আলোধুলোর দিন – ২

আমাদের দেশের বাড়ির পুকুর পাড়ে বিশাল একটা শিমুল গাছ ছিল, তার বীজ ফেটে ধবধবে সাদা হালকা তুলোর বলগুলো রেশমের মত হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে বেড়াতে শুরু করলেই বুঝতাম চৈত্রমাস এসে গেছে। আমাদের উঠোনের ওপর একটা জাল লাগানো আছে, সেই জালে তুলোর আঁশ জড়িয়ে সাদা চাঁদোয়ার মত একটা আস্তরণ হয়ে যেত উঠোনের মাথায়। বাবা লাফিয়ে মুঠোয় ধরত শিমূল তুলো, বাবাকে নকল করে অনেক লাফিয়েও আমি কিন্তু পারতাম না। অনেক না পাওয়ার মত কিছুতেই ধরা দেব না ভংগিতে টুক করে ওরা ভেসে যেত হাওয়ায়। আর ওইসময় থেকেই. সকাল ,দুপুর রাত যখন তখন গুড়গুড় করে বেজে উঠত ঢাক ।
গ্রামে , মফস্বলে এই সময়গুলো দুরন্ত । দিনে প্রবল তাপ, ভোরে ঠান্ডা হাওয়া, আমের মুকুল ঝরে গিয়ে গাছভর্তি কচি আম, বেল ফুল, গন্ধরাজ ফুটতে শুরু করেছে., চাঁপাতে কুঁড়ি এল……সব মিলিয়ে বসন্ত এসে গেছে এমন কথা তো তখন বুঝতাম না,তবে সময়টা ভালই, বেশ অন্যরকম লাগত।
চৈত্রের দুপুরে স্কুল ছুটির দিনে লম্বা একটা পাটকাঠি হাতে আম আর তেঁতুলের ছায়ায় ঢাকা পুকুরের ঘাটে বসে থাকা ছিল আমার প্রিয় অবসর। মাঝে মাঝে খোলামকুচি ছুঁড়ে ব্যাঙবাজি খেলা প্র‍্যাকটিশের ফাঁকে দেখেছি পুকুরের অন্যপাড় দিয়ে দেউলে বাঁশ নিয়ে সন্ন্যাসীরা চলে যাচ্ছে ‘ গৃহস্থের পরমঙ্গল হোক ‘ বলার ব্রত নিয়ে,, সময়টা কেমন স্থির হয়ে আছে জীবনে। আমার এই প্যাঁকাটি প্রীতি, শুদ্ধভাষায় যাকে পাটকাঠি বলে, জমি থেকে পাট ওঠার পর যা ডাঁই করা থাকত খামারে, আর দীপাবলির রাতে সেগুলো গোছা করে জ্বালিয়ে আমরা ‘ ধা রে মশা ধা, লাল বনকে ( নাকি নীল বন) যা’ করে কীসব যেন রীতি পালন করতাম, সে নিয়ে অনেক গল্প আছে। আমার বড়মামা প্রচার করেছিল যে ওই কাঠি চিবোতে চিবোতে পুকুরপাড়ে তেঁতুলগাছের ছায়ায় ঘুরে ঘুরে আমি নাকি একা একা কথা বলি, আজগুবি গল্প বানাই । সে নিয়ে হাসাহাসিও হত। তবে স্তূপ করা প্যাঁকাটির গাদায় সাপ থাকতে পারে, এই ভয় দেখিয়েও আমাকে দমানো যায় নি, মনে আছে।
এসব সময়ে আর একটা অনুষ্ঠান হত, এখনও হয়, তা নিয়েও ব্যাপক হইচই হত আমাদের।
শুনতে অদ্ভূত সেই অনুষ্ঠানের নাম গিন্নী ফলার। একান্তই মেয়েদের অনুষ্ঠান সেটি। মেদিনীপুরের আর কোনো অঞ্চলে এটি হয় কিনা তাও জানা নেই আমার।
