অন্তর্ধান – ২

সমস্ত কাগজপত্রের কাজ সারতে ভোর সাড়ে তিনটে।তবুও এক গ্লাস জল নামছে না গলা দিয়ে ।
যন্ত্রবৎ কাজ করে চলেছে দেবলীনা। দৃশ্যটা সরছে না।ক্রাইম ব্রাঞ্চের ট্রেনিং, সব কিছু হার মেনে যাচ্ছে আজ।
কুণ্ডলি পাকানো বছর দুয়েকের নিথর শীতল দেহ গুটিয়ে ঢোকানো রেফ্রিজারেটর ভেতর।একবারের জন্য কেঁপে গেল দেবলীনার মাথাটা।মুখ ফিরিয়ে নেয়।রাস্তায় বেরিয়ে আসে।একটু বাতাস প্রয়োজন।
এক মহিলা কন্স্টেবল অসুস্থ হয়ে পড়েছে।বাকিরা স্তব্ধ। যে সংবাদ পত্রের ছেলেদুটি এতো রাতেও এসেছিল কভার করতে একজন বমি করে ফেলল তার সামনে হরহর করে।তবুও পাথরের মতো দেবলীনা যাবতীয় কাজ করে যাচ্ছে।
–স্যর, এবার বাড়ি যান।
তার এসিট্যান্ট পারমিতা অনুনয় করে।
— রহিমদা অপেক্ষা করছে।
–যাচ্ছি, অন্যমনস্ক দেবলীনা
–২০১৬ ফাইলটা আর ২০১৯ র নারকোটিক ফাইলটা আনো
–কাল দেখলে হতো না
–না
পারমিতা এই কণ্ঠস্বরকে ভয় পায়।
ফাইল নিয়ে আসে রজত।একটু পর গরম কফি নিয়ে পারমিতা।
__রজত এখনো যাওনি কেন বাড়ি
–যাব। ফাইল ওল্টাতে শুরু করে দুজনে।

