জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর। বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন। চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।

অসুখের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের যুদ্ধ

(জাতীয় বিজ্ঞান দিবস উপলক্ষে বিশেষ রচনা)
সাংঘাতিক অসুখ কোভিড ১৯। ভাইরাসের নাম করোনা। সারা পৃথিবী জুড়ে দাপালো সে। লকডাউন করতে হল। মাস্ক আর স‍্যানিটাইজার ব‍্যবহার মানবজীবনের অঙ্গ হয়ে উঠল। কিন্তু কয়েকটি মাস বাদে বিজ্ঞান গবেষণায় বেরিয়ে এল তার প্রতিষেধক। এই সূত্রে অসুখের বিরুদ্ধে চিকিৎসা বিজ্ঞানের যুদ্ধের  ইতিহাসের দিকে তাকাই।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে পুষ্টিকর টাটকা খাবারের গুরুত্বের কথা অনুধাবন করেছিলেন স্কটিশ শল‍্যচিকিৎসক জেমস লিণ্ড। তাঁর সময়ে স্কার্ভি ছিল উদ্বেগজনক রোগ। সেকালে পালতোলা জাহাজে চড়ে ইউরোপীয় নাবিক বেরিয়েছে পৃথিবীর আনাচে কানাচে। আর কৌটোবন্দি খাবার খেতে বাধ‍্য হয়েছে। সেই রকম বাসি খাবার খেয়ে স্কার্ভি রোগ হয়েছে। টাটকা লেবুর মতো ফল খেলে যে স্কার্ভি রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, এটা লক্ষ্য করলেন জেমস লিণ্ড। সেটা ১৭৪৭ সাল। তারপর বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কৌটোবন্দি খাবার খেয়ে নাবিকদের স্কার্ভি হয়, একথা প্রমাণ করে দেখালেন রবার্ট ফ‍্যালকন স্কট। ১৯১২ সালে লিস্টার ইনস্টিটিউট অফ প্রিভেন্টিভ মেডিসিন সংস্থায় গবেষণারত পোল‍্যাণ্ডের জৈবরসায়ন বিজ্ঞানী কাশিমির ফাঙ্ক বললেন, টাটকা খাদ‍্যে প্রোটিন, শ্বেতসার, স্নেহ পদার্থ, খনিজ লবণ ও জল ছাড়াও আর কিছু থাকে, যা আমাদের যথার্থ পুষ্টি যোগায়। এই অচেনা উপাদানকে তিনি অ্যামিন গোত্রীয় রাসায়নিক পদার্থ ভেবেছিলেন। নাম রেখেছিলেন ভিটামিন। পরে জানা গেল, ওটা অ্যামিন জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ হতেই হবে, এর কোনো মানে নেই। অথচ ভিটামিন নামটি জনমানসে মজবুত জায়গা পেয়ে গিয়েছিল। তখন জ‍্যাক সিসিল ড্রামণ্ড বললেন ভিটামিন শব্দের শেষে ‘ই’ বর্ণটিকে বাদ দাও। ভিটামিন নামটার অঙ্গচ্ছেদ হয়েও মোটের উপর টিঁকে গেল।
ভিটামিন বি১ আবিষ্কার হয়েছিল ১৯১০ সালে। তবে কাশিমির ফাঙ্ক ভিটামিন নাম রাখার ঠিক পরেই ভিটামিনের নানা অবতারের আবিষ্কার শুরু হয়ে গেল। ১৯১৩ তে ভিটামিন এ, ১৯২০ তে সি, ডি, আর বি২, ১৯২২ এ ভিটামিন ই, ১৯২৯ এ কে১,  ১৯৩১ এ বি৫, ১৯৩৪এ বি ৬, ১৯৩৬ এ বি৩, ১৯৪৮এ বি ১২। