জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর। বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন। চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।

পর্ব – ২২৬

খেতে খেতে বাসন্তীবালা অনসূয়াকে বললেন, উনি আগে সব সময় তোমার বাবার বড় মনের কথা বলতেন। কতভাবে তিনি গরিব মানুষকে দাঁড়াতে সাহায্য করতেন।
অনসূয়া হাসলেন।
বাসন্তীবালা বললেন, তুমি কত বড় উকিল। তবু কত সহজ। তোমাকে তুমি বলছি বলে মনে কিছু করছ না তো?
মিষ্টির প্লেট এগিয়ে দিতে দিতে অনসূয়া হাসেন।
শশাঙ্ক বলেন, ওরে বাস্ রে! এত মিষ্টি খেতে পারব না।
অনসূয়া দুটি মিষ্টি দেখিয়ে বলে দিলেন, এগুলো নামমাত্র মিষ্টি।
এমন সময় সদরে কলিং বেল বাজলে গোবিন্দচন্দ্র দৌড়ে গেল দরজা খুলতে।
থানার মেজবাবু এসেছেন। তিনি পুলিশি কায়দায় অনসূয়াকে অভিবাদন করে দাঁড়িয়ে র‌ইলেন।
অনসূয়া স্মিত হেসে মেজবাবুকে বসতে বলে সহায়িকাকে জল মিষ্টি দিতে বললেন।
মেজবাবু বললেন, ম‍্যাডাম, আপনার কাছে আমার একটা অভিযোগ রয়েছে।
অনসূয়া উদার কণ্ঠে বললেন, বলে ফেলুন।
মেজবাবু বললেন, একজন এ এস আইকে দিয়ে শ‍্যামলী দেবীর জিনিসগুলো পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু, ডাকাডাকি করা সত্ত্বেও কেউ বেরোয় নি। উপরের বারান্দা থেকে এক মহিলা থামের আড়ালে লুকিয়ে থেকে বার বার বলেছেন, বাড়িতে কেউ নেই। এ এস আই বার বার করে বলেছেন, কোনো ভয়ের কারণ নেই। শুধু একটা জিনিস দিয়ে যাব। কিন্তু মহিলা দরজা খোলেননি।
কাজের সহায়িকা পুলিশের সামনে ঠক করে জল আর মিষ্টি নামিয়ে দিয়ে বলল, দিদি, শ‍্যামলী আছে কিনা জিগ‍্যেস করছিল। আমি ভয় পেনু। যদি মেয়েটাকে ধরে নিয়ে যায়। কে কোথায় কলকাঠি নাড়ছে কি করে জানব?
অনসূয়া বললেন, শ‍্যামলীকে ধরে নিয়ে যাবে কেন?
সহায়িকা বলল, আমরা মুখ‍্যুসুখ‍্যু মানুষ। পুলিশ দেখলে ডরাই।
মেজবাবু বললেন, একজন মানুষের গলায় কেউ যদি বলে, বাড়িতে কেউ নেই, তাহলে কথাটা কি হাস‍্যকর‌ই না শোনায়?
অনসূয়া বললেন, তাহলে ওর একটা শাস্তি হ‌ওয়া উচিত।
মেজবাবু বললেন, হ‍্যাঁ ম‍্যাম। দিন তো ওকে একটা কড়া ডোজের শাস্তি।
সহায়িকা আঙুলে আঁচলের খুঁট জড়াতে থাকে।
অনসূয়া গম্ভীর হয়ে বললেন, মেজবাবুর সামনের মিষ্টির প্লেটটা আরেকটা প্লেট দিয়ে চাপা দাও।
মেজবাবু হেসে বললেন, ম‍্যাম, শাস্তিটা কি আমার দিকে যাচ্ছে? আমি তো মিষ্টি খাই না বলি নি!
