শ্রীরামপুরের কথা

কেরীসাহেবের মৃত্যুর কিছু পরেই শ্রীরামপুরের আর এক রত্ন রেভারেন্ড জোশুয়া মার্শম্যান পরলোকে যাত্রা করলেন। কিছু বছরের মধ্যেই এই দুই ইন্দ্রপতন মেনে নিতে পারলেন না আপামর শ্রীরামপুরবাসী। কারণ ভিনদেশী হলেও খ্রীষ্টান মিশনারীদের সাথে যেন তাদের নাড়ীর সম্পর্ক। ১৮৩৭ সালের ৫ই ডিসেম্বর মিশন ও কলেজের সমস্ত মায়া ত্যাগ করলেন জনদরদী মার্শম্যান। শহর গড়ে ওঠার সূচনা পর্বে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। শ্রীরামপুর কলেজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বুকে নিয়ে যে ব্যক্তি জাহাজে চড়ে ছুটে গিয়েছিলেন সুদূর ডেনমার্ক, সাক্ষাৎ করেছিলেন ডেনমার্ক অধিপতি ষষ্ঠ ফ্রেডরিকের সঙ্গে, তিনিই বিখ্যাত দেশবরেণ্য মিশনারী শ্রীরামপুর অন্তপ্রাণ জোশুয়া মার্শম্যান। যেদিন তাঁর শবদেহ শ্রীরামপুরের রাজপথ দিয়ে এগিয়ে যায় মিশনারীদের সমাধিক্ষেত্রের দিকে, দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য সাধারণ মানুষ চোখের জল ফেলে শ্রদ্ধা জানান তাঁকে। কলেজ ভবন থেকে তাঁর মরদেহ দে স্ট্রিট হয়ে এগিয়ে যায় মিশনারীদের সমাধিক্ষেত্রের দিকে। এই দে স্ট্রিট রাস্তাটি শ্রীরামপুরের অতি প্রাচীন সড়ক। এর সাথে যাঁর নাম যুক্ত তিনি ড্যানিশ কোম্পানির সাথে বাণিজ্য করা প্রভাবশালী বেনিয়া রামচন্দ্র দে। নিজের বাড়ির সামনে এই রাস্তাটি প্রায় নিজখরচে নির্মাণ করেন তিনি। তাঁর নামেই আজকের ‘দে স্ট্রিট’।

কেরীসাহেবের কোনও উদ্দেশ্য মার্শম্যান সাহেবের সাহায্য ছাড়া কখনো সফল হয় নি। ১৭৬৮ সালের ২০শে এপ্রিল ইংল্যান্ডের ওয়েষ্টবেরী শহরে তিনি জন্মেছিলেন। তারপর বিলেতে ব্যাপ্টিস্ট মিশন প্রতিষ্ঠার পর উইলিয়াম কেরীর সাথে পরিচয় এবং ধর্মপ্রচারের লক্ষ্য নিয়ে ভারতে আগমন। শ্রীরামপুরে মিশন প্রতিষ্ঠার পরে তাঁর স্ত্রী হানা মার্শ্যম্যান একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এই স্কুলের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে। মিঃ ও মিসেস মার্শম্যান ছিলেন শ্রীরামপুরবাসীর চোখের মণি। মানুষের সেবায় তাঁদের ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা বলে শেষ করবার নয়। শ্রীরামপুরের শহরবাসীর কাছে হানা মার্শম্যান যেন হয়ে উঠেছিলেন জীবন্ত এক দেবী। বিলেত থেকে তিনি এসেছিলেন বাংলা ও বাঙালীর কাছে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল হয়ে। মার্শম্যান সাহেবের এক নির্ভরযোগ্য কর্মচারী ছিল। লোকে তাকে গুরুদাস কেরানি বলে ডাকত। শহরবাসী কেউ বিপদে পড়লেই হানা মার্শম্যানের তরফ থেকে সেখানে উপস্থিত হয়ে যেত গুরুদাস। একসময় ড্যানিশ আদালতে একটি মোকদ্দমা জমা পড়ে। মামলাটি জনৈক ব্রাহ্মণের টাকা ধার করা প্রসঙ্গে। মহাজনকে টাকা শোধ করতে না পারায় নিলামে ওঠে তাঁর বাড়িটি। কিন্তু আদালতে মোকদ্দমার দিন ধারের ৫০০ টাকা সুদ সমেত হাতে নিয়ে উপস্থিত হয় গুরুদাস। মার্শম্যান পত্নী ঠিক সময়ে ব্রাহ্মণের পাশে দাঁড়িয়ে ভিটেমাটি ফিরিয়ে দেন তাঁকে। এমনই ছিলেন মিসেস মার্শম্যান। কিন্তু ১৮৪৭ সালের ১লা মার্চ তিনিও সমগ্র শ্রীরামপুরবাসীর চোখের জল সঙ্গে করে নিয়ে সমাধিক্ষেত্রের মাটি নেন। মাত্র এগারো বছর বয়সে বাবা মাকে হারিয়ে দাদু রেঃ ক্লার্কের কাছে বেড়ে ওঠেন তিনি। সতেরো বছর বয়সে জোশুয়া মার্শম্যানের সাথে বিয়ের পর ১৭৯৯ সালে মিশনারীদের সঙ্গে শ্রীরামপুরে পা রাখেন। আর তারপর থেকেই শুরু তাঁর কর্মযজ্ঞ। এদেশকে ভালোবেসে এদেশের মানুষদের জন্যই বাকি জীবনটা উৎসর্গ করেন তিনি। একজন বিদেশিনীকে মাত্র কয়েক বছরে শ্রীরামপুরবাসীও আপন করে ফেলে। মেমসাহেব থেকে আপামর বাঙালীর মা হয়ে উঠতে তাঁর এতটুকুও দেরি লাগেনি।
একদিকে কলকাতায় ইংরেজ কোম্পানির অপশাসনে ধীরে ধীরে সাধারণ বাঙালীর মধ্যে পুঞ্জিভূত হচ্ছে ক্ষোভ, যার মধ্যে একটি তার ২০ টি বছর পরে দাবানলের মত নীলবিদ্রোহ নামে ছড়িয়ে পড়ে বাংলার প্রতিটি কোণে। আর অন্যদিকে কলকাতার কাছেই শ্রীরামপুরে ভিন্ন ছবি। সেই শহরে কয়েকজন ইংরেজ মিশনারীর চিরবিদায়ে চোখের জল ফেলতে কার্পণ্য করেনি বাঙালী। কলকাতায় যেমন ডেভিড হেয়ার, ড্রিঙ্কিনওয়াটার বেথুন সাহেবের জয়ধ্বনি উঠেছে বারেবারে, ঠিক তেমন ভাবেই গঙ্গার পশ্চিমে শ্রীরামপুরে মুখে মুখে ফিরেছে কেরী, ওয়ার্ড, মার্শম্যান সাহেবদের নাম। মৃত্যুর ২০০ বছর পরেও এই ত্রয়ীকে ভোলেনি শ্রীরামপুর।

মিশনারী ত্রয়ীর চিরবিদায়ের পরেও শিল্পী মনোহর কর্মকারের হাত ধরে চলতে থাকে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস ও অক্ষর নির্মাণের কারখানা৷ এরমধ্যেই ১৮৩৯ সালে একজন বাঙালী শিল্পী অক্ষরনির্মাণ করছেন শুনে ছাপাখানা পরিদর্শনে আসেন রেভারেন্ড জেমস কেনেডি৷ মনোহর তখন বাইবেলের জন্য অক্ষর নির্মাণে ব্যস্ত। একেবারে ইউরোপীয় পদ্ধতিতে একজন বাঙালী শিল্পী অক্ষর নির্মাণ করছেন দেখে মুগ্ধ হয়ে যান তিনি। সবকিছু দেখেশুনে কেনেডি সাহেব অবাক বিস্ময় নিয়ে ফিরে যান।
দ্বিতীয়বার শ্রীরামপুর শহর ড্যানিশদের হাতে তুলে দেবার পর বাণিজ্যের প্রায় সব দিকগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল ব্রিটিশরা। ধীরে ধীরে জৌলুশ হারাতে শুরু করে কোপেনহেগেন থেকে পরিচালিত ড্যানিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তিল তিল করে শ্রীপুর, মোহনপুর আর গোপীনাথপুরকে তাঁরা বানিয়ে তোলে ফ্রেডরিক্সনগর তথা আধুনিক শ্রীরামপুর। কিন্তু বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ায় কপর্দকহীন ড্যানিশরা বাধ্য হয় শহর নিলামে তুলতে। কারণ সবকিছু গুটিয়ে নিয়ে ভারতবর্ষের পাট চুকিয়ে দেশে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না তাঁদের।