তো ওইদিন সকালে ঘটি ভরে জলের মধ্যে কচি আম, কাঁচা হলুদ, কড়ি ইত্যাদি দিয়ে মন্দিরের দালানে ঢেলে আসবে সবাই যে যার মত করে । বাড়ির বড় যিনি সারাদিন নিরামিষ খাবার ফল জল খেয়ে থাকবেন, বিকেলে মন্দিরের মাঠে গোটা দেশের সমস্ত মহিলাকুল, একদম জাতি ধর্ম নির্বিশেষে , জড়ো হয়ে একসংগে দুধ দই চিঁড়ে মুড়ি কলা মিষ্টির ফলার খাবেন সবাই মিলে ভাগাভাগি করে। আর সেদিনের সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, যেটা আমার সবচেয়ে ভালো লাগত, মায়েদের এই খাওয়া খাওয়াবেন মন্দিরের পূজারীরা । সেদিনের সব খরচ, সব আয়োজন তাঁদের। আমাদের কাছে এই দিনটাও উৎসবের ছিল। শেষ বিকেলে নাটমন্দির থেকে সংলগ্ন মাঠ ভর্তি সারা গ্রামের মা কাকিমা জ্যেঠিমারা। অনুষ্ঠান মা ঠাকুমাদের, কিন্তু ছোটরা তো থাকবেই। আমরা এর জামবাটিতে ওর কৌটোয় উঁকি দিয়ে একে পাশ কাটিয়ে তাকে ডিঙ্গিয়ে দেখতাম কে কী এনেছে । এসবের মধ্যে কোন অসভ্যতা ছিল না তখন ,বাচ্চারা তো এরকমই করবে এইভাবে সবাই সবার ভাগ পেতাম । মন্দির থেকে যা খাওয়ানো হত, সেই চিঁড়ে নারকেলের মিষ্টি ফলারের বাইরেও সব মায়েরাই নোনতা কিছু না কিছু করে আনত । নারকেল নাড়ু, মুড়ির মোয়া, ছোলা মটর সেদ্ধ, এঁচোড়ের চপ মোচার চপ। খাবার আগে প্রসাদ আর শান্তিজল দেওয়ার সময়টুকু ছাড়া আমাদের বাড়ি ঘেঁসে নাটমন্দির আর মাঠ গমগম করত পারস্পরিক খবরের আদান প্রদানে । শ্রেণি ভেদ একেবারে ছিল না তা নয়। একটু সম্ভ্রম একটু দূরত্ব থাকত হয়তো , সেই অনুযায়ী মন্দিরের দালান থেকে ধাপে ধাপে সিঁড়ি বেয়ে নাটমন্দির হয়ে মাঠ, আলোচনার বিষয়ও আলাদা হত। কার ছেলের চাকরি হল, কার মেয়ে এবার দারুণ রেজাল্ট করেছে থেকে অমুকের নাতি হয়েছে, তমুকের বিয়ে। একদিকে শুদ্ধ ভাষায় বলা হত কামাখ্যা ঘট উঠবে কাল ভোরে , সেই ঘটই কেমলে ঘট হয়ে নামে অন্যজনের গলায় , হিঁদোলা দেখতে কারা কোনদিন যাবে একসংগে, সব ওখানেই ঠিক হয়ে যেত, সব মিলিয়ে সরগরম মহিলামহল।
কিন্তু একই ফলার মাখা সবাই একসংগে, একই ঘটের শান্তিজল একসংগে মাথা নিচু করে নিত সবাই। গয়লা বউ সেদিন নির্দ্বিধায় এক ক্যান দই এনে বলত , আজ আর দুধ বেচি নি দিদিমনি , ছেলে পুলেদের জন্যে বেশি করে দই বসিয়েছিলুম গো , একবাটি রাখো দিনি ।’ বদলে মিষ্টি মোয়া যেত তার পাত্রে।
ঢাকীর কাজ ছিল মাঝে মাঝে ঢাকে কাঠি দিয়ে সে যে আছে জানান দেওয়া । যাতে যাঁরা তখনও দেয় নি তার কাঁসি বাজিয়ে সংগত করা ছেলের অন্য হাতে ধরা বস্তায় মুড়ির বাটি কি টাকা , তারা দিয়ে আসে । ভরা বস্তার মত তার মুখেও তৃপ্তির হাসি চওড়া হত দিনের শেষে।
তারপর সন্ধ্যে হলে একে একে সব মায়েরা বাড়ি ফিরবে, ঠাকুরঘরে আগে থেকেই আলো জ্বলা থাকবে, সেখানে এসে প্রণাম। ছোটবেলায় এইসময় একটা ছড়া শুনেছি, ঠাকুমা সেটা শিখিয়েছিল আমাদের। ” শোন, আমি এসে বলব ঘরে কেন জ্বলে আলো? অমনি তোরা বলবি, ঠাকুমা গেছে গিন্নী ফলারে, বাড়িতে সব ভালো।’
