অম্বুবাচী

চারতলার ছোট্ট ফ্ল্যাট টা হিম ঠাণ্ডা এসির নিঃশ্বাসে।এমনিতেই কয়েকদিন খুব বৃষ্টি।জল থই পথ কালচে গাছগুলো ভিজে পুকুরের স্থির জলে তাকিয়ে।ঠিক জানলার নীচে খেজুর গাছ।
লক্ষ্ণীদি চেয়ারে বসে আছে। আসলে মন্ত্রপাঠের আওয়াজ আর ঝাপসা কাচে পিণ্ডদানের গোলা গুলো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম।সুন্দর সারিবদ্ধ সাজানো। কেমন খেতে?লক্ষ্ণীদি কী এসব খেতে পারবে? সবগুলো? রোগা পাতলা সে বসে আছে একদৃষ্টে চেয়ে।আবার বৃষ্টি হবে,ওরা তাড়া করছে।
একসময় বেশ ছিপছিপে সুন্দরী ছিলো লক্ষ্ণীদিদি।বিয়ে হলেও সে বাপের বাড়িতে কাটিয়ে দিয়েছে বহাল তবিয়তে।ভাইদের ভালোবাসা।শশুরবাড়িতে জায়গা হয়নি দুর্নামে।দেওরের সঙ্গে কিছুমিছু।
এখন আরো কিছু কিছু মানুষ জমাট কুয়াশার মতো ওর পাশে ভিড় করছে।আরো কিছু মৃতজীবন এসেছে লক্ষ্মীদির পিণ্ডদানে যোগ দিতে। ওরা কি সবাই মিলে খাবে ওই সারিবদ্ধ আহার! আমি তো সবই দেখতে পাই।
মনে পড়ে গেলো মেঘলা আকাশে,এই তো!
সেদিন ই দেখা হয়েছিলো লক্ষ্মীদির সঙ্গে।
শীর্ণ।একটু শুকনো মুখ…….
কিছু বলতে চাইলো কি তার বিষাদ ক্লান্ত চোখদুটি?
টিনের চাল দেওয়া বারান্দায় খেতে খেতে বুকে কষ্ট, জল, এ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গীতের মধ্যেই বরফ হয়ে গেছে দেহ।
এমন এ পাড়ায় মারা যাচ্ছে আমার কয়েকজন চেনাজন আরো।
সেই মেয়েটাও এসেছে খেঁজুর গাছের নীচে যার বোন চেয়েছিলো তারই প্রেমিক কে আর অভিমানে ওড়নার ফাঁসে স্রেফ হাওয়া হয়ে গেল সে।এমনকি সেদিন সকালেও ওকে দেখেছি স্টেশনে।
এসেছে দুর্গাপদ । চারিদিকে ধার, এক প্রেম ছেড়ে আরেক,বাড়িতে কলহ আর মদ তাকে এগিয়ে দিয়েছে লম্বা দড়ির ফাঁস।মুক্তি।
আজ সেও এসেছে পিণ্ডদানের আমন্ত্রণে।
কাক নেই।ওরা চলে যাবে বোধহয় জলে ফেলে দেবে! লক্ষ্ণিদি তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।রসিকতা চলছে । ভাইরা খুশী।একটা শরিক কমলো।বেশি ভোগায়নি দিদি। পড়েছে আর মরেছে।বক্স লাগিয়ে গীতাপাঠ।
লক্ষ্মীদি কাকে যেন খুঁজছে ।ছেলে ত কাজ করছে।ভাইরা রাজনীতি।আকাশ কালো।কাকে যেন, সেই পাঁচবছর আগের জলে ডুবে আছে যে দেওর! বুড়ো বর !
