অন্তর্ধান – ৩

ছোটো নবাবগঞ্জ থেকে বেরিয়ে হাইওয়ে ধরে ঠিক 20 কিমি পর ধাবায় জিপটা পার্ক করল রজত।
দু চারটে লরি। ইতস্ততঃ ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে কিছু ড্রাইভার আর খালাসি টাইপের লোক।একটা একটা সুজুকি ৮০০ আর একটা উবের।দু জোড়া সুসজ্জিত নারী পুরুষ।
রজত সিগারেট ধরিয়ে অপেক্ষা করে।
–“সুলতানগঞ্জ,আজিমপুর,বাখারপুর,মহেশপুর,বাদুরপুর আলিপুর নাকি নবীনগর স্যর”
রজতের ঠিক পেছনে পিঠ করে বসে একটি খালাসি টাইপের লোক বিড়বিড় করে।রজত অচঞ্চল বসে নিম্নস্বরে বলে, ” আনোয়ার, খবর চাই দুদিনের মধ্যে।মোহিনী মোহন চক্রবর্তী। সেখানে জন্ম।কোন ব্লকে তার বাপ মা কে আছে খবর নাও।কারবার কী ছিলো ।
২০১৬ অবধি জেলা সভাপতি ছিল বিরোধীদলে।
কালিয়াচক থানায় আগুন ও হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা র পর দল থেকে সাসপেন্ড ।
পরে দল বদল।এখন ছোটোনবাবগঞ্জের মিউনিসিপ্যালিটি চেয়ারম্যান।মাঝের সময়টার পুরো তথ্য চাই।
–‘হয়ে যাবে স্যর ‘
শিবুকে লাগাও সবিতা রানী দে কেন আত্মহত্যা করে।ওর বাপের গুষ্টির খবর জানাও।
–স্যর
–বলো
–আজিমপুর কালিয়াচকে সবচেয়ে ব্যস্ত ঘিঞ্জি মহল্লা।
আর কালিয়াচক এ জাল নোট,বেআইনি অস্ত্র কারখানা, সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান অবাধে চলে।
সব দলের সমান বখরা।
খতরনাক জায়গা।
—বা**ত সিনেমা করিস না ।যেটা জানতে চাই সেগুলো খবর কর।মোহিনী কবে কিভাবে দল পাল্টে এলো।
কেন , ছোটো নবাবগঞ্জ এসে উদয় হলো আর জাঁকিয়ে বসল এটাই আমাদের জানতে হবে।
–আপনি বেরিয়ে যান স্যর খবর পৌঁছে যাবে স্যরকে সেলাম জানাবেন।
দেবলীনা অনেকদিন দেশ যায়নি। ঝাড়গ্রাম ছাড়িয়ে আরো ৫০ কিমি ভেতরে ঘন জঙ্গল ঘেরা পর পর গ্রাম। এখনো তেমন সভ্য নয়।
চোখের সামনে দেখতে পায় বড়ো বড়ো হলুদ পাতা ঝরে পড়া।
শহর ছেড়ে হোস্টেল।দাঁতে দাঁত চেপে সেদিনের লড়াইয়ে বাল্যবন্ধু, রমেশকে ভুলে গেছে। প্রেমের গলা টিপে হত্যা করেছে।
রমেশ তাদের গ্রামে দোকান করেছে কলেজের শেষ পরীক্ষা না দিয়ে। বিয়ে করেছে মিনতিকে।ঘৃণা করে তাকে।
তাদের গ্রামে প্রায় সবাই ঘৃণা করে কলকাতা শহরকে।

