লড়াইয়ের মিছিল

পর্ব –  ১৮

সুর্দশন জানতো বাবা তার বাড়িতে পারমানেন্ট থাকবে না। আজ না হয় কাল যাবেই। বাবা স্বাধীনচেতা মানুষ। কারো কাছে থাকতে তার ইগো প্রবলেম হয়। বিয়ের রাতটা শুধু শ্বশুর বাড়ি কাটিয়ে ছিলেন। তারপর আর একটা দিনের জন্য থাকেন নি। কোন আত্মীয় বাড়ি থাকেন নি। বাবার পেটের অসুখ একবার খুব বেড়ে গেল। এ ডাক্তার সে ডাক্তার দেখিয়েও রোগ সারছে না। তখন কেউ একজন পরামর্শ দিল হাওয়া বদল করতে। তা কোথায় যাবো?
কেন? পশ্চিমে।
পশ্চিমে কোথায়?
ঘাটশিলা মধুপুর দেওঘর।
কতদিন থাকতে হবে?
একমাস থাকবেন।
ব্যবসা কে দেখবে?
কেন সুর্দশন দেখবে।
পারবে ও?
কেন পারবে না। পঁচিশ বছর বয়স হয়েছে। পারবে না। বুঝিয়ে দিয়ে যাবেন।
একমাস!
তা না হলে শরীর ঠিক হবে না।
বাবার একমাত্র বন্ধু কেশব কাকু। দোকানে বসে আড্ডা দিতেন। তাস খেলতেন পেশায় ছিলেন ইলেকটিশিয়ান। আরো দুজন আসতো দোকানে। তারাও ছিল বন্ধু। তবে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলতে কেশবকাকু। দোকান পাড়ায় থাকতেন। দোকান বন্ধের পর বাবা তাসের আড্ডা বসাতেন। তার জন্য একটা ফোল্ডিং টেবিল বানিয়ে ছিলেন। তাসের আড্ডা চলতো, সেই সংগে হুকো খেতেন বাবা। কেশবকাকুকে নিয়ে বাবা গেলেন মধুপুর এক মাসের জন্য। বাবা চলে যাবার পর মা বলেছিলেন”‘একমাস তোর বাবা মধুপুর থাকবেন আমার বিশ্বাস হয় না।
কেন মা?
যা ব্যবসা পাগল লোক। উনি থাকবেন একমাস? আমার কথা মিলিয়ে নিস।
মার কথাই সত্যি হলো। সাতদিনের মাথায় বাবা এসে হাজির। কি ব্যাপার?
আর বলো না।
কি হয়েছে? চলে এলে কেন? মা জিজ্ঞেস করল। আরে ওখানে তো রাখুসে খিদে। ইদারার জল এতো মিষ্টি, এই খেলে তো একঘন্টা পর আবার খিদে। ঘন্টায় ঘন্টায় খিদে।
তা ভালো তো। তার মানে জল হাওয়া খুব ভালো হজম হয়ে যাচ্ছে। চলে এলে কেন? পেট সুস্থ হয়ে যেত।
টাকা? টাকা কোথায় পাবো? যা নিয়ে গিয়েছিলাম সব তো সাতদিনে শেষ।
তা মানি অর্ডার করে পাঠিয়ে দেওয়া যেত। কেউ চলে আসে?
কত টাকা মানি অর্ডার করবে?
এক মাসে আর কতো টাকা লাগতো?
দূর শুধু খাওয়া আর খাওয়া। কোন কাজকর্ম নেই। ভালো লাগে?
আসল কথাটা বলো যে ব্যবসা ছেড়ে তুমি থাকতে পারছিলে না। আমি তো জানতাম। তুমি পারবে না।
বাবা তুমি ঠিক করো নি।সুস্থ হয়ে ফিরতে। তারপর যতো ইচ্ছে কাজ করো না। এভাবে কেউ চলে আসে?
দূর দূর নিজের ঘর বাসা ছেড়ে ওভাবে থাকা যায় নাকি? সাতদিনে আমি হাঁফিয়ে উঠেছি। সেই বাবা আমার বাড়িতে দিনের পর দিন থাকবে আশা করি কি করে?
সুর্দশন বলল”এখানে তোমার কোন অসুবিধা হচ্ছিল বাবা?
না তো। বেশ ভালো ছিলাম।
তাহলে চলে যাচ্ছো কেন?
বাড়িটা ফাঁকা পড়ে আছে রে। গাছগুলো মরে গেছে মনে হয়। বাড়িতে মানুষ না থাকলে ভূতের বাড়ি হয়ে যায়।
আমি লোক পাঠিয়ে পরিস্কার করে দিচ্ছি।
না না তা হয় না রে সুধা। (সুর্দশনের ডাক নাম) আমাকে বাড়ি ফিরতে হবেই।
ঠিক আছে যাও। কিছু দিন থেকে আবার চলে আসবে। এখানে থাকলে কিছু দিন, আবার চলে গেলে।
যাযাবর হতে পারবো না এই বয়সে।
ওখানে যদি আবার কিছু হয়? মা তো যাবে না বলছে।
উনি না গেলে না যাবেন।
কিন্তু একা একা থাকবে আমাদের চিন্তা হবে। অতো চিন্তা করে কিছু করতে পারবি? কিছু হওয়ার থাকলে হবে। একদিন তো যেতে হবে।
কিন্তু এভাবে কেন বাবা? । তুমি সত্যি করে বলোতো, তুমি এ বাডিকে নিজের ভাবতে পার না, তাই তো? ।
দূর বোকা। এসব কেন ভাবছিস?
তাহলে আপনি যাচ্ছেন কেন বাবা? বউমা রমা কথাটা বলল, ‘আমার খুব খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে আমি আপনার সেবাযত্ন ঠিক মতো করতে পারি নি।
দূর পাগলি। যতো আজেবাজে ভাবনা তোমার।
আপনি ছিলেন। বেশ ভালো লাগতো। আমার তো বাবা নেই। মনে হতো আপনি আমার বাবা। রুমার চোখে জল।
ঠিক আছে যা। মাঝে মাঝে আসবো, থাকবো। হলো তো। বোকা মেয়ে, কাঁদে।
বৌমা তুমি এসব ভেবে কষ্ট পেয়েও না। উনি ঐ
রকম চিরটা কাল। এক বছর যে এখানে থাকলো এটাই তো আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।
হরিদাস পাল এদের বোঝাতে পারবেন না যে নিজের বাসা মানে নিজের প্রান, নিজের আত্ম, নিজের ভালবাসা।