অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার

পাক্ষিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ১৬
বিষয় – অভিনয়
তারিখ – ১৬/১০/২০২০

অপরাজিতা

অনিন্দিতা অনেকদিন পর বাপের বাড়ী এসেছে। সমরেশ বাবু অনেক খুঁজে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার চিরঞ্জীতকে জামাই করে নিয়ে আসেন। চিরঞ্জিত রায় বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। দেখতে বেশ সুন্দর, চাকরিও করে খুব ভালো। সমরেশ দাস ছেলের বাড়ি এসে দেখেন, বিশাল বাড়ি ,ছেলের বাবা মায়ের ব্যবহার খুব ভালো। চিরঞ্জিত অমাইক ছেলে, মানে অনিন্দিতার বাবার তাই মনে হয়েছিল তাই মেয়ের জন্য এই জামাইটি তার উপযুক্ত মনে হয়েছিল। সম্পর্কটা ছেলের বাড়ির দিক থেকেই এসেছিল। ছেলের বাবা মা একটি বিয়ে বাড়িতে অনিন্দিতাকে দেখে নিজের ছেলের জন্য পছন্দ করেন এবং লোক মারফৎ অনিন্দিতার বাবার কাছে বিয়ের সম্বন্ধ পাঠান। এরপর দুই বাড়িতে কথা বার্তার আদান-প্রদান হয় তারপর বিয়েটা পাকা হয়। সমরেশ বাবু মেয়েকে বলেন মা অনু দেখিস এই বাড়িতে তুই রাজরানী হয়ে থাকবি ভীষণ খুশি হবি তুই।জানিস তো মা ছোট থেকেই আমি তোকে রাজনন্দিনী বলে ডাকি কিন্তু তোর বাবা তো আর তোকে রাজনন্দিনীর মত রাখতে পারেনি ।বিয়ের পরে আমার মেয়ে এইবার রাজরানী হয়ে থাকবে ।
অনিন্দিতা বিয়ে করে আসার পর শ্বশুরবাড়িতে পা দিয়েই বুঝতে পারে বাবার নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে ভুল।এরা অনেক চিন্তা ভাবনা করেই মধ্যবিত্ত ঘরের একটি মেয়েকে নিজের বাড়ির বউ করে এনেছে। নিজেদের স্ট্যাটাস বজায় রাখার জন্য সুন্দরী মেয়েকে ছেলের জন্য পছন্দ করেছে। বাড়িতে আসার পরে শশুর মশাই নতুন বউকে ডেকে বলে ,শোনো বৌমা এটা বনেদি বাড়ি এই বাড়ির বউ হয়ে যখন এসেছ কটা কথা তোমাকে মনে রাখতে হবে এবাড়ির অন্দরমহলের কথা বাইরে যাবে না ।সুখে থাকো দুখে থাকো মুখে যেন সর্বক্ষণ তোমার হাসি থাকে। তোমার কষ্ট, তোমার দুঃখ এটা সব তোমার একান্ত আপন খবরদার বাইরের কাকপক্ষী যেন টের না পায়।ফুলসজ্জার দিন সে বুঝতে পেরেছিল তার শ্বশুর এই কথা কেন বলেছিল। চিরঞ্জিত সম্পূর্ণ মদ্যপ অবস্থায় নতুন বউয়ের সামনে এসে বসে,বলে ,দেখো অনিন্দিতা, বাবা-মায়ের পছন্দে আমি তোমাকে বিয়ে করেছি শুধুমাত্র ,আমাদের সামাজিক ঐতিহ্য বজায় রাখার জন্য। একটা কথা কান দিয়ে শুনে রাখ একটি মেয়েতে আমি সন্তুষ্ট নয়। বেশিদিন একটা মুখ বিরক্ত লাগে আর মেয়ে মানে আমার কাছে ব্যবহারের জিনিস। আমি ওদেরকে ব্যবহার করি আর ফেলে দিই এই ভাবেই মনে করি ।নিজে অনেক টাকা রোজগার করি আর এই পরিবারের প্রচুর বৈভব সুতরাং নিজের মতো থাকো, আনন্দে থাকো আমাকে ঘাঁটিও না। তারপর বলে, বউ যখন করেছি তোমাকে আজকে রাতে সেই মর্যাদা টা তো আমি দেবোই তবে আমার কাছে তোমার কোন দাবি যেন কোনদিন না থাকে বলে চিরঞ্জিত অনিন্দিতার মতামতের পরোয়া না করে সেই রাত্রে একপ্রকার অনিন্দিতাকে ও বলাৎকার করে। সারারাত ধরে চিরঞ্জিত অনিন্দিতার ওপর যারপরনাই অত্যাচার করে।
পরদিন অনিন্দিতার বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতা ছিল না ।শাশুড়ি ওর ঘরে আসে বলে, এ বাড়ি ছেলেরা হচ্ছে রাক্ষস মা, আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াও নাহলে শশুর অকথ্য ভাষায় তোমাকে গালাগালি দেবে ।এরা এই অত্যাচার গুলো করবে বলেই গরিব ঘরের মেয়েদেরই বাড়ির বউ করে আনে। এতদিন ধরে আমি হাসিমুখে এদের সব রকমের অন্যায় সহ্য করেছি এবার তোমাকেও করতে হবে। তোমার বাবা বড় আশা করে তোমাকেই বাড়ির বউ করে পাঠিয়েছে। বাপ, ছেলে খুব ভালো অভিনয় করতে পারে।আর পারবে না ই বা কেন মেয়ে ধরা যাদের কাজ তাদের তো ভালো অভিনেতা হতেই হবে ।