ইঁটভাঁটার মজুর, শিশুর উপর বঞ্চনা আর দিদি কবিতা

১৩০২ বঙ্গাব্দে চৈত্র মাসের একুশ তারিখে বেশ কয়েকটি কবিতা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার মধ্যে তিনটি কবিতা সঞ্চয়িতায় স্থান পেয়েছে। মূল কাব‍্যগ্রন্থ ‘চৈতালি’। সঞ্চয়িতায় সংকলিত একুশ তারিখের কবিতা তিনটির মধ্যে ‘দিদি’ কবিতাটিকে খুব উল্লেখযোগ্য বলে মনে করি। নদীর তীরে পলিমাটি কেটে ইঁট গড়ে পাঁজা সাজাচ্ছে পশ্চিমী মজুর। রবীন্দ্রনাথ এদের‌ই দুটি শিশুর কথা বলবেন। একেবারে ছোট্টটি একটি পুত্র সন্তান। মেয়েটি তার চাইতে সামান্য একটু বড়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দুজনেই একেবারে ছোট। রবীন্দ্রনাথ এই ইঁটভাঁটার মজুরদের জীবনকে এই সংক্ষিপ্ত কবিতায় তুলে ধরেন। বেশ বোঝা যায়, এই মজুরেরা সাধারণ অদক্ষ শ্রমিক। মজুরি খুবই সামান্য। এদের নিজেদের গ্রামে জমিজমা না থাকার মতো। ভূমিহীন চাষিমজুর। পরের জমিতে কাজ কখনো সখনো জোটে। অথবা কারো কারো সামান্য একটু জমি আছে। তবে সে জমির পরিমাণ এত কম, বা উৎপাদিকা শক্তি এত কম যে, তার আয়ে সংসার চলে না। সেইজন্য বছরের অনেকটা সময় নিজেদের গাঁ ঘর ফেলে ছানাপোনা নিয়ে স্বামী স্ত্রী দলবলের সঙ্গে পুব খাটতে যায়।
বাংলার অর্থনীতির এক অভিশাপকে লক্ষ করেন অর্থনীতি সচেতন কবি। দেখতে পাচ্ছেন, মানুষকে জমি আশ্রয় দিতে পারছে না। তাকে হয়ে উঠতে হচ্ছে পরিযায়ী মজুর। কবি আরো লক্ষ করছেন, পুরুষটির একার মজুরিতে সংসারের খরচ টানা শক্ত। কেননা, একজনের মজুরি নামমাত্র।
স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে খাটলে তবে খানিকটা বন্দোবস্ত হয়। এই অবস্থায় পরিবারের শিশুরা বঞ্চিত হতে থাকে।
রবীন্দ্রনাথ দেখান, এমনই একটি ইঁটভাঁটা মজুর পরিবারের একটি শিশুকন্যা ঘরের কাজ করতে বাধ্য হয়।
ওইটুকু শিশুকন্যাকে বাসন মাজতে হয়, পানের ও অন‍্যান‍্য ব‍্যবহারের জল বহে আনতে হয়। আরো কিছু কাজ করতে হয়। এর উপরে একটা ছোট্ট ভাইকে দেখাশুনা করে সামলে রাখতে হয়।
ছোট একটা মেয়ে একসাথে সব কয়টা ঘটি, বাটি, থালা ঘষামাজার জন‍্য টেনে আনতে পারে না। বারে বারে তাকে দৌড়ে দৌড়ে আসতে হয়। আর ফিরে যাবার সময় মাথায় করে জলের ঘটটা বহে নিয়ে যেতে হয়।
ইঁটভাঁটায় উদয়াস্ত পরিশ্রমের পর নারী পুরুষের পক্ষে গৃহকর্মে ঢোকবার আর অবসর মেলে না। মজুর পরিবারের পুরুষ সদস্যদের দু রকম অস্তিত্ব। বাইরে খেটেখুটে পয়সা রোজগার করে আনার প্রশ্নে সে অবশ্যই মজুর। সেখানে সে সর্বহারা। কিন্তু এই মজুরটাই পরিবারের ঘেরাটোপে ফিরে মালিক। সুতরাং নিজের পানীয় জল সংগ্রহ করা, বা নিজের এঁটো বাসন নিজে সময়মতো মেজে ফেলা, এসব তার করার কথা নয়। এসব মেয়েদের কাজ। আর যেখানে মেয়েরা হাক্লান্ত, সেখানে শিশুদের বাধ‍্য হতে হয় এই বাসন মাজা, জল তোলার কাজ করতে।
‘বেটা’ কথাটার আদি অর্থ বিনা মাহিনার মজুর। শিশুকে পিতার পরিবারে শ্রমের বিনিময়ে অন্নসংস্থান করতে বাধ‍্য হতে হয়।
যে কাজ পুরুষেরা প্রত‍্যেকে হাতে হাতে করে দিতে পারত, তার বোঝা গিয়ে পড়ে শিশুকন‍্যাটির উপর। পুরুষ এবং নারীদের মধ্যে এমন উদ্ভট একটা পার্থক্য ভারতীয় সমাজে গড়ে উঠেছে।
