জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর। বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন। চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।

আমার কথা

২৯
তার আগে ভূপাল ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটা করদ রাজ্য। ইতিহাস মুখস্থ থাকত। একটা রাগ ছিল, ভূপালি।
কিন্তু গ্যাস দুর্ঘটনাটি হয়ে যেতে আর ভূপালকে ভোলা গেল না। ঘুমের ঘোরে বিষ গ্যাস ফুসফুসে ঢুকে যারা মরতে বাধ্য হল তারা আমায় ভূপালের নাম ভুলতে দেবে না। গ্যাসটির নাম ছিল মিক। মিথাইল আইসো সায়ানেট। ইউনিয়ন কার্বাইডের কারখানা। শিল্প থাকলে দুর্ঘটনা হতে পারে। কিন্তু সেটাকে কিভাবে ডিল করছেন, তাই দিয়ে আপনাকে চিনে রেখেছি।
৩০
রবীন্দ্রনাথকে যাঁরা শুধু নরম, মিঠে, আলাপী, ভদ্র, সুসভ্য ভাবে দেখতে চান, তাঁরা তা দেখুন, তাঁদের সেই খেয়াল খুশির দেখা নিয়ে আমি কিছু বলার দরকার দেখি না। কিন্তু আগ বাড়িয়ে তাঁদের দেখাকে সত্য দেখাও বলতে পারব না। ভেতরে একটা অত্যন্ত শক্ত আর মজবুত মন না থাকলে অতোদিন ধরে বিশ্বভারতীর মতো প্রতিষ্ঠান চালানোই সম্ভব হত না। রথী, বন্ধু পুত্র সন্তোষ, ছোট জামাই নগেনকে বিদেশে পাঠিয়ে কার্যকরী কৃষিবিদ্যা গোপালন বিদ্যা শিখিয়ে এনেও কাজে লাগাতে পারেন নি। আবার নতুন মানুষ খুঁজেছেন। পেয়েছেন লেনার্ড এলমহারস্টকে। ভেতরের সেই মানুষটা অনেক ঘাত প্রতিঘাতের জন্যে তৈরি না থাকলে ওভাবে চিঠি লিখে নাইটহুড বর্জন অসম্ভব হত। ছোটো মাপের মানুষের ভাবনার সীমায় কুলোতো না।
শেষের দিকের কিছু কবিতায় নিজের সেই শক্ত মনটার পরিচয় পেশ করেছেন। গানেও আছে। নিছক একজন প্রণত ভক্ত হিসেবে নয়, মানবিক শক্তির অনুপম প্রকাশের সুযোগ যে এই পার্থিব জন্ম, সেটা দেখিয়েছেন। আর তাঁর আঁকা। আঁকায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেই কঠিন রাগী মনটাকে তুলে ধরেছেন।
রামকিঙ্কর বেইজ যেন সেই কঠিন রবীন্দ্রনাথকে চিনতেন, যিনি বলেছিলেন “কঠিনেরে ভালবাসিলাম। সে কখনো করে না বঞ্চনা”।
রামকিঙ্করের তৈরী রবীন্দ্রমূর্তির মধ্যে সেই কঠিনকে ভালবাসা রবীন্দ্রনাথকে ধরবার আকুতি আছে।
৩১
আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এর এত দীর্ঘ ইতিহাস আর দেশ টুকরো হল ধর্মের পরিচয়ে ! হিন্দু মুসলমান সাংঘাতিক দাঙ্গা দেশের এখানে ওখানে কোণে কোণে মাথা চাড়া দিচ্ছিল। 1946 থেকে ধারাবাহিক দাঙ্গা। আমার দেশের হিন্দু তার মুসলিম প্রতিবেশীকে মনে মনে আপন জানলে এভাবে দেশ ভাঙতো না। মুসলিমদের এক অংশ যেমন দাঙ্গায় মেতেছে, হিন্দুরাও যেখানে বাগে পেয়েছে সেখানেই দাঙ্গা করেছে। এই ঘৃণার ধারাবাহিকতা থেকে মুক্তি প্রয়োজন।
বর্ণ হিন্দুর হাতে দলিতরা যেভাবে নির্যাতিত হয়েছে, তার সীমা পরিসীমা নেই। হিন্দুর হাতে অত্যাচারিত হয়েছে তাদের ঘরের মেয়েরাও। এখনো অনেক ভাই, বাবা, কাকা ঘরের তরুণী কন্যাটিকে নিজের পছন্দের মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখতে দেখলে ক্ষেপে যায়। তাকে নিজের মতে চলতে দেবে না। বরং বোনের মাথা কেটে নিয়ে হাতে করে ঝুলিয়ে থানায় গিয়ে আত্ম সমর্পণ করবে, তবু বোনকে নিজের জীবন নিজের মতে গড়তে দেবে না। পণ দিতে গিয়ে বাড়ি বেচে দেবে, তবু বলবে না পণ দেবো না। এ দেশের পুরুষের একটা বিরাট অংশ নারী বিরোধিতা, আর দুর্বলের উপর অত্যাচার করায় বিশ্বাস করে। অসহিষ্ণুতা এ দেশের পুরুষের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
৩২
হে মার্কেটের শ্রমিক আন্দোলনে মালিকেরা দম্ভ করে বলেছিল -শ্রমিকদের অর্ধেক অংশকে ভাড়া করতে পারি বাকি অর্ধেককে খুন করবার জন্যে। দম্ভোক্তি তো বুঝলাম। কিন্তু মিছে কথা ছিল কি? আজও কি আমরা হয় কথায় নয় কথায় ভাই হয়ে ভায়ের বুকে ছুরি বসাচ্ছি না?