নরবুজী

২০১৭ সালের গ্রীষ্মের ছুটিতে লাদাখ ঘুরে আসার পর থেকে কয়েক মাস সকাল-সন্ধ্যা আমার বর স্বপন আর ছেলে তুতাই, পালা করে লাদাখের গল্প শোনাতো। পৃথিবীতে এর থেকে সুন্দর জায়গা আর হয় না, এর থেকে ভালো ভ্যাকেশন আর কোনদিন হয়নি ওদের। স্বপন আবার এর সাথে আরেকটি লাইন জুড়ে দিতো, “যারা লাদাখ যায়নি, তাদের জীবন বৃথা”! ওই শেষ লাইনটা শুধু আমাকে আর মেয়ে তৃষাকে শোনানোর জন্যই বলতো, আমরা জানতাম। আসলে আমাদের চারজনেরই একসাথে যাবার কথা ছিলো। কিন্তু বিশেষ এবং সঙ্গত একটি কারণে আমি আর আমাদের মেয়ে যেতে পারিনি।
ওই একই গল্প যখন প্রায় তেতো লাগতে শুরু করেছে, সেই সময় হঠাৎ একদিন শুনলাম নরবুজী’র নাম। কিছু একটা রান্না করতে করতে হঠাৎ কানে এলো স্বপন ফোনে কাউকে বলছে, “আমাদের ড্রাইভার নরবুজী তো বলেছিলো কবেই সে এক-পা কবরে দিয়ে রেখেছে– হা হা হা।” ও মা ! এ কি কথা ! রান্না যা হবে তা হবে। স্টোভ নিভিয়ে চলে এলাম যেখানে বসে স্বপন ফোনে গল্প করছিলো কারো সাথে। আমার এই অহেতুক প্রশ্নবোধক চেহারা দেখে ফোনটা রেখে দিলো বেশ তাড়াতাড়ি। আমি বললাম, “এক-পা কবরে চলে গেছে এরকম বুড়ো ড্রাইভারের ওপর নির্ভর করে তোমরা লাদাখের মত ভয়ংকর পাহাড়ি রাস্তায় ঘুরলে ?” “আরে না, না — ও খুব ভালো ড্রাইভার। কখনো গেলে দেখবে। ” এই বলে হাসি হাসি মুখে স্বপন চলে গেলো বাগানে ফুল গাছের যত্ন নিতে। ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না ঠিকই। তবুও ভাবলাম, যাগগে, ওরা যখন ঠিক-ঠাক ঘুরে চলে এসেছে, ওই নরবু জী’কে আমার না জানলেও চলবে।
সব উচ্ছ্বাসেরই একটা জোয়ার-ভাটা থাকে।তারপর কয়েক মাস গড়ালো, আমাদের বাড়িতে লাদাখের গল্পও কমতে শুরু করলো। মনে মনে ভাবলাম, “শান্তি” ! বর কাজে চলে গেলে চুপি চুপি ওর কম্পিউটারে বসে সব ছবিগুলো দেখে তৃষা আর আমি মাঝে মাঝেই বলতাম, “খুব মিস করেছি রে আমরা।” ওদের দু’চারটে ছবি ফেসবুকেও পোস্ট করলাম একসময়। বন্ধুদের ‘লাইক’ আর ‘কমেন্ট’ এর বন্যা দেখে মনটা আরও খারাপ হলো। সেই থেকে প্রয়োজনে এবং অপ্রয়োজনে বেশ শুনিয়ে শুনিয়ে বলতাম,”আমার সুইজারল্যান্ড দেখার স্বপ্ন ছিল সেই ছোটবেলা থেকে, সেটি হয়ে গেছে।”এটা বলাতে লাভ একটাই হয়েছিল—ওই লাদাখ ঘুরে আসা দু’জনের আরও বেশি কিছু বলার উৎসাহটা কমে গেছিলো।
বছর ঘুরে আবার গ্রীষ্মের ছুটির সময় চলে আসছে। স্কুল-কলেজের বছর শেষের আর অল্পদিনই বাকি।এমন সময় স্বপন জানালো আমরা সবাই মিলে লাদাখ যাচ্ছি l আর এবার আমরা ষোলো জন যাবো একসাথে! অবাক হবারই কথা। কিন্তু স্বপন এরকম ঢাক-ঢোল পিটিয়ে আমাদেরকে সারপ্রাইজ দিয়ে দিয়ে এমন অভ্যস্ত করে ফেলেছে যে, ও বেশিদিন চুপ করে থাকলে বরং আমরা এ-ওর দিকে অবাক হয়ে তাকাই আর বলি— What a surprise !