আমরাও মুখস্ত বলে দিতাম। তবে মায়ের আমল থেকে সেসব বন্ধ। যদিও বালিগঞ্জের মেয়ে একান্ত অল্পবয়সে মাতৃহীন আমার মা গ্রামে বিয়ে হয়ে এসে খুব দ্রুত গ্রহণ করে নিয়েছিল এখানের সমস্ত কালচার, কিন্তু ওসব ছড়া টড়ায় থাকত না। শুধু আলোটা জ্বালিয়ে রাখত সারারাত ঠাকুরঘরে।
এই অনুষ্ঠানের কথা ভুলেই গেছলাম, বেশ কিছুদিন পরে মাকে দেখতে এসে দেখলাম আজই সেই অনুষ্ঠান এখানে। বহুদিন পরে আবার দেখলাম কচি আম, কাঁচা হলুদ, কড়ি আর একটা কয়েনে ভরে গেছে আমাদের বাড়ির লাগোয়া মন্দিরের চাতাল। মায়েদের ফলারের জন্যে নারকেল কোরা চলছে। দিনটা শুধু মেয়েদের উৎসর্গ করা, ভাবলেই আনন্দ হয়।
একাশি বছরের দীর্ঘ লম্বা ছিপছিপে শরীর, আমাদের আজন্মকাল থেকে দেখে আসা পুজারী, আমরা কাকা বলি যাঁকে,আয়োজনের ফাঁকে গল্প করছিলেন ,’ সারা বছর মায়েরাই তো দেখে আমাদের ,পরম্পরা মেনে আজকে তাঁদের একটু যত্ন আত্তি করে বড় আনন্দ পাই । এখন দেখো সবাই আসে নিয়মরক্ষের মত করে, পাশের বাড়ির লোক জানে না পাশের জনের সুখ দুঃখ, পরস্পরের খোঁজ রাখে না, খাবার ভাগ করে খায় না, শুধু বিদ্বেষ। তবু একটা দিনের জন্যেও যদি ……।’
নাটমন্দিরের গায়ে তাঁর সাইকেলটি ঠেস দেওয়া। ‘চোখে ভালো দেখ না যে,কোন সাহসে সাইকেল চালাও কাকা এখনও?’
‘ যিনি দেখবার তিনিই দেখবেন। ‘ এই বাক্যটি কাকা দ্বিতীয়বার ফের বলেন মাকে প্রসাদ দিতে এসে। বাবা নেই, একসময়ের গমগমে বাড়ি এখন ফাঁকা। ছেলের শরীর ভালো নেই, মেয়ের কঠিন অসুখ, মা বিষণ্ণ হয়ে বসে কীসব ভাবে দিনরাত। মায়েরই বয়সী পুরোহিত, ত্রিশ বছরে যার স্ত্রী মারা যাবার পর একাই তিনটি বাচ্চাকে মানুষ করে বড় করেছে, এত দারিদ্র‍্যের মধ্যে সব সামলাতে সামলাতে জীবনের যে মোক্ষম আপ্তবাক্যটি আঁকড়ে, সেটিই শুনিয়ে দেয় , ‘ অত ভাববেন নি বউদি, আমাদের হাতে কিই বা আছে! যিনি দেখবার, তিনিই….।’
তিনি কিনি সে উত্তর আমার মত কাকাও জানে না, নির্ভরও করে না, আমি নিশ্চিত। কিন্তু তাঁর মুখে বিশ্বাস আছে, যেটা আমি পাই না।
তা আমি তো চিরকালের নাস্তিক, আমার বাবার বাড়ির লোকজন বলে এসেছে বরাবর । বলে তুই তো তোর বাবার মত, কিছু মানিস না। অনেক অন্ধ বিশ্বাস মানা না মানা নিয়ে এযাবত প্রচুর তর্ক বিতর্ক, মতান্তর হয়েছে আমাদের, কিন্তু সমস্ত রকম সুন্দরে আমার আকুল আসক্তি। যে কোন উপলক্ষে লোকজন খাওয়াতে ভালবাসত বাবা মা, বিশেষ করে কাঙালী ভোজন, সেটি বিশেষ অনুসরণযোগ্য মনে করি। সেসময় এখনকার মত নিমন্ত্রন করে আসতে হত না ওদের, বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান শুনলেই দু চারটে গ্রাম থেকে ঝেঁটিয়ে আসত লোকজন। নিমন্ত্রিতদের দেখার জন্যে তো আছে সবাই, বাবা ওসব বিশিষ্ট কোন দিকে না তাকিয়ে নিজে হাতে পরিবেশন করে খাওয়াবেই ওদের। বিপদে আপদে নিজের পকেট শূন্য করে দাঁড়াত পাশে। গাছপালাকেই ভাবত ঈশ্বর, সারাবছর গাছের যত্নে। এর চেয়ে বড় ধর্ম আমার কাছে অন্তত নেই আর ।