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ধরে ভিটামিন আবিষ্কারের জয়যাত্রা। ওইসাথে নোবেল সম্মানে ভূষিত করা হতে থাকল ভিটামিনের গবেষণায় যুক্ত বিজ্ঞানীদের। ১৯২৯ এ মেডিসিন বিভাগে যৌথ ভাবে নোবেল পেলেন ক্রিশ্চিয়ান আইকম‍্যান আর ফ্রেডারিক হপকিন্স, পরের বছর ১৯৩০ সালে রসায়ন বিভাগে যৌথ ভাবে নোবেল পেলেন পল কারার আর নরম‍্যান হাওয়ার্থ, ১৯৩৭ এ ভিটামিন সি নিয়ে গবেষণা করে মেডিসিনে নোবেল পেলেন সেন্ট গেওর্গি। ১৯৩৮ এ ভিটামিন বি২,আর বি৬ নিয়ে আলোকপাত করে রসায়ন বিভাগে নোবেল পেলেন রিখার্ড কুন। এক ভিটামিন বি ১২ নিয়ে গবেষণা করে পাঁচ পাঁচজন বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৩৪ এ জর্জ হুইপল, জর্জ মিনট, আর উইলিয়াম পি মারফি , ১৯৫৭ তে আলেকজান্ডার আর টড, আর ১৯৬৪তে ডরোথি হজকিন, এই মোট পাঁচজন বি১২ নিয়ে গবেষণা করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৬৭তে ভিটামিন বি২ নিয়ে গবেষণা করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন গেওর্গি ওয়াল্ড। নোবেল পুরস্কার না পেলেও বিজ্ঞানী নিকোলাই এল লুনিন, গুস্তাভ ভন বাঙ্গে, তাকাকি কানেহিরো, আর উমেতারো সুজুকির অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এতো গেল প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের কথা। এবার আসি কিউরেটিভ মেডিসিনের কথায়। প্রিভেন্টিভ মেডিসিনে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে মজবুত করে রোগ প্রতিরোধ করা হয়। কিউরেটিভ মেডিসিনে রোগের কারণ হিসেবে আদ‍্যপ্রাণী, পরজীবী প্রাণী, জীবাণু ও ভাইরাসকে চিনতে হয়। আর কিভাবে সেই জীবাণু ও ভাইরাসের মোকাবিলা হবে তা ভাবতে হয়। এইসূত্রে গুটিবসন্ত,  জলাতঙ্ক, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, পোলিও, কলেরা, আর ম‍্যালেরিয়ার মতো মারাত্মক রোগের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের জয়যাত্রার কথা বলি।
লোকে বলত মায়ের দয়া। যার হত, তার থেকে লোকে পালাত। মৃত‍্যুপথযাত্রীর মুখে জলটুকু পর্যন্ত দেবার সাহস রাখত না লোকে। শীতলা দেবী আসতেন গাধার পিঠে চড়ে। হাতে তাঁর ঝাঁটা। গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। আক্রান্ত হলে মৃত্যুর হার ছিল সাংঘাতিক। ক্ষতের দাপটে খুবই কদাকার হয়ে, এমনকি দৃষ্টিহীন হয়ে বেঁচে যেতেন অনেকে।
গুটি বসন্তের কথা বলছি। ১৭৯৬ সালে এডওয়ার্ড জেনার তৈরি করলেন গুটি বসন্তের টিকা। গো বসন্তের রোগীর গুটির পুঁজ থেকে তৈরি হল টিকা। সেই টিকা সুস্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করিয়ে রেহাই পাওয়া যেত। স্মরণাতীত কাল থেকে মানুষ গুটি বসন্তের শিকার হয়েছে।  ১৭৯৬ সালে টিকা আবিষ্কার করার পর সবে ১৯৮০ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা হু পৃথিবীকে গুটিবসন্ত মুক্ত বলে ঘোষণা করেছে। এই মে মাসেই জেনার সাহেব জন্মেছিলেন। ১৭ মে ১৭৪৯ তারিখটি  গুটি বসন্তের টিকা আবিষ্কারকের জন্মদিন। প্রয়াত হন ১৮২৩ সালের ২৬ জানুয়ারি।
বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা, প্রখর যুক্তিপ্রণালী আর নিরন্তর চেষ্টা গুটি বসন্তের মতো কালান্তক ব‍্যাধি থেকে মানব সভ্যতাকে বাঁচিয়েছে। বিজ্ঞানই বাঁচাতে পারে। অন‍্য কিছু নয়।
বেশ বোঝা গেল, জীবাণুর সংক্রমণে রোগ হয়। সে কথা ভাবতে গিয়ে  ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর ( ২৭.১২.১৮২২ – ২৯.০৯. ১৮৯৫) এর কথা মনে পড়ছে। স্কুলস্তরে পাঠ‍্যবইতে ছিল ওঁর কথা। পাস্তুর দেখালেন বাতাসের ধুলো থেকে অণুজীব সংক্রমণে দুধ নষ্ট হয়। মদও। ফ্রান্সের বিখ্যাত মদ‍্যশিল্পকে পুনর্জীবন দিলেন পাস্তুর। অণুজীবের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে এই পদ্ধতির নাম হয়ে গেল পাস্তুরাইজেশন।
লুই পাস্তুর ভয়াবহ জলাতঙ্ক রোগের টিকার প্রথম সার্থক প্রয়োগ করেন। ৬ জুলাই, ১৮৮৫ সালে তিনি জোসেফ মিইস্তার নামে একটি নয় বৎসরের বালককে জলাতঙ্কের টিকা দেন। তেরোখানি টিকা  নেবার পর সে ছেলে একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠলো।
লুই পাস্তুর দেখিয়ে দিয়েছিলেন নানা রকম মারণরোগ ঘটায় ব্যাকটিরিয়া। আর সেগুলিকে বিজ্ঞানীর চোখ দিয়ে চিনিয়ে দিতে তার ক্লান্তি ছিল না। আরো দেখিয়েছিলেন ব্যাকটিরিয়ার দৌরাত্ম্য  আটকানো যায়  বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে।
না, থালা বাসন, ঘটি বাটি বাজিয়ে, ঘরের জোরালো আলো নিভিয়ে মোমবাতি জ্বেলে নাটুকেপনা করার কথা তিনি মাথায় আনেন নি।
বিজ্ঞানী লিস্টার ( ০৫.০৪.১৮২৭ – ১০.০২.১৯১২) দেখালেন সংক্রমণ থেকে বাঁচতে কী করতে হয়। শল‍্য চিকিৎসা করতে গিয়ে বা কাটা ছেঁড়া ঘা থেকে যাতে পচন ধরে রোগীর প্রাণসংশয় না হয়, অর্থাৎ অ্যান্টিসেপটিক  পদ্ধতির আবিষ্কার করেন লিস্টার।
কুষ্ঠরোগীদের অভিশপ্ত বলে চেনানো হত। গেরহার্ড হ‍্যানসেন (২৯.০৭.১৮৪১ – ১২.০২.১৯১২) দেখিয়ে দিলেন মাইকোব‍্যাকটেরিয়াম লেপরি নামে ব‍্যাকটিরিয়ার কাজ ওই অসুখটা ঘটানো।
শাম্ব ছিলেন কৃষ্ণের পুত্র । শাম্ব নিজের পিতা কৃষ্ণকে গোপিনীদের সাথে রমণরত দেখে ফেলেছিলেন। তাইতে কৃষ্ণ ভীষণ রেগে পুত্রকে কুষ্ঠ আক্রান্ত হবার অভিশাপ দেন, এমন গল্পকথা ভারতীয় পুরাণকার লিখেছেন।
কুষ্ঠ পরিচিত ছিল সাংঘাতিক রোগ হিসেবে। কাজেই খুব স্বাভাবিক ভাবেই মনু মহাশয় বিধান দিয়েছিলেন যে কুষ্ঠ রোগ হলে রোগীকে সমাজ থেকে দূর করে দিও। ইংরেজ, যারা ভারতীয় কুসংস্কারগুলি দূর করতে পলিটিক্যালি ইচ্ছুক ছিলেন না, তারাও কুষ্ঠরোগীদের একঘরে করে রাখার সপক্ষে ফরমান জারি করেন। স্বাধীন ভারতেও এই ১৯৮৩ অবধি আইনটি চালু ছিল। স্বামীর কুষ্ঠ হলে স্ত্রী বিচ্ছেদ পেত সহজেই।
আশার কথা এই যে, ভারতের শীর্ষ বিচারালয় এই রোগ ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিতে চাইছেন।
কিন্তু কেন? কেন না, নরওয়ের বিজ্ঞানী গেরহারড হ্যানসেন  ১৮৭৩ সালে প্রমাণ করে দেন যে এই অসুখটি একটি ব্যাকটিরিয়ার অবদান। সেই ব্যাকটিরিয়ার নাম মাইকোব্যাক্টেরিয়াম লেপরি । এই রোগের চিকিৎসা আছে আর চিকিৎসা সঠিক সময়ে শুরু হলে এই রোগ সেরেও যায়।