যাইহোক, দৌড়-ঝাপ, ছেলে -মেয়ের ফাইনাল পরীক্ষা, শপিং, প্যাকিং, ফ্লাইং, আর গাড়িতে দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরোনোর পর অবশেষে পৌঁছলাম লাদাখ। Leh-তে পৌঁছনোর পর আবার বহুদিন পর শুনলাম সেই নাম, নরবু। হোটেলের মালিক মিঃ পং, ডিনারের পর এসে বলে গেলো সকালে নরবুজী এসে আমাদেরকে শান্তিস্তূপ দেখাতে নিয়ে যাবে। তখন আমি ঘুমাতে চলে গেছি। এতোটাই ক্লান্ত ছিলাম যে, মিঃ পং এর কথা শুনেও কিছু বলা হলো না। “ওই বুড়ো ড্রাইভারের সাথে যাবো না” বলার মতো তীব্র প্রতিবাদটা ফোলানো বেলুনের মতো মনে জেগেই আবার হাওয়া ছেড়ে দেওয়া বেলুনের মতো মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো। একটা জোর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় এ-পাশ থেকে ও-পাশে ফিরেছিলাম সেটাই শুধু মনে আছে। রাত কখন নিমেষে কেটে গেছে টেরই পেলাম না। ঘুম ভাঙলো স্বপনের ডাকে। পাঁচটায় নরবুজী আসবে।
তৈরী হয়ে হোটেলের বারান্দায় যেতেই চোখ পড়লো অনেকটা দূরে আধো কুয়াশায় ঢাকা শান্তিস্তূপ। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম সেদিকে। হঠাৎ মনে হলো পেছন থেকে কেউ কিছু বললো। পেছন ফিরে তাকাতেই চোখে পড়লো একটি ছোট-খাটো ফিগারের লোক। লোকটি মাথা ঝুকিয়ে বললো, “নমস্তে ম্যাডাম, ম্যায় নরবু।” লোকটি আমার সামনে দাঁড়িয়ে, আর আমি তখন আশা-পাশে খুঁজছি “কবরে এক পা চলে যাওয়া” বুড়ো কোনো লোককে। লোকটি আমার খোঁজা-খুঁজির বহর দেখে মুখে ছোট্ট একটু হাসি মেখে বললো, “ইধার আউর কোই নেহি হ্যায়, ম্যাডাম।” ঠিকই তো ! পুরো বারান্দাতেই আর কেউ নেই। তাড়াতাড়ি রুমে গিয়ে স্বপনকে ডেকে দিলাম। স্বপন রুমের বাইরে এসেই, অন্য রুমগুলোতে ঘুমন্ত আমাদের দলের বাকি লোকেদের ঘুম ভাঙিয়ে, বিশাল জোরে “ন-ও-ও-রবু জী” বলতে বলতে লোকটির সাথে হ্যান্ডশেক করলো। মনে হলো ছেলেবেলায় রথের মেলায় হারিয়ে যাওয়া কোনো বন্ধুকে ফিরে পেয়েছে ! আমি তখন অনেক চেষ্টায় আমার চেহারায় ছানাবড়া চোখ আর দাঁত বের করা হাসির কম্বো বানিয়ে নরবুজী’কে বললাম “হ্যালো” l
এভাবেই আমার নরবুজী’কে চেনা। খুব অল্প কথার লোক। ওকে সাদাসিধে বললে খুবই কম বলা হয়। সময়-জ্ঞান ওর ঘড়ির কাঁটা সর্বস্ব। ঘড়ির দেয়া সময় ছাড়া ‘সময়’ কথাটির আর কোনো অর্থ তার মাথায় কম ঢোকে। তার বয়স, ছোটবেলা,– এসব নিয়ে প্রশ্ন করলে উদাস চোখে বহুদূরে কিছু একটা খুঁজছে এভাবে তাকিয়ে কথার উত্তর দেয় — যেন প্রাগৈতিহাসিক কোনো কাহিনী !