সেদিকে কান না দিয়ে অনসূয়া তাঁর সহায়িকাকে বললেন, মেজবাবুর জন‍্য গরম গরম লুচি ভাজো। প্রত‍্যেকটা লুচি ফোলা চাই।
পুলিশের লোক পেটপুরে  লুচি মিষ্টি খেয়ে, শ‍্যামলীর ব‌ই খাতা আর দুটো ব‍্যাগ  উপরে পৌঁছে দিয়ে গেলেন।
বাসন্তীবালা অভিমান ভরে বললেন, পুলিশের লোক যখন ফোন করে বলল, আপনার মেয়ে অনসূয়ার বাড়ি গিয়েছে, তখন নিশ্চিন্তে ছিলাম, বলে কয়ে মেয়েকে ঠিক ফিরিয়ে আনতে পারব। কিন্তু বেলায় যখন পুলিশ এসে বলল, শ‍্যামলীর জিনিস পত্র সব নিয়ে যাব, খুব দুঃখ হয়েছিল।  তাদেরকে বললাম, সারা বাড়িতে যেদিকে তাকাই সব তো তার স্মৃতি মাখা। প্লাস্টিকের বালতি মগ, চায়ের প্লেট, দেয়াল ঘড়ি, কত কি জিনিস! পুলিশ বলল, ওসব কিছু চাই না। বিছানা বালিশ কিছু লাগবে না। ব‌ই খাতা পেনগুলো হলেই হবে। তা আমি ওর পছন্দের জামাকাপড়ও কখানা ভরে দিয়েছি।
শ‍্যামলী ব‍্যাগ খুলে লাল রেশমি রুমালে মোড়া চিঠির তাড়া দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে সেটি নিয়ে সে যে ঘরে শুয়েছিল, সেখানে গিয়ে পর্দা টেনে দিল।
বাসন্তীবালা উঠে গিয়ে চট করে অনসূয়ার হাতদুটি ধরে বললেন, তুমি বয়সে আমার থেকে ছোট, তাই পা ধরতে পারছি না, আমার মেয়েটাকে ফেরত দাও।
 অনসূয়া বললেন, এ মা ছি ছি, আমি আপনাদের মেয়েকে মোটেও আটকে রাখি নি। রমানাথবাবু বেশি রাতে অরিন্দমকে ফোন করেছিলেন। অরিন্দম শ‍্যামলীকে খুব পছন্দ করেন। অরিন্দমের সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক। সে গভীর রাতে গাড়ি নিয়ে এসে। আমাকে তোলে। তার পর আমরা দুজনে মিলে থানায় গিয়ে বড়বাবুকে ডাকাই। মিসিং ডায়েরি না নিয়ে ইনফরমার পাঠিয়ে  বড়বাবু জানতে পারলেন শ‍্যামলীর পিসিও বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। ফুটপাতের হোটেলে কাজ নিয়েছে। তারপর বড়বাবু ফোর্স নিয়ে বেরোলেন আমাদের সাথে। উনি ভয় পাচ্ছিলেন শ‍্যামলীকে পাচার করে দিল কি না। পিসির কাছেই শ‍্যামলী ছিল। লোকটির ইনটুইশন খুব সুন্দর।
শ‍্যামলী ঘরের ভিতর থেকে বলল, ক‍্যালকুলেশন।
অনসূয়া বললেন, ওমা, তুই লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের কথা সব শুনছিস?