থানায় মিঃ সেন মাথায় হাত দিয়ে বসে। সামনে একরাশ ফাইল।
দেবলীনা ঢোকে তৎপর অধস্তন সহকর্মীরা উঠে দাঁড়ায়।
ডি এন এ রিপোর্ট গুলো এসেছে।
সব এসেছে স্যর কিন্তু …
—কী হয়েছে মিঃ সেন মুখ শুকনো কেন।শরীর খারাপ নাকি।দেবলীনা পুরোপুরি নির্লিপ্ত অফিসার।অনুভূতিহীন ।
—স্যর, মৃত বাচ্চার ডি এন এ মিলছে না বাবার সঙ্গে বাচ্চার।
ফর্সা মুখ লালচে হয়ে আছে।জ্বর আছে।কপালে নরম ঠাণ্ডা হাত।চোখ মেলে রজত এক স্বপ্নের কাছে।
মুহূর্তে সচেতন হয়, ধড়মড় করে উঠে বসতে যায়।
—একদম উঠবে না।
মাথার কাছে দেবলীনা।
ডাক্তার দেখিয়েছ।
না।প্যারাসিটামল 650 খাচ্ছি।
তুমি শুয়ে থাকলে কাজ চলবে না।
–“সরি।
কিছু হয়েছে?”
বাচ্চাটার ডি এন এ ওর মা বাবার সঙ্গে মিলছে না রজত।
-“হুম”
কিছু বলতে চাও মনে হচ্ছে।
-“মোহিনীমোহন,পিতা রমনীমোহন
এক ভাই সুরেন্দ্র মোহন।”
ভাই নেই ।
-“ছিলো
আত্মহত্যা করেছে পাঁচ বছর আগে
কালিয়াচক, বাখরপুরে।”
ছেলে অতীন্দ্র ব্যবসা করে।কাপড়ের দোকান,দুটো।
স্ত্রী মনিকা মহেশপুরের মেয়ে।
এগুলো জানি আমরা।
-“অভিজিৎ দাশ নামটা কি শুনেছেন স্যর”
স্যরটা বাদ দাও এখন আমি অফিসে নেই।
নামটা চেনা।
-“কেন?
একটু ভেবে দেখুন
আমার জানা নেই কিন্তু এই কেসে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।”
দেবলীনা দ্রুত চিন্তা করে।
আসছি ,রজত উঠে যায় বাথরুমে
অভিজিৎ দাশ।
অভিজিৎ দাশ…..
ভবানীভবন,মিঃ তালুকদার, ছোট্ট চেম্বার
হঠাৎ আজানের আওয়াজ আর চিরিক করে মস্তিষ্কের আলোটা জ্বলে ওঠে।
মোস্ট ওয়ান্টেট এর তালিকায়
অভিজিৎ দাশ
২০১৬ থেকে নিঁখোজ। কালিয়াচক থানায় আগুন লাগানো, হিন্দু মুসলিম রায়ওট।দুজন অগ্নিদগ্ধ
গ্রেপ্তার চার ফেরার দুই।
অভিজিৎ দাশ এর কোনো খবর নেই।
কেস চলে গেছে সি আইডি র হাতে।
অভিজিৎ দাশ ফেরার ২০১৬ থেকে রজত।
একটা ট্রে দুটি পোর্সিলিনের কাপ কিছু কুকিস।
দেবলীনা হাত থেকে নেয়।
তুমি জ্বর গায়ে এসব কি জন্য করলে।আমি কি অতিথি?
ট্রে হাত বদলের সময় হাতে হাতে ছোঁয়া।
দূরে শাঁখের আওয়াজ।
একটা পাখি ডাকছে।হারিয়ে ফেলেছে তার বাসা।
-“অতিথি নয়!”
এক মূহুর্ত চোখে চোখ আটকে,
এক যুগ
অস্বস্তিকর নৈঃশব্দ্য !
-“অভিজিৎ দাশ মনিকার প্রাক্তন প্রেমিক।
হেরোইনের ব্যবসা।রেড যেদিন হয় সেদিন সে পুলিশের হাত থেকে পালায়।কিন্তু পায়ে গুলি লাগে।”
থ্যাংক্যু রজত।
আনোয়ার এসেছিল?ঘাড় নাড়ে রজত।
–“কেসটা জটিল হবে”
দেবলীনা জানলার বাইরে তাকায়।অন্ধকারে ফিকে আলোর রেখা।
কেন রজত। পার্টি র বদান্যতায়?
-“হ্যাঁ। এখন বখরা পাচ্ছে শাসক দল।
অভিজিৎ এখন আসগর রহিম।পার্টি র লোক।”
কালিয়াচক যেতে হতে পারে সোমবার।
-“ফরেনসিক আর কিছু নতুন তথ্য দিলো ম্যাডাম। ”
আজ কাজের কথা বলতে আসিনি।
দুদিন রেস্ট নাও।
কাল ডঃ চাকী কে পাঠিয়ে দেব।
দেবলীনা উঠে পরে।হোমওয়ার্ক। অনেক জট।একটা একটা করে খুলতে হবে।নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।প্রথম কেস।
দরজায় দাঁড়িয়ে রজত।
গাড়ির দরজা খুলে দেয় রহিম।
পেছন ফিরে তাকায় ওসি
রজত শুনতে পায় কৃষ্ণকলির চাপা কন্ঠ
থানার বাইরে দেবলীনা আমার নাম কেমন,
পরশু জয়েন করবে।
নির্জন রাস্তাটা আরো নিস্তব্ধ অন্ধকার হয়ে যায়।রজতের সব গুলিয়ে যাচ্ছে।
রাত বারোটায় হটলাইনে ফোন।দেবলীনা নামটা দেখে প্রমাদ গোণে।

ক্রমশ…