দেবলীনা মুর্মু রজতকে নিয়ে যখন গাড়িতে উঠল সূর্য প্রায় ঘুম ভেঙে আড়ামোড়া ভাঙছে।কুয়াশা।
দুজনের মুখ থমথমে।
এটা একটা সূত্র মাত্র। আরো অনেক সম্ভাবনা রয়েছে।
—-খুনটা রাজনৈতিক নয় রজত
–বুঝতে পারছি কিন্তু, স্যর কাল থেকে শুরু হবে চাপান উতোর।
–সকাল নটা এস পি র সঙ্গে কথা বলবো।তুমি আমার কোয়ার্টারে ব্রেকফাস্ট করে নিও।
–কিন্তু মিঃ সেন
—উনি এবং বাকি কিছু সাব ইন্সপেক্টর যাবে তদন্তের কাজে। তিনটে বাড়ি স্পট করে নেবে।ওদের খোঁজ চাই আগে।
–কস্টেবল আর সাব ইন্সপেক্টর সজনী বাবুকে মোহিনী মহলে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
–বলছি,
— কী বলছ
— না বলছিলাম আপনি একটু বিশ্রাম নেবেন প্লিজ।
হালকা হাসিমুখে প্রথম আলো,
–তুমিও।
দেবলীনা নিজের কোয়ার্টারে ঢুকে যাচ্ছে।
হিমেল হাওয়া, আকাশে ক্ষীয়মান চাঁদ আর উদিত সূর্যের আভাস একটাই আকাশে।
রজত একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ম্যাডামের দিকে।
কৃষ্ণকলি আমি তোমায় বলি,বিড়বিড় করে।রহিম নিঃশব্দে গাড়ি স্টার্ট করে।
রাতের ক্লান্তি ঝরা ফুলের মত রেশ রেখে গেছে এখনো শরীর মনে।
পরপর ফাইল চলে যাচ্ছে মোশন পিকচার্সের মতো। মোস্ট ওয়ান্টেট পরপর ছবি,
— এখানটা আবার করুন।
“মোস্ট ওয়ান্টেট” ২০১৮থেকে ২০২০
অন্তিম কেস হেমতাবাদ হত্যা। এম এল এ। কেস পি এস থেকে চলে গেছে সি আই ডি।
এটা নয় ২০১৮ টা
–এস পি সুজিত কর্মকার ঘেমে উঠছেন।মনে মনে বিরক্ত।
নাহয় তিনি প্রোমোশনে এসেছেন নাহয় শাসক গোষ্ঠীর প্রসাদ কিন্তু তাবলে এতদিন ঘাস কাটছেন নাকি।
নতুন আই পিএস ,বুঝবে কদিন পরেই।
–সুজিতবাবু আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।ফাইলগুলোর প্রয়োজন আছে। খুব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বুঝতেই তো পারছেন হোমিসাইড।
তারপর মুনিসিপাল চেয়ারম্যান, পরিবারসুদ্ধু সাফ।
পুরোনো হিসেব মিটিয়ে নেবার সম্ভাবনাও আছে বলছেন।
সেক্ষেত্রে পুরোনো রেকর্ড গুলো দেখতে হচ্ছে।
—শোনো ভাই দেবলীনা।তুমি নতুন। আমি অনেকদিন ঘানি টানছি।এসব রাজনৈতিক ঋণ পরিশোধ।
—-কী করে এত নিশ্চিত স্যর।
এতো সোজা হিসেব।এলাকা দখলের লড়াই বোঝাই যাচ্ছে।
দেবলীনার রক্ত উষ্ণ হচ্ছে।দমন করে নিজেকে।
—- ওকে স্যর তদন্ত চলুক।আশা করছি আপনাকে ফরেন্সিক রিপোর্ট এলে তারপর আগামী দিন দশেকের ভেতর কিছু খবর দিতে পারব।
—হা হা হা দিনদশেকে তো কেস ঠাণ্ডা। খুনিরা পগাড় পার।
দেবলীনা চোয়াল শক্ত করে।
আজ খুব রোদ্দুর।
চারিদিকে ভিড়।আমজনতার ভিড়ে মিশে আছে খুনী অথবা খুনীমনস্ক মানুষ।
ফোনটা বাজছে।
–বলুন মিঃ সেন
–আচ্ছা
–ওকে
—ওগুলো ও পাঠিয়ে দিন ফরেন্সিক এ
–ওকে। হ্যাঁ সব ঠিক আছে। কালিয়াচক থানার ওসি আর তার ডিটেল পাঠান।
–কা লি য়া চক
রহিম একটু গাড়ি সাইড করো।
শহর ছাড়িয়ে গ্রাম মধ্যবর্তী ফাঁকা একটা জায়গা।একটা মোড় এর পর।তিন দিকে তিনটে রাস্তা।
এটা বেঁটে বটগাছ। পেছনে জলাশয়।মজা খাল।একটা সিগারেট ধরায়। রজত কাছে একটা ঝুপড়ি দোকান থেকে চা আনতে গেছে।
বাঁ হাতে একটা ভাঙা মন্দির। ভেতরটা অন্ধকার।
কালিয়াচক পি এস নং 635/18
U/S 25(i)(a)Arms Act 30/08/18
আকবর শেখ,নেকবর শেখ,তাজের সেখ দশ বছরের কারাদণ্ড।
একটা ছোট্ট খবর জামিনে মুক্ত নেকবর শেখ ও তাজের 20/6/20 ,
মোস্ট ওয়ান্টেট এর লিস্ট এ কেন তবে আকবর শেখের নাম! একই কেস এ গফ্ফর শেখ এখনো অধরা।
—রজত তুমি সিগারেট ধরাতে পারো।
–না স্যর ঠিক আছে
না ঠিক নেই। আপাতত সিগারেট ধরিয়ে মগজটা একটু সাফ করো।বলো কালিয়াচক আর ছোটো নবাবগঞ্জ এর মধ্যে মিল আছে কোনো।
রজত চমকে তাকায়।
—হোমওয়ার্ক রজত।একটু হোমওয়ার্ক করতে হবে।
মোহিনী মোহনের শশুরবাড়ি কালিয়াচক। শালার ব্যবসা ধোঁয়াশা।
গত বছর তার স্ত্রী র ঝুলন্ত দেহ পাওয়া গেছে বাড়ি র পেছনের গাছে।
অবৈধ প্রেম। কেস ধামাচাপা।
মোহিনীর মেয়ে কেন কালিয়াচক যেত বার বার। জানো কিছু।
—কাল সকালের মধ্যে খবর দিচ্ছি স্যর।
–আমাদের ইনফরমারদের এখনি জানিয়ে দাও যোগাযোগ করতে।
—এটা শিব মন্দির তাই না।
হ্যাঁ
তোমার ইলিশ মাছ ভালো লাগে রজত
হ্যাঁ, খুব।
চলো দেখি আমাদের আসলাম মিঞা ব্যবস্থা করতে পারে কিনা রবিবার দুপুরে।
রজত খেই হারিয়ে ফেলে।তল পায় না এই মহিলার। ভয়ঙ্কর গম্ভীর থেকে পলকে ছেলেমানুষি।
শাওয়ারের নীচে নগ্ন রজত দেবলীনা স্যর কে ভাবে।উত্থিত পুরুষ অবাধ্য হয়। অস্থির হয়ে যায়। নির্গত হয় আস্নান করে।
দেবলীনা মুর্মু। বিছানায়। আজও মনে পরে। একজন সাঁওতাল নারী আই পি এস। এটাই খবর ছিল একদিন।
আদিবাসী, উপজাতি, সোরেন,কিস্কু,হাঁসদা, মুর্মু তারা ব্রাত্য এই সমাজে।
তাই আশ্চর্য খবর হয়। একজন ব্রাহ্মণ আই পি এস খবর হয় না।
আমাদের দেশ। উপজাতি মানে মূর্খ, কোটায় পাওয়া চাকরি দিনরাত এক করে আধপেট খেয়ে নিশিথ রাতের পর রাতের সেসব নিষ্ঠা হেরে যায় “উপজাতি “শব্দটার কাছে।
ক্লান্ত দেবলীনা ঘুমের মধ্যে ফিরে যায় গহীন বনে।শাল পিয়ালের অরণ্যে।

ক্রমশ…