এক একটা মিছরির ছুরি। অনিন্দিতা আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে বাড়ির কাজ শুরু করে এইভাবে দুদিন বাদে দ্বিরাগমনে বাবার বাড়ি আসে। সমরেশ বাবু মেয়ে জামাইকে দেখে হইহই করে ওঠে ।সে আজকেরর জন্য বিপুল আয়োজন করে।অনিন্দিতা ভেবেছিল তার বিবাহিত সম্পর্কটা দ্বিরাগমনে গিয়েই শেষ করে দেবে কিন্তু বাবাকে দেখে ও বুঝতে পারে যে সত্যিটা জানলে বাবা বাঁচবে না তাই সে তার মত পাল্টায় ঠিক করে সে তার কষ্টটা চুপ করে সহ্য করে সুখী দম্পতির অভিনয় করে যাবে।প্রতিটি মেয়েই তো অভিনেতা সারাজীবন তারা সংসারের স্বার্থে সুখী থাকার অভিনয় করে যায় সেও না হয় তাদের মধ্যে একজন।
আজ অনিন্দিতার বয়স পঞ্চাশ বছর বাবা আর বেঁচে নেই শ্বশুর বেঁচে নেই বেঁচে থাকার মধ্যে তার মা আর শাশুড়ি বেঁচে আছেন।অনিন্দিতার মা পরবর্তী কালে মেয়ের ঘটনা সবটাই জানতে পারেন। এও জানেন যে তার জামাইয় লম্পট চরিত্রের ছেলে। সে ঘরের বউয়ের থেকে বাইরের মেয়েকে বেশি ভালোবাসে।অগাধ পয়সা মানুষকে বিপথে গমন করায়। আর বাবার চরিত্র ঠিক না থাকলে তার সন্তানও সেই রাস্তা ধরে ।চিরঞ্জিতেরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু আশ্চর্য অনিন্দিতাকে দূর থেকে দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই নিখুঁত তার অভিনয়।তাকে দেখে কে বলবে তার পুরো জীবনটাই ফাঁকি ।সে শ্বশুরবাড়িতে শাশুড়ির মেয়ে হয়ে বেঁচে আছে ।এখন তার ঘরটা আলাদা হয়ে গেছে। সে আর চিরঞ্জিতের সাথে থাকে না। এইটুকু বিরোধিতা করেছে ও, স্বামীকে পরিষ্কার জানিয়েছে, যদি আমার সাথে কোন রকম অন্যায় তুমি করো তবে আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। তারপরে দেখব সমাজে তোমাদের মুখ কি করে থাকে। এতদিন বাদে চিরঞ্জিত আর কিছু বলেনি কারণ তাদের মাঝখানে তাদের মেয়ে রিয়া এসেছে ।ভালোবেসেই হোক আর অভ্যাসের বসেই হোক অনিন্দিতার কোলে রিয়া এসেছে ।ভগবান সবার কাছে সবকিছু কেড়ে নেয় না তাই অনন্দিতার বাঁচার জন্য রিয়া নামের ছোট্ট একটা ফুলকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে।
রিয়াকে নিয়ে ও শাশুড়ির ঘরে থাকে এখন, শাশুড়ি অনিন্দিতা কে খুব ভালোবাসে।অনিন্দিতা একমনে রিয়াকে মানুষ করতে থাকে ভালো স্কুলে ভর্তি করে। একটাই স্বপ্ন ওর জীবনে যেন রিয়া বড় হলে নিজের পায়ে দাঁড়ায় তারপর সে যদি মনে করে তার পছন্দ মতন ছেলেকে বিয়ে করবে সম্বন্ধ করে আর সে রিয়ার বিয়ে দেবে না। বহুদিন বাদে অনিন্দিতা রিয়াকে নিয়ে এসেছে বাপের বাড়িতে। আসছিল না শাশুড়ি কে ছেড়ে কিন্তু মা অসুস্থ থাকায় শাশুড়ি জোর করে বাপের বাড়ী পাঠিয়েছে।মেয়েকে কাছে পেয়ে অনিন্দিতার মা মেয়েকে বলল, আর কতদিন এভাবে নিজেকে শেষ করবি মা? এবার তো তুই এখানে চলে আসতে পারিস এটাও তো তোর বাড়ি। অনিন্দিতা বলে মা আমি বাবার রাজনন্দিনী। রানী হয়ে থাকার অভিনয় এতদিন করে এসেছি আমারন করেও যাব। পৃথিবীর সুখী মহিলার অভিনয় করতে করতে নিজেকে এখন মাঝে মাঝে মহারানী বলেই মনে হয় কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের বিধ্বস্ত চেহারাটা নজরে আসে। ভয় পেয়ো না মা আমি রিয়াকে তৈরি করব। পৃথিবী দেখবে ও নিজের মতো করে। ভালবাসবে নিজেকে। আমার জীবন তো ফুরিয়ে এলো এই ভাবেই চলে যাবে। এসময় রিয়া মায়ের কোলে বসে বললো, মা আমি তোমার মত বউ হবো। অনিন্দিতা মেয়ের মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে, মা তোমাকে রাজরানী হতে হবে না তুমি দুর্গা মা ,কালী হও।এখন মেয়েদের এই সমাজে দুর্গা না হলে কালি হতে হবে ।প্রচুর অসুর জন্মে গেছে মা তাদের যে নিধন করতে হবে। আর অভিনয় নয় মা তোমাকে যে নিজস্বতা নিয়ে বাঁচতে হবে। নিজের পরিচয় নিজের সম্মান নিয়ে তুমি এই পৃথিবীতে বাঁচবে ।আমি সেইভাবেই তোমাকে তৈরি করব আর সেই জন্যই তো তোমার নাম দিয়েছি অপরাজিতা।।