লড়াইয়ের মিছিল

পর্ব – ১১

এখন নটা। ছুটতে ছুটতে বিপুল বাপ্পাদের বাড়ি। বাপ্পা মেধাবী ছাএ। পড়িয়ে আনন্দ আছে। ইওর ফেভারিট হবি। লেখাটা দেখলো বিপুল। সামান্য কিছু ভুল ছিল। সেগুলো কারেকশন করে দিল। নিজের মনে সামান্য হাসলো। বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে পশুর মতো ছুটতে হয়। সেখানে পড়তে হচ্ছে প্রিয় সখ। কি আশ্চর্য শিক্ষা ব্যবস্থা। জীবনের সংগে কোন সংগতি নেই। বাপ্পাকে এক ঘন্টা পড়িয়ে ছুটলো শংকরদার কোচিংএর দিকে। দেরি হলে শংকরদা অসন্তুষ্ট হন। হবারই কথা। কারন কোচিং এ পর পর সিডিউল ক্লাস থাকে অন্য টিচারদের। তার দেরি হওয়া মানে অন্য টিচারদের দেরি হবে।
যাক। আজ অফিসে শংকরদা নেই। কাঠের দোতলা বাড়িতে পূব দিকের লম্বা ঘর। দশ জন ছাএ বসতে পারে। এই ক্লাসে এগারো জন ছাএ। এটা বি. এ. 50 নম্বরের কমপালসারি ইংলিশ ক্লাস। পার ছাএ ফি 150 টাকা এর60% তার। 40%শংকরদার।
কাঠের দোতলা বাড়ি। প্রায় ঘোড়ার খুরের শব্দ করে হুরমূর করে ক্লাসে ঢুকলো বিপুল। এখানে এক ঘন্টার ক্লাস নিল, যে চিঠি লেখা কি ভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ ব্যস্তায় চিঠি লিখতে পারছে না। চিঠি লেখাএকটা শিল্প। সেই শিল্পের মৃত্যু ঘটছে। কথাটা সত্যি। তার চেয়ে মানুষের বেঁচে থাকাটা আরো বড় সত্যি। আগে মানুষ বাঁচবে। তারপর তো শিল্প চর্চা।
এবার বিপুল ছুটছে বাড়ির দিকে। এখন তাকে চান করতে হবে। তার আগে যেতে হবে বাথরুম। যদি ফাঁকা পায় ।এই দখলি জায়গায় দশটা পরিবার। লোক সংখ্যা প্রায় তিরিশ জন। বাথরুম ফাঁকা পাওয়া অনেক সময় হয় না। কল একটা। সেখানেও লাইন।
হঠাৎ তার মনে হলো সকালে মাকে ঐসব কথা বলা ঠিক হয়নি। মাই বা কি করবে? ন টা সন্তান এই আকালের বাজারে। ভাবা যায়!
আচ্ছা বাজারে তো তখন কন্ডোম এসে গেছে। তা কেন ইউজ করে নি বাবা? একবার সে রান্না ঘরের কি যেন খুঁজতে গিয়ে একটা কৌটোয় কিছু নিরোধ দেখেছিল। তারপর এতো সন্তান?
নিরোধ কি করতে এনে ছিল? মা হযতো বাধা দিয়েছেন। বাবা শোনে নি। একটা নারী এত গুলো সন্তানের জন্ম দিয়ে আবার সংসারের সব কাজ করছে। একটা মানুষের কতো শক্তি থাকতে পারে? কালপিট হলো বাবা। তার জন্য আজ সংসারে অভাব তীব্র। একদিন ছোট টাকা এসে বলেছিল, ‘বৌদি তুমি দুটো মেশিন তোলো।মেয়েরা সেলাই করবে। মাস গেলে ভালো আয় হবে।’
মা বলেছিল,’ মেয়েদের পড়াশুনা কি হবে?
‘আরে বিয়ে দিয়ে দেবে। ওদের পড়াশুনা করে কি করবে ওরা? ‘
মা বলেছিল,’ চাকরি করবে।’
, ‘চাকরি! বড় বড় পাশ দিয়ে বসে আছে, তারা পাচ্ছে না চাকরি। এই তোমার বিপুলের কথাই ধর না। বিপুল তো কতো পাশ দিয়েছে। পেয়েছে চাকরি?