মুশকিলের কথা হল অপুষ্টি আর অভাবকে যক্ষ্মা বা আমাশয় বা ম্যালেরিয়া বা আরো পাঁচটা রোগের মতো কুষ্ঠরোগটাও ভারি পছন্দ করে। ভারতে যেহেতু সাধারণ মানুষের জীবন বড্ডো বেশিরকম লজ্জাজনকভাবে অবহেলিত, তাই বিশ্বের ৫৯% কুষ্ঠরোগী এই ২০১৫ সালেও ভারতের বাসিন্দা। ভারতের প্রশাসন এই নিয়ে গর্ববোধ করতে পারেন।
এক ফরাসী মানবতাবাদী, রাউল ফোলেরো ১৯৫৪ থেকে জানুয়ারির শেষ রবিবারে বিশ্ব কুষ্ঠদিবস পালন শুরু করেন। ওই দিনটা আমাদের মহাত্মা গান্ধীর শহীদ দিবসের কাছাকাছি পড়ে বলে ভারতে মহাত্মাজীর মৃত্যুদিনকেও কুষ্ঠ প্রতিরোধ উপলক্ষে পালন করা হয়।
যাই হোক, ভারতে যুক্তিচর্চা খুব শীর্ণ ও অবহেলিত হবার কারণে, এবং রাজনৈতিক নেতারা প্রকাশ্যে কুসংস্কারের প্রশ্রয়দাতা হবার কারণে আজো কুষ্ঠরোগ নিয়ে আমাদের রাখঢাকের শেষ নেই। চিকিৎসা করার জন্য রাষ্ট্রীয় আরো উদ্যোগ দরকার বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহলের দাবি।
ম‍্যালেরিয়া ছিল সাংঘাতিক অসুখ। কিন্তু ভারতে জন্মানো ইংরেজ বিজ্ঞানী রোনাল্ড রস (১৩.০৫.১৮৫৭ – ১৬.০৯.১৯৩২) তার রহস্য উন্মোচন করে দেখালেন স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে ওই রোগটি হয়। তার আরো পরে আমরা জেনেছি প্লাজমোডিয়াম ফ‍্যালসিপেরম নামে আদ‍্যপ্রাণীকে নিজের পেটে বহন করে ওই নির্দিষ্ট মশা ওই রোগটি ছড়ায়।
মশা নানা রোগের বাহক। কিউলেক্স মশা গোদ এর সমস্যা ঘটায়। এডিস ইজিপটাই উপহার দেয় এনসেফেলাইটিস রোগের। টাইফয়েডের জীবাণু জলের ঘাড়ে চেপে আমাদের শরীরে ঢোকে। কমা ব‍্যাসিলাস আর ভিবরিও কোলেরি ঘটায় কলেরার মতো অসুখ। পোলিও মায়েলাইটিস ব‍্যাকটিরিয়ার আক্রমণে পোলিও হয়। যক্ষ্মাও ঈশ্বরের অভিশাপ নয়। হাইনরিশ হারমান রবার্ট কখ্ ( ১১.১২.১৮৪৩ – ২৭.০৫. ১৯১০) নামে জার্মান  যক্ষ্মা, কলেরা আর অ্যানথ্রাক্স রোগের জীবাণুকে চেনালেন। আমাশয় রোগে কখনো ভোগেন নি এমন বাঙালি বিরল। অ্যাণ্টামিবা হিস্টোলিটিকা নামে প্রোটোজোয়া আমাদের আমাশয় ঘটায়।  আন্তন ভ‍্যান লিউয়েন হক অণুবীক্ষণ যোগে অণুজীবের জগৎকে চিনেছিলেন। ব‍্যাকটিরিয়াকে পাকড়াও করেন। মাইক্রো বায়োলজি শাখার সূচনা করেন। তার সামান‍্য পূর্বে রবার্ট হুক কোশ আবিষ্কার করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি ঘটান।
‘অ্যান্টিবায়োটিক’ শব্দটির সাথে পরিচয় নেই এমন লোক পাওয়া শক্ত। আর অ্যান্টিবায়োটিক বললেই প্রথমে মনে পড়ে পেনিসিলিনের নাম। পেনিসিলিনের সঙ্গে মনে পড়ে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এর নাম।
পেনিসিলিয়াম নোটেটাম নামে ছত্রাক ক্ষরিত রস থেকে পেনিসিলিন বের করলেন স্কটিশ ব্রিটিশ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং (০৬.০৮.১৮৮১ – ১১.০৩.১৯৫৫)।