তবে তারপরও থাকে কিছু। যেমন ধবধবে আতপচাল বাটার আলপনা দিয়ে বাড়ি সাজাতে ভালো লাগে আমার, যে কোন ছুতোয়। ধুনোর গন্ধ মাখা ধোঁয়ার মধ্যে ফিরে আসে আমাদের অমলিন ছোটবেলা। আর এই যে সব বহুকাল ধরে চলে আসা অনুষ্ঠান, যার মধ্যে শুধুই মানুষে মানুষে একটা বাঁধনের আয়োজন, সেগুলি তো সাধ্য থাকলে, যে কোন মূল্যে বাঁচিয়ে রাখতে চাইব আমি।
বাবার চলে যাওয়ার পর এই বড় একটা বাগান ঘেরা বাড়িতে মা একাই থাকে। বসন্তের শুরু থেকে নিম বকুল আম জাম লিচু পেয়ারার পাতা ঝরা চলছে অবিরাম। আমাদের উঠোন, চাতাল, মাঠ সব ভর্তি ঝরা পাতায়। জোরে হাওয়া দিলে আম পড়ে বিছিয়ে যাচ্ছে গাছের তলায়। এবছর খুব আম হয়েছে, এখানে বাবার অনেক গাছ, আমার ঘাটালের বাড়ির ছোট্ট বাগানও আম কাঁঠালে ভরে গেছে। বাবার শুনশান বাগানের তারের বেড়া ডিঙিয়ে দিনরাত বাচ্চারা ঢুকে ঘুরঘুর করছে আমের আশায়। আজ আমি অনেকদিন পরে হাওয়ায় পড়া আম কুড়োতে কুড়োতে দেখছি দূরে ওরা অপেক্ষা করছে। আমি বাড়িতে ঢুকলেই ওরা বেড়া ডিঙিয়ে লাফ দেবে। হাসি চেপে আমি ইচ্ছে করে এদিক ওদিক পড়ে থাকা আম ফেলে রাখি। তোরাই তো খাবি বাবা এরপর বাকি সব আম, আজ কটা নাহয় নিলাম আমি। বারান্দায় পরিত্যক্ত কোচটার দিকে তাকাই, বাবা ওখানে বসে থাকত নিজের লাগানো গাছপালার মধ্যে। এই গরমে ভোরে উঠে নিজের হাতে ধুইয়ে দিত সব গাছের পাতা। বাবা কী সত্যিই নেই কোথাও? তার প্রাণপ্রিয় গাছপালার ভেতরেও?
এত বড় বাগানের ঝরাপাতার স্তূপ ঝাঁট দিয়ে জড়ো করে বস্তায় ভরতে ভরতে কুমোর পাড়ার বউটি বলছিল,’ কাল কেমলে ঘট উঠে যাবে দিদি, এবছর একদিন মনুই দোব ভেবেছি, তো কি হয় দেখি! বছর শেষ হয়ে এল, ঘরদোর পরিষ্কার, বাবার থানে যাওয়া, কত কাজ! ‘
‘ বছর শেষ হয়ে এল’ , কথাটা ধক করে লাগে বুকে। ১৪২৭ এল নিঃশব্দে, যাবেও তাই হয়তো । করোনা এসে আমাদের জীবন যাপনের স্বাভাবিকত্ব নষ্ট করে দিয়েছে। কত দ্রুত যেন পড়ে আসছে বেলা।
মনে হল তার আগে এবারের পর্বটা নাহয় বছরের বাকি কটা দিনকে উৎসর্গ করি। আর বছরের শেষ কদিন মানেই দিনে রাতে বেজে ওঠা ঢাক আর চড়কের প্রস্তুতি। সেই ছোটবেলায় যেমন ছিল আমাদের, আজও তেমনি আছে। মাঝে অনেক মানুষের ফুরিয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া শুধু।
চলতি কথায় এরা যাকে বলে কেমলে ঘট, আসলে তা কামাখ্যা মায়ের ঘট, যা এবছরের বর্ষশেষের চড়ক সংক্রান্তি উদযাপনের তুমুল প্রস্তুতি। এদিন রাত্রি থেকেই আতপচাল, দুধ, গুড়ের পরমান্ন প্রস্তুত হয় রাত্রে, একেই বলে মনুই ভোগ। কলাপাতায় সামান্য ভোগ নিবেদন করে বাকি সবটুকু যায় ঢাকীর ঘরে।