অনেকে এসেছে আসছে।জড়োসড়ো কুয়াশার কাপড়ে।রাধা গোবিন্দ মন্দিরের রাজু গোয়ালিনীও এসেছে ।পিণ্ডের লোভে ভিড় হয়ে আসে।আজ উত্সব যেন পারলৌকিক।
রাত হয়ে যায়।অনেকটা রাত। ওর পড়ার ঘরে আলো।আমি একামন।বিছানার পাশে অন্ধকার।আমার শরীর ব্যথা করে।ও বোঝে। মাঝরাতে বৃষ্টি হয়।চাদর ভিজে যায়।ও আদর করে।
খেতে খেতে মনে হয় পিণ্ডের কথা।বড়ো ডাইনিংটেব্ ল।কেমন হবে খেতে! আমিও একদিন……
গোল টেবিলের ওপর আলো।দু একটা বাদলা পোকা।একটা মথ ফরফর করে, “মন্দ খেতে নয়”,__ কম কথা বলে ও।
চাপাস্বর।
ও আমার বর নয়।একসাথে থাকি।
মোটা কালো টাকমাথা প্রফেসর।
আমি যেতাম, মানে আসতাম ওর বাড়ি বই এর লোভে।ও ব্যস্ত থাকত স্টুডেন্ট নিয়ে।এভাবেই যে কোনো অভ্যেস গড়ে ওঠে।আমারো অভ্যেসে এলো ও।
কখনো বিয়ে ভাঙার দুঃখে কখনো জ্বর এলে, সপাটে ওর বাড়ি।মাথা টিপে দিত।পা ও।তবে খুব আলতো ভাবে।আঁশহীন।
এই এখনকার মতো।
আমিই একদিন…… এভাবেই আষাঢ়ের দুপুরে ওকে চাইলাম।
চমক ছিলো।
মোটা কালো টাক কে কেউ কি সাধ করে কামনা করে! আমি কামনা করেছিলাম ওর পর্যবেক্ষণ,ওর স্নেহ,ওর সৌজন্য….
আমি পেয়েছিলাম ওকে।যদিও ও খুব অবাক হয়েছিলো এমন হরিণ চোখের প্রগলভতায়।
হয়ত ধন্য হয়েছিলো অপ্রতাশিত বৃষ্টিপাতে।
ও খুব ভালো।খুবই।
ডঃ সেনগুপ্তর ছাত্ররাও অভ্যস্ত হলো। কেবল জয়, ফাইনাল ইয়ার প্রেসিডেন্সি মেনে নিলো না।
দু -এক ভর দুপুরে।
জয় আসত জ্বর নিয়ে।
জ্বর নামিয়ে দিতাম।চলে যেত আমাকে রক্তাক্ত করে।
লক্ষ্ণীদিও দুপুরের পথে চলে যেত কোথায় যেন।না দেখা দেওর কিংবা অন্য কোথাও।
আমি হাসফাস বিছানায়।
ডঃ সেনগুপ্ত অদ্ভুত ভালোবেসে তাকিয়েছিলো আমার গলার লাল দাগে একদিন।সেই শেষ।
তারপর জয় চলে গেল।
তারপর অভ্যেসে আমি ওর সাথে জড়াজড়ি যেন সংসারে। যেন কবেকার।
ও_ ভাবতো ওকে আমি ভালোবাসি।ডঃ সেনগুপ্ত। অদ্ভুত নির্বোধ।
আমি ওকে করুণা করে সুখ পেতাম।লক্ষ্ণীদিও করুণা করেছিলো ওর বরকে যেদিন শ্বাস উঠেছিলো তার।
কাঙালভোজনে অহংকারের আশ্চর্য সুখ!
সেই লক্ষ্ণীদিদি পিণ্ড চায়।
ডঃ সেনগুপ্ত কে আমি এখন ভালোবাসি।নির্ভর করি।
সেদিন অম্বুবাচী ছিলো।ওর জন্য ছোলার ডাল করছিলাম।অপেক্ষা করছিলাম ঠিক এমনই সারিবদ্ধ আহার নিয়ে।
হঠাৎ এলো অসময়ে খবর। ম্যাসি এট্যাক। আধঘন্টায় গল্প শেষ।
শরীরটা এসেছিল।বোকা লোকটার।
নিঃস্পন্দ।নিথর। অনেকে কাঁদছিলো।আমি কাঁদিনি।ডঃ সেনগুপ্ত আর কোথায়ই বা যাবে দূরে!
আমি ভাবছিলাম একা একা…..জয় এলো।আমি চিনতে চাইনি।
আমি সেই সময় থেকেই ওঁকে ভালোবাসছিলাম। মোটা কালো টাকমাথা।মিঃ সেনগুপ্ত।
আমি পিণ্ডদান করিনি।ও ছোলার ডাল আর লুচি খাবে……..
রাতে একা অন্ধকারে তারপর আবার ও এসেছে। রোজ আসে।
আসাটা অভ্যেস হয়ে গেল……..
আজ অম্বুবাচী।
লুচি আর ছোলার ডাল।
আমি ওকে জড়িয়ে শুই এখন সব বৃষ্টিতে…………