গবেষণাগারে অ্যান্টিবায়োটিক  তৈরি করেন ফ্লেমিং। কিন্তু রোগীকে বাঁচাতে প্রয়োজন ছিল প্রচুর পরিমাণে পেনিসিলিনের সরবরাহ, আর সেই পেনিসিলিনের শুদ্ধতা হতে হবে খুব উঁচু মানের।
আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার করলেও বিশুদ্ধ মানের পেনিসিলিন প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন ছিল যুগের দাবি। সেই কাজটা করে দেখালেন অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানী হাওয়ার্ড ওয়ালটার ফ্লোরে আর স‍্যর আর্নস্ট চেইন।
বিশুদ্ধ পেনিসিলিন পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরিতে ওঁদের এই প্রচেষ্টার ফলে ফ্লেমিং এর পেনিসিলিন আবিষ্কার বাস্তবে কার্যকরী ভাবে প্রয়োগ করা গিয়েছিল।
সেই জনকল্যাণমূলক অবদানের স্বীকৃতিতে ১৯৪৫ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এর সাথেই হাওয়ার্ড ওয়াল্টার ফ্লোরে ও স‍্যর আর্নস্ট চেনকে নোবেল সম্মানে ভূষিত করা হয়।
২৪ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৮ তারিখে ওয়াল্টার ফ্লোরে জন্মেছিলেন।
চিকিৎসাশাস্ত্রটি ধারাবাহিক ভাবে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও যুক্তিবিজ্ঞান ও ধৈর্যশীল পরীক্ষা নিরীক্ষার আধারে গড়ে উঠেছে। অণুবীক্ষণ বা মাইক্রোস্কোপ তৈরিতে বিজ্ঞানী গ‍্যালিলিওর অবদান ছিল। আমাদের মনে রাখতে হবে, রবার্ট হুক ( ২৮.০৭.১৬৩৫ – ০৩.০৩.১৭০৩) অণুবীক্ষণ তৈরি করে বিভিন্ন ধরণের মাছি ও পতঙ্গের শরীর লক্ষ্য করেন।  ১৬৬৫ সালে “মাইক্রোগ্রাফিয়া” নামে একটি বই লিখে সেই কাজের বিশদ বিবরণ পেশ করেন। কোশ বলতে “সেল” শব্দটি রবার্ট হুকের অবদান।
ডাচ বিজ্ঞানী আন্তন ভ‍্যান লিউয়েন হক ( ২৪.১০. ১৬৩২ – ২৬.০৮.১৭২৩) অণুবীক্ষণকে আরো উন্নতমানের একটি সরঞ্জাম হিসেবে গড়ে তোলেন। ১৬৮৩ খ্রীস্টাব্দে তিনি ব‍্যাকটিরিয়ার ধারণা দেন। মাইক্রো বায়োলজি বা অণুজীববিদ‍্যা বিষয়টি তিনি বিকশিত করেন।
শরীরের ভিতর রক্ত চলাচল করার পদ্ধতি ও হৃৎপিণ্ডের ভূমিকা বৈজ্ঞানিক মনন নিয়ে লক্ষ্য করেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী উইলিয়াম হার্ভে ( ০১.০৫. ১৫৭৮ – ০৩.০৬.১৬৫৭) । ১৬২৮ সালে “একসারসিটাটিও দে মতু করডিস এট স‍্যাংগুইনিস ইন অ্যানিম‍্যালিবাস” নামে বই লিখে তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণলব্ধ চিন্তাভাবনা  প্রকাশ করেন। অস্ট্রিয়ার বিজ্ঞানসাধক কার্ল ল‍্যাণ্ডস্টেইনার ( ১৪.০৬. ১৮৬৮ – ২৬.০৬.১৯৪৩) ১৯০০ সাল নাগাদ রক্তের প্রধান ও প্রাথমিক গ্রুপগুলি আবিষ্কার করেন। তাঁর গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হয় যে রক্ত সঞ্চালন করার পূর্বে রোগীর রক্তের গ্রুপ নির্দিষ্ট ভাবে জেনে ঠিক সেই গ্রুপের রক্ত দিলে জীবনহানির সম্ভাবনা কমানো যায়। তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী ১৯০৭ সালে নিউইয়র্কে মাউন্ট সিনাই হাসপাতালে রুবেন ওটেনবার্গ রোগীর শরীরে রক্ত সঞ্চালন করেন।  বিশ্ব ইতিহাসে সেই প্রথম সফলতার সঙ্গে রক্ত সঞ্চালন।