লাদাখের স্থানীয় লোকেদের জীবন খুব সাদাসিধে, আড়ম্বরহীন। হিমালয়ের কোলে ওদের জীবন চলে প্রকৃতির আপন খেয়াল-খুশির মাপে। লেহ থেকে নুব্রা-ভ্যালি (Nubra valley) যাবার পথ ভয়ংকর। কোনো কোনো জায়গায় প্রায় রাস্তার মাঝখান বরাবর পাহাড় ঝুঁকে রয়েছে —বিশাল পাথরের চাঁই গুলো দেখলে মনে হয় এই বুঝি পড়লো !একটা খুব ভয়ের জায়গা পেরিয়ে এসে বলেছিলাম, “নরবুজী, আপনি ভীষণ ভালো গাড়ি চালান ! আমাদের কোনো ভয় নেই।” কোনো উত্তর নেই নরবুজী’র। বেশ অনেকক্ষন পর যখন আমরা দুপুরের খাবারের জন্য থামলাম, নরবু জী আমাকে বললো, “ম্যাডাম, ড্রাইভিং কে টাইম পে কুছ আচ্ছা নেহি বোলনা চাহিয়ে। সব উপরওয়ালে কা মর্জি।”
লাদাখের দুর্গম সব রাস্তা ধরে সব ক’টা বিশেষ জায়গায় এই নরবুজী’ই আমাদেরকে নিয়ে গেছে তার গাড়িতে। কোনো ক্লান্তি নেই তার। কখন কোথায় যেতে চাই –আমাদের সব অনুরোধ সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। কিন্তু এক টাকাও তাকে টিপস দেওয়া যায়নি কোনোদিন। ওটা বললেই ওর মন খারাপ হয়ে যেত। অবাক হয়েছি আমরা।
আমাদের লাদাখ ট্রিপের শেষ দিন আমরা ‘আলচি’ নামে একটি গ্রামে বেড়াতে যাই। ওখানকার মনাস্টেরী(Monastery) খুব প্রাচীন এবং বিখ্যাত। যাবার পথে বেশ কিছু মাইল পর ডানদিকে ঢুকে যাওয়া একটি রাস্তা দেখিয়ে নরবুজী বললো এটা ওর বাড়িতে যাবার রাস্তা। অবাক হলাম! এতো দূর থেকে প্রতিদিন ও যখনই আমরা বলতাম সে ঠিক সময়মতো হাজির হয়ে যেতো আমাদের হোটেলে।
আমাদের লেহ(Leh) ছেড়ে চলে যাবার আগেরদিন রাস্তার নানা বাঁকে থেমে থেমে আমাদের দলের সকলেই অনেক ছবি তুললো। সেই সুযোগে আমি নরবুজী’কে জিজ্ঞেস করে করে জানলাম ওর কথা । বয়স একান্ন বছর। ইন্ডিয়ান আর্মিতে ড্রাইভার এর চাকুরি করতো এক-সময়। সেই কাজ থেকে রিটায়ারমেন্টে গেছে এখন থেকে ষোলো বছর আগে। তারপর থেকে নিজের গাড়ি চালায় — যখন যেমন ট্রিপ মিলে। কোনো চাহিদা নেই। নিজের পরিশ্রমে যেটুকু রোজগার করতে পারে, তাতেই সে খুশি।
আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আমরা আবার কখনো লাদাখ যাবো কিনা। আমি কিছু বলার আগেই বললো, “লাস্ট ইয়ার স্যার মুঝে বোলকে গয়ে থে, ফির আয়েঙ্গে— ব্যস, আ গয়ে ইস সাল। জো বাত দিল সে নিকালতে হ্যায় — ওহি সাচ হোতা হ্যায়।” বুঝলাম কত সরল মনের মানুষ সে! গতবছর স্বপন ওকে বলে গেছিলো “আবার আসবো”– তাই ওর ধারণা, এজন্যই এ বছর সে আবার যেতে পেরেছে। ওর ইচ্ছে আমিও অমনি করে বলি “আবার আসবো”— বললেই সেটা সত্যি হবে।
সেদিনই নরবুজী’কে আমাদের শেষ দেখা। পরদিন অন্য গাড়িতে করে আমরা সোনামার্গ চলে আসি। সেখান থেকে শ্রীনগর, দিল্লী হয়ে আবার আমেরিকায় ফিরে আসা। লাদাখ থেকে ফিরে এসে অব্দি শুধু একটাই কথা মনে হয়— এটা নিঃসন্দেহে আমাদের সেরা ভ্যাকেশন ছিলো। স্বপন গতবছর লাদাখ ঘুরে এসে যেমনটি বলেছিলো, “পৃথিবীতে এর থেকে সুন্দর জায়গা আর হয় না, এর থেকে ভালো ভ্যাকেশন আর কোনদিন হয়নি” — আমারও এখন সেই একই মত। মানুষের বানানো ঝাঁ-চকচকে আকাশছোঁয়া বিলাসবহুল সৌন্দর্যের সাথে, প্রকৃতির নিজের হাতে সাজানো ওই সৌন্দর্য আর সেই সাদা-সিধে, সরল-মনের মানুষগুলোর তুলনা করার মতো কিছুই আমি খুঁজে পাই না। নরবুজী, তোমার বিশ্বাসই সত্য হোক– আমার মন বলছে,”আমরা আবার লাদাখ যাবো!”