, ‘চেষ্টা তো করছে। হয়তো হবে একদিন। চাকরি না হোক বেঁচে থাকার জন্য লড়াই তো করতে পারবে? পড়াশোনা লড়াইয়ের অস্ত্র।’
সেদিন মার ওপর তার বড় শ্রদ্ধা জেগেছিল। মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে সে মাকে বাবাকে উল্টাপাল্টা বলে ফেলে।
বাড়ির কাছাকাছি এসে বিপুল বুঝতে পারলো তার চোখ দুটো সামান্য ভিছে আসছে।
আজ বাথরুম এবং কল দুটোই ফাঁকা। দুটো খেয়ে ছুটলো বিকাশ ভবন। মাঝে মাঝে এখানে আসতে হয় তাকে। এখানের লোক গুলো ঘুমায়। তাদের জাগাতে হয়। তারপর বলল, ‘একটা কল দিন কতো বছর তো হয়ে গেল।’.
লোকটা জেগে উঠে বলল. ‘শুধু কল দিলে হবে তো?
‘ মানে?
‘কল দিলাম। জল পড়ল না। তখন কিন্তু কিছু বলতে পারবেন না।’
‘ আমি তো ও বি সি। সেই কোটায় দেবেন।
‘এস টি ডি, সি ডি ও বি সি সব লাইনে আছে আপনার আগে।
,’ সে থাকতেই পারে। আমি ছ বছর হয়ে গেছে একটা কল পাইনি।’
‘ মাএ ছ বছর! দশ বছরে কতো জন কল পায় নি। আপনি ছ বছরের কথা বলছেন।’
‘দেখুন কে কি পেল, না পেল, তা আমি দেখতে যাবো না। আমি ইংলিশে এম এ।
‘তাহলে তো আপনি চুটিয়ে টিউশন করতে পারেন। কি দরকার চাকরির?’
‘আপনিতো টিউশন করতে পারতেন। কেন করছেন চাকরি? ‘
‘আমি পাতি বি এ পাশ। আমাকে কে টিউশন দেবে?’
‘আপনি বি এ পাশ করে চাকরি পেতে পারেন আর আমি মাস্টারস ডিগ্রি নিয়ে চাকরি পাবো না?
‘আপনি কি জানেন পি এইস ডি করে চাকরি পাচ্ছে না।’
‘তারা প্রফেসরির চাকরি চাইছে। আমি তো সামান্য কেরানির চাকরি চাইছি।’
‘কেরানির চাকরি এখন মহার্ঘ্য চাকরি জানেন?
, ‘আমি অফিসারের সংগে দেখা করবো।’
‘চলে যান পাঁচ নম্বর ঘরে।’
সে এক অভিজ্ঞা। অফিসার সরকারি ফোনে কথা বলে যাচ্ছন তো, বলে যাচছেন। একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, তার যেন হূশ নেই। অবশ্য চাকরি প্রার্থীদের এরা মানুষ মনে করে না। বিরক্ত হয়ে আমি যখন বললাম,’ ফোনটা নামিয়ে আমার সংগে কথা বলুন। অফিসার টা অবাক হয়ে আমাকে দেখলো অনেকখন। তারপর বলল,’ তোমার কি চাই?
, ‘একটা চাকরির কল চাই।’
‘ কতো বছরের পুরনো কার্ড? ‘
‘ ছ বছর।’
‘কোয়ালিফিকেশন?’
‘ ইংলিশে মাস্টারস।
‘নাম ঠিকানা লিখে দাও।’
দিয়ে ছিল বিপুল। কিছু হয়নি। আজ এসেছিল সেই অফিসারের সংগে দেখা করতে। তিনি বদলি হয়ে গেছেন। এখন কি করবে সে?
এই চিন্তা নিয়ে সিঁডি দিয়ে নামছে বিপুল। আমারা একবার ওর পিছন দিকটা তাকাই। দেখতে পারছেন ওর প্যান্ট বড় মলিন। পাছার দিকটা কত তাপতি মারা।
তবু এরা মযদানে লড়াই করছে।এটাই ওদের জীবন। মানুষ নয়। ঘোড়া। ঘোড়ার মতো ছুটছে। হয়তো একদিন এরা সত্যি সত্যি ঘোড়া হয়ে গেল। সেদিন কি আপনি অবাক হবেন?

ক্রমশ…