি ।  অতএব হে শিশুগণ – তোমরা অপেক্ষা করো ।  আর যায় কোথায়, হোয়াটস্যাপ গ্রূপে নিন্দার ঝড় বয়ে গেলো ।  এদিকে আবার দিনের মধ্যে হোমওয়ার্ক জমা দেবার নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে ।  প্রমিতা টেনশনে মাথার চুল ছিঁড়ছে ।  মলির অবশ্য খুব হেলদোল নেই ।  সে বরাবরই স্থিতধী ।  তুচ্ছ পড়াশোনা নিয়ে চিন্তা করে সে কখনোই মনের শান্তি নষ্ট করে না ।
রায়ান অন্য ঘর থেকে সবই লক্ষ্য করে ।  হ্যাঁ, তার কম্পিউটার আলাদা, ঘর আলাদা ।  মলি আর সে একসঙ্গে বসলে বাড়িতে শুম্ভ-নিশুম্ভের যুদ্ধ বাধবে ।  তাই এই ব্যবস্থা ।  এতদিন মা আর মলিকে পদে পদে হোঁচট খেতে দেখে সে বিমলানন্দ লাভ করছিলো ।  একদিন দয়াপরবশ হয়ে সে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো ।  তার সাহায্যে শেষে মা ও মেয়ে শিখলেন কি করে ভার্চুয়াল ক্লাস সামলাতে হয় ।  ব্যাপার স্যাপার দেখে অয়নও এসে হাজির হলো তার বেসমেন্টের গুহা থেকে ।  মুখে মৃদু আত্মপ্রসাদের হাসি, ভাবটা এরকম – হুঁ হুঁ বাবা, কার ছেলে দেখতে হবে তো ?
সবই বললুম, বুদ্ধিমান পাঠক লক্ষ্য করে থাকবেন, একটি কথা কিন্তু বলি নি ।  আর সেটাই সবচেয়ে দামী কথা ।  মলি আর রায়ানকে লেখাপড়াটা শেখায় কে ? নতুন নতুন চ্যাপ্টার পড়ানো হয় কি করে ? নতুন নতুন বিষয়ের সঙ্গে কে পরিচয় করায় ? যা কিনা এতদিন ট্র্যাডিশনাল ক্লাসরুম সেটিংএ হয়ে এসেছে ? প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা – কেন ? তাহলে বাড়িতে বাবা-মা আছে কি করতে ? স্কুলের সব সাবজেক্টের জিম্মেদারী এখন প্রমিতা আর অয়নের ।  তারাই একাধারে অ্যারিস্টট্ল, শেক্সপিয়ার, নিউটন আর আইনস্টাইন ।  ভেবে শিউরে উঠলুম, ভাগ্যিস আমার বাড়িতে কোনো থার্ড গ্রেডার নেই !

পুনশ্চঃ সর্বশেষ সংযোজন – মলি আর রায়ানের ভার্চুয়াল স্কুল এবছরের মতো শেষ হলো বলে ।  এতদিনে তারা ঘুম থেকে উঠে স্কুলে, থুড়ি ল্যাপটপে বসতে দিব্যি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো ।  প্রমিতা এখন ভেবে পাচ্ছে না – ভার্চুয়াল স্কুল বন্ধ হলে সারাদিন বাড়িতে লঙ্কাকাণ্ড সে কেমন করে সামাল দেবে !