প্রয়াণ দিবসে বঙ্কিম স্মরণ

আজ সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর ১২৭তম প্রয়াণ দিবস। তিনি বন্দে মাতরম্ মন্ত্রের স্রষ্টা। এই গান গাইতে গাইতে বহু দেশপ্রেমিক শহীদী বরণ করেছেন। এই গানে সুরারোপ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আর এই গানের ইংরেজি ভাষা শরীর দিয়েছিলেন আর একজন বরেণ্য স্বাধীনতা দার্শনিক অরবিন্দ ঘোষ। তিনি বন্দে মাতরম্ নামে সংবাদপত্রও করেছেন।
যাঁরা দেশকে ভালবাসি তাঁদের সকলের এই গানের শুদ্ধ রূপটি জানা প্রয়োজন বলে বোধ করছি।
আনন্দমঠ উপন্যাস লেখার অনেক আগেই বন্দে মাতরম গানটি লিখেছিলেন বঙ্কিম। নিজেই বেশ বুঝতে পেরেছিলেন এ এক অসাধারণ গান লেখা হল। পরে ওটি আনন্দমঠে অন্তর্ভুক্ত হয়। রবীন্দ্রনাথ সেই গানের সুরারোপ করেন। অরবিন্দ ঘোষ সেই গানের ইংরেজি ভাষা শরীর দেন। গানটির রবীন্দ্রকৃত সুরও অসামান্য। পরে অনেক কৃতী সঙ্গীতজ্ঞ বন্দে মাতরম্ গানের সুর করেছেন। কিন্তু জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে রবীন্দ্রকৃত সুরটির গভীর তাৎপর্য রয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ পড়তে গিয়ে দেখেছি বঙ্কিম সাহিত্য খুব প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জানতে গেলে বঙ্কিমকে জানা খুব দরকার।
সেই যে বাড়ির মেয়ে বৌরা দুপুরের অবসরে তাস খেলছেন, আর বালক রবি ‘বঙ্গদর্শন’ পড়বেন বলে চুপিচুপি আঁচলের খুঁটে বাঁধা চাবি চুরি করছেন, ছবিটা খুব মনে পড়ছে।
বঙ্কিমের ‘বন্দে মাতরম্’ সঙ্গীতের ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেছেন অরবিন্দ ঘোষ। আর চমৎকার সুরারোপ করেছেন রবীন্দ্র। পরে যদিও অনেক কৃতী সুরকার সেই চেষ্টা করেছেন, তবু রবীন্দ্র সুরারোপিত বন্দে মাতরম্ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আর সেই গল্পটাও রবীন্দ্র নিজের কলমে লিখেছেন। সেই যে এক অনুষ্ঠানে গিয়েছেন সাহিত্য সম্রাট। তিনি তখন খ্যাতির মধ্য গগনে। সেই অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রও গিয়েছেন। বঙ্কিমকে আয়োজকরা মাল্যদান করতে গেলে বঙ্কিম তাঁর অদূরে তরুণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দেখিয়ে বললেন, ওঁকে মালা দাও। বঙ্কিমের জন্ম জুন, ১৮৩৮, আর রবীন্দ্রের মে, ১৮৬১। বয়সে এত  ছোটো একজনের সুবিশাল সাহিত্য প্রতিভাকে চিনতে পারা, ও জনসমক্ষে সসম্মানে ঘোষণা করতে পারা, এক সিংহহৃদয় পুরুষের পক্ষেই সম্ভব।
বঙ্কিম বললেন, দেখ, যে একা সেই ক্ষুদ্র। বৃষ্টি নিয়ে মজা করে লিখতে লিখতে এমন একটা সিরিয়াস কথা কত সহজ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বঙ্কিম বলে দিলেন। অনেক পরে রবীন্দ্র লিখবেন ‘একসূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি..’. । সেখানে “বন্দে মাতরম” শব্দের প্রয়োগটি অমোঘ হয়ে উঠেছে।
বন্দে মাতরম্ বলতে বলতে অজস্র মানুষ শোষণ শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে সলিটারি সেলে কনডেমনড সেলে হাতে পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় মানুষ বন্দে মাতরম্ বলতে বলতে ঐক‍্য ও সংহতি বজায় রাখতে চেয়েছে। এক আধ বার নয়। অনেকবার। বন্দে মাতরম্ বলতে বলতে ঘরের মেয়ে বৌরা সংকোচের বিহ্বলতা ছেড়ে পথে নেমেছে । গুলি খেয়েছে, তবু পতাকাকে উঁচুতে তুলে রেখেছে। সুতরাং বন্দে মাতরম্ একটি জাতির মহাসঙ্গীত।
বঙ্কিম যে মানবমুক্তির কথাটা ভেবেছিলেন, তার আসল কথাটা হল গরিব মানুষের মুক্তির লড়াই। মুক্তি কিসের থেকে? দারিদ্র্যের থেকে। যত না আর্থিক দারিদ্র্য, তার অনেক বেশি চিন্তার দারিদ্র্য। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম মুক্তি বলতে বুঝেছিলেন রামা কৈবর্ত ও হাসিম শেখের মুক্তি। গরিব হিন্দু আর গরিব মুসলমানকে এক ব্র্যাকেটে রেখে তিনি দেখিয়েছিলেন আলাদা করে হিন্দু ও মুসলমান এর মুক্তি নেই। গরিব মানুষের জাত পাতের গণ্ডিভাঙা লড়াই নতুন দিন আনবে। বঙ্কিম তো বললেন। আমরা শুনবো কি?