শ‍্যামলী বাইরে এসে বলল, বাবা, তুমি জান কি না, জানি না, আমি বেশ কিছু দিন ধরে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বাঁচতে চাইছিলাম। আমি তোমার কারখানায় কাজ করতাম। কিন্তু, সেটা দাদাদের ভাল লাগত না। এখন আমি সরে এসেছি। তুমিও ওদের কাছে সব দায়িত্ব প্লাস অধিকার দিয়েছ। আমার উপর দায়িত্ব অনেক ছিল বাবা, কিন্তু কোনো অধিকার ছিল না। কাজের বিনিময়ে আমি কোনো মজুরি নিইনি। আমাকে ওরা মারত, তোমরা চুপচাপ বসে বসে দেখতে। আমার পক্ষে ওখানে ফিরে যাওয়া ভীষণ বোকামি হবে বাবা। আমি দাদাদের উৎপাতে অনেকদিন ঘুমাতে পারি নি। আজ বাঁধন ছেড়ে বেরোতে পেরে প্রাণভরে ঘুমিয়েছি। এখানেও বেশিদিন থাকব না। আমি কলেজ হোস্টেলে চলে যাব।
শশাঙ্ক পাল তাঁর স্ত্রীকে বললেন, শোনো, এবার ওঠো, আর বসে থাকার মানে হয় না। নিজের ভাল ও যদি কিছুতেই না বোঝে, তুমি আমি কি করব?
শ‍্যামলী বলল, বাবা, তোমার কাছে শুধু একটা জিনিস চাইব, দেবে?
শশাঙ্ক বললেন, দ‍্যাখ্, তোর মা অবুঝ মানুষ। তাই তোকে সাধ‍্যসাধনা করছে। আমি তো জানি, তোকে আমি রাখব কোথায়? বুড়ো হাড়ে আমি তো বাঁদরদুটোর সঙ্গে টক্কর দিতে পারব না?
শ‍্যামলী বলল, বাবা, আমি তোমার কাছে এমন কোনো জিনিস চেয়ে বসব না, যা দিতে হলে তুমি অসুবিধায় পড়বে।
ম্লান হেসে শশাঙ্ক বললেন, তোর বুদ্ধি বিবেচনার আমি থ‌ই পা‌ই না। তবুও যদি এমন কিছু আমার আজো থেকে থাকে, তুই চাইলে না করব কি করে?
 একটা কাগজ নিয়ে খসখস করে শ‍্যামলী লিখল, আমি শশাঙ্ক পাল, পাল অটোমোবাইল এর স্বত্বাধিকারী হিসেবে শ‍্যামলী পালকে আমার মোটর গ‍্যারাজের দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণভাবে অব‍্যাহতি দিলাম। সে মনোযোগ সহকারে কাজ করেছে। তার দ্বারা আমার গ‍্যারাজের কোনো ক্ষতি হয় নাই। আমি তার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করি।
কাগজটা বাবার দিকে এগিয়ে দিয়ে শ‍্যামলী বলল, যদি অসুবিধা না হয়, একটু স‌ই করে দিও বাবা।
কাগজটা দেখে মাথা নেড়ে শশাঙ্ক বললেন, ওরে, কারখানা তো আর আমার হাতে নেই রে। আমি তো এটা লিখতে পারি না।
শ‍্যামলী বলল, ইচ্ছে করলেই পার বাবা। স‌ই করে নিচে একত্রিশে অক্টোবর  ১৯৮৪ তারিখ লিখলে অসুবিধা হবে না।
শশাঙ্ক নীরবে স্বাক্ষর করে দিলেন। বললেন, এটা তোর কি এমন কাজে লাগবে?
অনসূয়া কাগজটা টেনে নিয়ে দেখলেন। শ‍্যামলীর দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বললেন, বাঃ, এ তো তোর মাস্টার স্ট্রোক!
শশাঙ্ক বললেন, তুই বীরুর হাত থেকে বাঁচবি বলে আমায় দিয়ে এটা লিখিয়ে নিলি, তাই না?
সে কথার উত্তর না দিয়ে শ‍্যামলী অনসূয়ার দিকে চেয়ে বলল, একটা লোক বিদ‍্যাসাগর মশায়ের কুৎসা করছিল। বিদ‍্যাসাগর তাকে ডেকে বললেন, ওহে, তুমি আমার কুৎসা করছ কেন? আমি তো কোনোদিন তোমার কোনো উপকার করি নি! শেষের দিকে সাংঘাতিক রকম সিনিক হয়ে পড়েছিলেন তিনি।
ঘরের পরিবেশ বিষণ্ণতায় ভরে গেল।

ক্রমশ…