১৯৩৭ সালে তিনি আলেকজান্ডার এস উইনার এর সাথে মিলে রীসাস ফ‍্যাকটর আবিষ্কার করেন।
কার্ল ল‍্যাণ্ডস্টেইনার আবার পোলিও মায়েলাইটিস রোগের ভাইরাস আবিষ্কার করেন। এই কাজে তাঁর সাথে ছিলেন কনস্ট‍্যানটিন লেভাডিটি ( ০১.০৮.১৮৭৪ – ০৫.০৯. ১৯৫৩) এবং আরউইন পপার ( ০৯.১২.১৮৭৯ – ২৮.০৯.১৯৫৫)।
লেভাডিটি আবার সিফিলিস নামে সাংঘাতিক রোগের জীবাণুর আবিষ্কার করেন।
সিস্টার ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ( ১২.০৫. ১৮২০ – ১৩.০৮. ১৯১০) ছিলেন সেবিকা অর্থাৎ নার্স। কিন্তু ওই পরিচয়ে নাইটিঙ্গেল সীমাবদ্ধ নন। অভিজাত এই মহিলা ছিলেন গণিতবিদ। রাশিবিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর প্রগাঢ় অধিকার ছিল। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে আহত সৈনিকদের তিনি সেবা শুশ্রূষা করতেন। কিন্তু তাতেই তাঁর উৎসাহ সীমিত ছিল না। তিনি  রাশিবিজ্ঞান সম্মত পথে  দেখিয়ে দিয়েছেন অস্ত্রের আঘাতে যত সৈন‍্য মরে, কাটা ঘায়ে সংক্রমণ হয়ে তার অনেক বেশি সংখ্যক সৈন‍্যের প্রাণহানি হয়। তৎপরতার সঙ্গে উপযুক্ত সেবা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও ড্রেসিং নিশ্চিত করলে এই অকারণ প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব। তিনি গাণিতিক তথ‍্য দিয়ে নার্সিং বিষয়টিকে একটি বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দিলেন। তাঁর জন্মদিন বারোই মে আজ সারা পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক সেবিকা দিবস বলে শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করা হয়।
ভারতে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী কালাজ্বরের ওষুধ ইউরিয়া স্টিবামাইন আবিষ্কার করেন। বিজ্ঞান সাধকদের কঠিন অধ‍্যবসায়ে যুক্তিসিদ্ধ পথে বারংবার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তবেই চিকিৎসা বিজ্ঞান এগিয়েছে। কোনো দেব দেবীর দয়ায়  বা অতীন্দ্রিয় প্রক্রিয়ায় এ কাজ হয় নি। আজও মানুষের রোগব্যাধির উপশম ঘটাতে গেলে বিজ্ঞানসম্মত পথেই এগোতে হবে। করোনার প্রতিরোধ করতে বিজ্ঞানকে আশ্রয় করেই এগোতে হল। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রতিষেধক বের হল, স্বাস্থ্য বিধিসম্মত পথে ধৈর্য ধারণ করতে করতে তবে হল। হতাশায় ভুগলে হবে না। কুসংস্কারের পায়ে মাথা কুটলেও হবে না। বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ,  পরীক্ষা নিরীক্ষা ও যুক্তিবিচারের প্রতিষ্ঠিত পথেই সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে।