জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর। বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন। চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।

আমার কথা 

৮১
চাকরি সূত্রে যে কত জায়গায় গিয়েছি থেকেছি খেয়েছি মেখেছি। প্রতি জায়গায় যেখানেই একটানা অন্ততঃ ছমাস রাত কাটিয়েছি, সেখানেই দেখেছি, বাংলা ভাষার সাহিত্য কর্মী কবি সাংবাদিক ও সম্পাদকেরা আছেন। স্কুল থেকে থাকলেই বাংলার কয়েকজন ও ইংরাজীর দুয়েকজন মাস্টার মশায় থাকেন। কিন্তু বাংলা মাস্টার মশায়দের অনেকের কাছেই অমিয়ভূষণ মজুমদার, কমলকুমার মজুমদার বা জীবনানন্দ দাশ বা শঙ্খ ঘোষের কথা তুলে দেখেছি, তাঁরা খুব অপ্রস্তুত বোধ করে থাকেন। বেশিরভাগ বাংলা শিক্ষক শুধু বাংলা সাহিত্য নয়,নোট বইয়ের বাইরে কিছু যে পড়তে হয়, এটাই জানেন না। শিক্ষকরা আর একটু যত্ন নিলে বাঙালি আরো সাহিত্যমুখীন হয়ে উঠত।

৮২
কালকেতু তো আর জানতেন না, দেবী চণ্ডী কি চক্রান্ত করে রেখেছেন। একেবারে সাদা সিধে ব্যাধের ছেলে, সাব অল্টারন মাইন্ড সেট, দেবীর চালাকি বোঝার কথাই নয়। তো দেবী মায়াবলে সব পশু লুকিয়ে রেখেছেন। কালকেতু হন্যে হয়ে ঘোরে। দেবী একটি স্বর্ণগোধিকা, মানে গোসাপ সেজে বসেছিলেন। রাগ করে কালকেতু গোসাপটাকেই নিয়ে যাবো ভেবে ধনুকের ছিলায় বেঁধে এনেছে। ঘরে রেখে কোথায় বুঝি গেছে লোকটা। এদিকে তার বিয়ে করা বউ ফুল্লরা এসে দ্যাখে কি এক সোনার পারা লেডি ঘরে বসে আছে। বেশ চমকে যায় সে। একি হল কালকেতুর। এমনিতে দাম্পত্য জীবনে কালকেতু ফুল্লরা খুব হ্যাপি কাপল। কিন্তু দেবীর অস্তিত্ব গোলমাল বাধাবে যে। ফুল্লরা উঠে পড়ে লাগল ইনিয়ে বিনিয়ে দুঃখবাণী কইতে। আসলে ততটা দুঃখ নয়। তবু দুঃখের ছলে বলা। ফুল্লরার দুঃখবাণীতে না দুঃখের জিনিসটা ভারি মজা দিয়েছে।

৮৩
শারদীয়া পত্রিকা আমাদের দুর্গা পূজার বড় সম্পদ। বাংলা কাগজের বড় হাউস তো বটেই, ইংরেজি কাগজ স্টেটসম্যান পর্যন্ত শারদীয়া বের করেছেন ফেস্টিভ্যাল নাম্বার পরিচয়ে। আর বাংলার গ্রাম শহরের কত যে কোণ থেকে ছোট পত্রিকা বের হয়! গরিব, আধা গরিব কবিরা কোমর বেঁধে, বন্ধু বান্ধবের কাছে চেয়ে চিন্তে হলেও একটা শারদীয়া পত্রিকা করবেনই। যে বন্ধুরা একটু বিজ্ঞাপন যোগাড় করে দিতে পারেন, তাঁদের বাড়িতে হত্যা দেন তাঁরা। যারা অমন পারেন না, তারা পৈতেকালীন পাওয়া সোনার আংটি বেচে দেন। এসব কথা টুকটাক সকলের ঝুলিতেই থাকে। মোদ্দা কথা, বাঙালি যে কোণেই থাক, তার সাহিত্য বাতিক যায় না, আর পত্রিকা বের করতে সে পয়সা যে করে হোক জুটিয়ে ফেলে। কলেজ স্ট্রিটে টেমার লেন এ সন্দীপ দত্তের বাড়ি গিয়ে দেখে শুনে মনে হয়েছিল এই বাংলা থেকেই অন্ততঃ হাজার তিনেক পত্রিকা বছরের কখনো না কখনো বের হয়। সে অবশ্য আজ তিরিশ বছর আগে দেখা। মনে হয়, সংখ্যাটা এখনো অমনই আছে।

