গল্প নেই – ১৩

আমার এক বন্ধু আমাকে সাবধান করে বলেছিল, রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে গিয়ে আমি যেন কোন ভুল বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে ফালতু ঝামেলায় জড়িয়ে না পড়ি।
কারণ কি? বয়স হচ্ছে। তাছাড়া আমরা কেউই অরণ্যদেব বা টারজান নই যে দুই হাতের ভরসায় ও শক্তিতে বাড়তি ঝামেলা আটকাব।
শুধু শুধু ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার দরকার কি? তাছাড়া কোনোকালেই পথে-ঘাটে কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে তা সমর্থন করার জন্য পাশে বেশি লোকজন পাওয়া যায় না। যে যার মতো মুখ ঘুরিয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যায়। তাহলে আমিও যাব না কেন।
বন্ধুটির কথা শুনে যে খুব একটা পছন্দ হল তা নয়। তবুও তর্ক ও প্রতিবাদ করলাম না। ভাবলাম প্রতিবাদ না করার অভ্যাসটা এখান থেকেই শুরু করি। তখন থেকেই কষ্ট হলেও অভ্যাস করতে শুরু করলাম। কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করে কিভাবে নির্লিপ্ত থাকা যায়।
তারপর থেকে কেউ বাসের সামনের সিটে বসে জানালা দিয়ে থুতু ফেলে হাওয়ায় সেটা বাসের ভিতরে চালান করলে প্রতিবাদ করি না। ছিটকে এসে গায়ে লাগার উপক্রম হলে কিছুক্ষণের জন্য উঠে দাঁড়িয়ে থাকি। বাসের মধ্যে বসে যখন কেউ খইনি তৈরি করতে গিয়ে পায়রা ওড়ানোর মতো চুন ওড়ায়, তখন রুমাল বের করে আত্মরক্ষা করি। দেখি যিনি চুন ওড়াচ্ছেন তার দিকে ভিক্ষে চাওয়ার ভঙ্গিতে দু’চারটি হাত এগিয়ে এসেছে। আমি প্রতিবাদ করলে এই খইনি প্রার্থীরা নিশ্চয়ই আমাকে রে রে করে তেড়ে আসত।
এদের কী গভীর বন্ধুত্ব। এইভাবে গুটখার প্যাকেট ছিঁড়ে যখন মুখে ঢালে তখন তার প্রসাদ উড়ে এসে চোখে মুখে লাগলেও প্রতিবাদ করার কথা মনে করি না।
এদের যে বন্ধুত্ব তা নষ্ট করা কি আমর উচিত? এরপরেই খইনি বা গুটখা মুখে নিয়ে শুরু হয়ে যায় তাদের থুতুকেলি। বাসের ভিতরের লোকজন বা রাস্তায় যারা হাঁটছে তাদের হয়ত মনে হয় এসব অসময়ের ইলশেগুড়ি বৃষ্টি। ঈশ্বরের আশীর্বাদও হয়ত ভাবেন অনেকে।
এসব চোখের সামনে দেখলে তখনই আমার বন্ধুটির কথা মনে হয়। সেই সাবধান বাণী। আমি প্রতিবাদ না করে মাঝ পথে বাস থেকে নেমে পড়লাম। অন্য বাসে যাব।
অফুরন্ত ধুলো আর ডিজেলের ধোঁয়ার ধাক্কায় বেশিক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে উঠে পড়লাম অন্য একটি বাসে। বসার জায়গা পেয়ে চোখ বুজলাম। আমার নজরে যেন আর কিছুই না পড়ে।
চোখ বুজে থাকা তো আর ঘুম নয়। পাশের ভদ্রলোক নামলেন। আমার জায়গা হল জানালার পাশে। সঙ্গে সঙ্গে খালি জায়গায় বসবাস জন্য দুজন ঝাঁপিয়ে পড়ে যিনি জিতলেন তার বিশাল বপু। আর একটু হলেই হয়ত আমার কোলে বসে পড়তেন। কোনোরকমে বেঁচে গেলাম।
বাসের বসার জায়গা গুলিও হয়েছে তেমন! একসঙ্গে দুজন ভালোভাবে বসতে পারে না।
হয়ত মানুষের পরস্পরের সঙ্গে নিকট সম্পর্ক তৈরি করবার জন্য এমন ছোটো করে বসার জায়গা তৈরির অনুমতি দিয়েছে ভারপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ।
আমার পাশে বসা ভদ্রলোক চলন্ত বাসের তালে তালে নিজেকে সামলাতে গিয়ে চেপে আসছেন আমার দিকে। জানালা দিয়ে বেরুবার উপায় নেই তাই বাধ্য হয়ে বসে আছি। জব্দ হয়ে।
এমন অবস্থার মধ্যেও ভদ্রলোক আমাকে কনুই দিয়ে ঠেলে ঠেলে নিজের পকেট হাতড়ে বের করলেন একটি প্যাকেট। দাঁতে ছিঁড়ে প্যাকেটের দ্রব্যটি চালান করলেন মুখগহ্বরে। হাওয়ায় উড়ে মশলার গুড়ো ঢুকল আমার নাকে। জাবর কাটার মতো ভদ্রলোক মুখ নাড়াচ্ছেন। অসহ্য একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
যার ভালো লাগে লাগুক। আমার তো লাগছে না। নেশা করতে হলে নিজের বাড়িতে বসে করলেন না কেন? বিরক্তিকর।
কিছু বলতে গিয়ে আবার বন্ধুর নিষেধের কথা মনে পড়ল। আত্মরক্ষার অস্ত্র রুমাল বের করে নাকের কাছে ধরলাম। তাতে কি আর ওই বিটকেল গন্ধ আটকানো যায়! ভাবছি বাড়ি ফেরার পথ কখন শেষ হবে।
ইতিমধ্যে বাস ভাড়ার জন্য টাকা এগিয়ে দিলেন ভদ্রলোক। বাসভাড়া নিয়ে কন্ডাক্টারের সঙ্গে বচসা শুরু হল। ভদ্রলোক গুছিয়ে জবাব দিতে পারছেন না। কেননা ততক্ষণে মুখের ভিতরে জমিয়ে ফেলেছেন গুটখা মিশ্রিত বিপুল পরিমান গয়ের।
ভদ্রলোক একটা কঠিন জবাব দেওয়ার জন্য আমার কোমরকে তাকিয়া করে নিজের কনুইটা রাখলেন। তারপর জানালার দিকে মাথা এগিয়ে দিয়ে গোটা পৃথিবীটা যেন পিকদানি এমন ভাবে মুখের ভেতরের যাবতীর বস্তু জানালা দিয়ে উগরে দিলেন। একজন পথচারীর গায়ে মনে হল যেন পিচকিরি দিয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হল রঙ। কিঞ্চিৎ আমার জামা প্যান্টের ভাগ্যেও জুটল।
এরপরেও আমি কি বন্ধুর নিষেধ শুনবো?