অভাবের তাড়নায় মেয়েরা বাইরে খাটতে গেলেও পুরুষ কখনোই ঘটি বাটি মাজা, জল তোলার মতো মেয়েলি কাজে হাত লাগাতে যাবে না। তাতে পুরুষালি ভাবটা নষ্ট হয়। যে পুরুষ বাইরে মজুর, ঘরের ঘেরাটোপে সে মালিকের ভূমিকা উপভোগ করে।
এই কবিতার ইঁটভাঁটা এলাকায় একটি শিশুকন‍্যা এমন শোষণের শিকার।
এইসব পরিবারের মেয়েরা শুধু শোষণ ও বৈষম্যের শিকার নয়, তাঁরা এক‌ই সাথে অপুষ্টি ও অস্বাস্থ‍্যের‌ও করুণ শিকার। আয়ুও তাদের সীমিত। মেয়েরা এই সেদিনের ভারতেও কুড়ি পেরোতে না পেরোতে বুড়ি। আর অকালমৃত্যু? পুড়ল মেয়ে, উড়ল ছাই, তবে মেয়ের গুণ গাই, লোকবচনে তার হদিস আছে।
যে সময়ের কথা বলছি, তখন জন্মনিয়ন্ত্রণের ভাবনা সমাজের নিচের থাকের মানুষের মনে জায়গা পায় নি। একটির পর একটি সন্তানের জন্ম দিয়ে চলাই তখনকার দাম্পত্যরীতি।
সে কারণেই সংসারে একটি ছোট শিশুর পর আবার একটি ছোট শিশু। একের পর এক গর্ভধারণের দায়িত্ব পালন করতে করতে প্রসূতি মা হা ক্লান্ত, জীর্ণ, যৌবন সত্ত্বেও তিনি ধুঁকতে থাকেন। তাই একান্ত সদ‍্যোজাত শিশু না হলে, ছোট ছোট ভাইবোনের দায়িত্ব নিতে হয় তার চাইতে একটু বড় শিশুটিকে। কবি তৃষিত দর্শকের মতো এই মজুর পরিবারের শিশুদের দিনযাপন দেখতে থাকেন। অতি ছোট শিশুটিও জানে, দিদি ছাড়া তার আর কোনো আশ্রয় নেই। তাকে দিদির আদেশ মেনে চলতেই হবে।
দরিদ্র পরিবারের লোকজন ছোট শিশুর জন্য জামাকাপড় যুগিয়ে উঠতে পারে না। অথবা, শিশুর লজ্জা নিবারণের প্রয়োজনটুকু তাদের অসাড় চিত্তে ধরতে পারে না। আর ছোটশিশুর বোধবুদ্ধিও সামান্য। কলমের আঁচড়ে হতদরিদ্র ইঁটভাঁটার মজুরের শিশুদের বাস্তব ছবি এঁকে দেখান রবীন্দ্রনাথ। ওই ছোটভাইটি ন‍্যাড়ামাথা, কাদা মাখা, গায়ে বস্ত্র নাই। আর কেমন করে বাচ্চাটা দিদির সঙ্গে লেপটে থাকে, সেটাও বড়ো হৃদয়বেদ‍্য করে এঁকেছেন তিনি। বলেছেন, পোষা প্রাণীটির মতো। বয়সে সামান্য একটু বড় দিদিটির সঙ্গে অবোধ ছোটভাইটির সম্পর্ক বিন‍্যাস এঁকেছেন তিনি। এরপরেই ছোট্ট দিদিটির মধ‍্যে শিশুর জননীর প্রতিনিধিত্ব দেখতে পান তিনি। মাথায় তার জলপূর্ণ ঘট। বামদিকের কাঁখে বাসনের গোছা, আর আর ডানহাতে শিশু ভাইটিকে সামলে নিয়ে চলে বয়সে সামান্য একটু বড় আরেকটি শিশু। সেই ছোট দিদির মধ‍্যে মাতৃমূর্তি দেখতে দেখতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি বিশেষণ প্রয়োগ করেছেন – কর্মভারে অবনত। সজাগ সংবেদনশীল মনের দুয়ারে এই অংশটি বড় নাড়া দেয়। কঠিন দারিদ্র্য, ছদ্ম বেকারত্ব আর তার জন‍্য সিজন‍্যাল মাইগ্রেশন। আর তার‌ই কারণে শিশুদের শৈশব হারিয়ে যেতে থাকা। দারিদ্র্য, মাইগ্রেশন, অশিক্ষা, অপুষ্টি, রবীন্দ্রনাথ এই অলাতচক্রকে স্পষ্ট ভাবে দেখান তাঁর ‘দিদি’ কবিতায়। অথচ কবিতায় কোনো উচ্চকিত রূঢ়বাক‍্য নেই। শোষণের প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে স্লোগানের ধাঁচে কোনো অভিশাপ উচ্চারণ নেই। শুধু দক্ষ হাতে জ্ঞানাঞ্জন শলাকা দিয়ে আমাদের দৃষ্টিকে উন্মোচিত করে দেন তিনি। যেন নীরবে প্রশ্ন করেন, এইভাবে শৈশবকে বঞ্চিত করা সভ‍্যতার পরিচায়ক কি না?