মেধা মুনির আশ্রমে সেই যে দেখা হয়েছিল সুরথ রাজা আর সমাধি বৈশ্য এর। তার পর শলা পরামর্শ করে দেবীর পূজা। দেবী দুর্গতিহরণ করেন। তার বহুকাল পর রামচন্দ্র সীতা হারিয়ে দুর্গা পূজা করবেন। শরৎকালে দেবতারা ঘুমান। সে সব দিনে যে শরৎকাল শীতের সময় ছিল। শীত পড়ত জাঁকিয়ে। শীত চলত অনেকদিন। শরৎ থেকে সাল। সাল মানে বছর। শরৎ থেকে সর্দি। সেই অসময়ে রামের ভারি প্রয়োজন পড়ে গেল দেবতাদের জাগিয়ে তোলার। মানুষের দাবিতে, গলাখাঁকারিতে দেবতাকে ঘুম ভাঙতে হয়। সেই অকাল বোধন। দেবীও ছলনা জানেন। পাক্কা ছলনাময়ী। আর্টিস্টিক লেভেলের ছলনার খেলা। পদ্ম রাখলেন লুকিয়ে। নীলপদ্ম ১০৮ টার কম হলে চলবে কেন? জেদের বশে নিজের চোখ উপড়াতে যান রামচন্দ্র। তিনি যেন জানেন,তার চোখটি ভারি সুন্দর। দেবী আহা বাছা করে পদ্ম ফিরিয়ে দিলেন। রামের দুর্গাপূজায় ব্রাহ্মণ কে? গল্প বলে সে ব্রাহ্মণ হলেন রাবণ। তিনি না কি যে সে ব্রাহ্মণ নন, একেবারে অসাধারণ ব্রাহ্মণ। ওঁকে পূজারী মানলেন রাম। যাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ, তাঁকেই পূজারী মানা? কিমাশ্চর্য ! বাঙালির দুর্গাকথায় যুদ্ধ নয়, মেলবন্ধনের গল্প।
“নবমী নিশি পোহায়ো না”, বলে কবির কলমে গিরিজায়ার আর্তি কানে আসে খুব। সূচনায় সেই “যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী, উমা আমার কত কেঁদেছে”। তার পরে “এবার উমা এলে আর পাঠাবো না”। বাঙালির ঘরের দুঃখবাণী রূপ নিয়েছে গৌরীকথায়। আর ঈশ্বরী পাটনীর কথাও মনের মধ্যে ভাসে। ” ভাল হয়ে বৈস মা গো, কুম্ভীরে যাবে লয়ে”। আর সেই প্রবাদ প্রতিম কথা, “শুনহ ঈশ্বরী আমি পরিচয় করি”। বাঙালির ঘরোয়া মনের পরতে পরতে দুর্গাকথা জড়িয়ে আছে।
দুর্গা কথায় সরস্বতী তো আসবেনই। কেননা তিনি যে দেবীর কন্যা। কিন্তু সরস্বতী দেবীর উৎপত্তি সম্পর্কে কথিত আছে যে পরমাত্মার মুখ থেকে একটি দেবী উদ্ভুত হন। ওই দেবী শুক্লবর্ণা, বীণাধারিণী, ও চন্দ্রের শোভাযুক্তা। এই দেবী শ্রুতি শাস্ত্রের মধ্যে শ্রেষ্ঠা, কবিদের ইষ্টদেবতা। সৃষ্টিকালে ইনি পাঁচ ভাগে বিভক্ত হন। রাধা, পদ্মা, সাবিত্রী, দুর্গা ও সরস্বতী। কি অদ্ভুত, কে কার মা, আর কে কার মেয়ে!
আমাদের ছোটো বেলায় দেবী সরস্বতীর বিশেষ মাহাত্ম্য ছিল। তিনি বিদ্যাদায়িনী। আর পেটে বিদ্যে না হলে, গরিবের ছেলে খাবে কি করে? বিদ্যে মানে আসলে কলম পেষার একটি চাকরি জোটানোর এলেম। একটু বড়ো হয়ে যখন হরমোনের প্রভাব বুঝছি শরীরে মগজে, তখন বিদ্যার দেবী হয়ে উঠলেন প্রেমের দেবী। মেয়েরা স্কুলে আসত তাদের স্কুলে সরস্বতী পূজার আমন্ত্রণের কার্ড নিয়ে। আর আমরা চক্ষে একগাদা তৃষ্ণা নিয়ে তেতলার ক্লাস ঘর থেকে উঁকি ঝুঁকি দিতাম। ভালবাসি, এই কথাটা দেবীর কানে কানে বলতে অনেক সময় লেগেছে অবশ্য।
সরস্বতী সম্পর্কে সেই শ্লোকটা বলে বলে মুখস্থ ছিল। চরাচর তাঁকে বন্দনা করে, তার বুক দুটিতে মুক্তো মালা শোভা পায়। হাতে তার বীণা আর বই। তিনি ভগবতী এবং ভারতী। সরস্বতীকে ভগবতী কেন বলা হল, বুঝতে গিয়ে দেখি সরস্বতীর উদ্ভব কৃষ্ণ কণ্ঠ থেকে। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে পূজা করেছিলেন। দেবী আবার শ্রীকৃষ্ণ কেই কামনা করেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ তাকে বলেন নারায়ণ ভজনা করতে। এ কথা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আছে। কিন্তু দেবী ভাগবত মতে সরস্বতী হলেন ব্রহ্মার স্ত্রী। দেব দেবীদের যে কত রকম!

৮৪
শংকর গুহনিয়োগীর কথাটা ঠিক ঠিক বলতে গেলে বলতে হয় তিনি মাইনে বাড়ানোর আন্দোলনের চক্কর থেকে বেরিয়ে এসে, সার্থকতর কিছু করার কথা ভেবেছিলেন। বলতে হয়, মজুরি বাড়ালেই যে শ্রমিকের মুক্তি নিশ্চিত হয় না, সে কথা তিনি বলতে চাচ্ছিলেন, আর মদের বিরুদ্ধে শ্রমিকের ঘরের মেয়ে বউকে যুদ্ধে নামিয়ে দিয়ে, মালিক শ্রেণীর কাছে তিনি বিপদজনক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁকে খুন না করালে চলছিল না। ভাড়াটে খুনি ধরা পড়ে, শাস্তি পায়। কিন্তু কার হয়ে সে ভাড়াটে খুন করে সে প্রশ্ন উহ্য থাকতে পারে না। সেটা মাঝে মাঝেই কূটপ্রশ্ন হয়ে মাথা চাড়া দেবে। আর হ্যাঁ, শংকর জলপাইগুড়ির ছেলে নিশ্চয়, কিন্তু আরো অনেক বেশি করে তিনি শ্রমিকের মুক্তির একজন অগ্রপথিক।