গাজনের একটা ব্যাপার যা আদিকাল থেকে চলে আসছে, যেটি আমার খুব পছন্দের, এই কদিন শিবের উপাসনার অধিকার ব্রাহ্মণদের থাকে না। এই উৎসব একান্তই তাদের, একসময় যাদের তথাকথিত অন্তজ বলা হত। সমাজ সম্ভবত এইভাবে মানুষে মানুষে চমৎকার একটা ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করে গেছে।
এসময় মর্যাদায় যিনি পাটভক্ত হবেন, বংশানুক্রমে তাঁদের পরিবারই এই সম্মানের অধিকারী হয়। তবে তার আগে পাটভক্তের হাতে বীরবৌলি বাঁধা হবে। পুরোহিত শিবকে ওই বীরবৌলি পরিয়ে তবে নতুন ভক্তদের পরাবেন এক এক করে। পাটভক্ত, দেউলেভক্ত, কোটালভক্ত, দণ্ডধারী…..। এক এক নামধারী সব ভক্তের গোত্র তখন শিবের গোত্র হয়ে যায়। এই কদিন সে সংসারের বাইরে, অশৌচ পর্যন্ত লাগে না তার। সারাদিন এই ব্রত ধারী সন্ন্যাসীরা জলস্পর্শ করবেন না, একদম রাত্রে একবার মাত্র হবিষ্যি এই কদিন। চৈত্রের এই প্রখর রোদে দেউলেভক্ত ফুল আর মালায় সাজানো দেউলেবাঁশ নিয়ে বাড়ি বাড়ি ছুঁইয়ে বেড়াবে ‘ গৃহস্থের পরমংগল হোক ‘। তখন চৈত্রের দুপুরের গরম ঝোড়ো হাওয়ায় আমাদের বাগানের গাছপালা থেকে ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে পাতা, লু লাগা রোদে চোখে ধাঁধাঁ লেগে যায় , গলার উত্তিয়ের ভেতর কুশ জড়ানো, সারাদিনের উপবাসে ক্লান্ত পবিত্র মুখ সন্ন্যাসীরা দেউলেবাঁশ তুলে নেবার আগে সমস্বরে বলে যায়, ‘কামেশ্বরের চরণের সেবা লাগে’…..ঢাকের শব্দ দূরে চলে যাবার পরও নাস্তিক আমি কেমন একটা শিহরণ নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকি। বিশ্বাস বিশ্বাস! হায়, এই বিশ্বাসটা যদি থাকত আমার, আফসোস হয়।
চার বছর আগে, বাবা যখন আলঝাইমার্স এর কঠিন পর্যায়ে,আমি প্রায়ই দেখতে যাই দুপুরের এই সময়ে। দেউলেবাঁশ নিয়ে ভক্তরা বাড়ি বাড়ি ঘুরছে তখন। আমাদের বারান্দায় দেউলে ঠেকিয়ে সন্ন্যাসীরা নির্ধারিত বাক্যটির সংগে জুড়ে দিত , ‘মাস্টারমশাইয়ের পরমঙ্গল হোক। ‘
জল আসত চোখে, বাবার পাশে বসে বলতাম, ‘ওরা তোমাকে মনে রেখেছে বাবা। মনে পড়ছে সেই কলকে আকন্দর মালা, কপালে চন্দনের ছোপ? ‘
বাবা তখন কাউকেই চেনে না, আমাকেও না। কথা বলতে ভুলে গেছে, মাঝে মাঝে শব্দ হাতড়ায় কিছু বলতে চেয়ে। আলঝাইমার্স রুগীদের ভেতরে চেতনা শেষ অবধি জেগে থাকে শুনেছি, জানার উপায় নেই। তবে আমার চোখে জল দেখলে বাবার চোখও ভাসতে দেখেছি। যারা তাদের প্রিয়জনকে দেখে এইভাবে, তারাই জানে এর যন্ত্রণা কি!
ছোটবেলায় স্কুলে যাতায়তের পথে দেখতাম , ছোপানো রঙিন ধুতি আর গলায় মালা পরা নবীন সন্ন্যাসীরা গাজনের বাঁশ শুইয়ে রেখেছে রাস্তার ওপর । শিবের ভক্ত থাকার দিনে সবার সাহায্য নিয়ে দিনান্তে একবার হবিষ্যি আর ফলমূল । অনেক পরে যখন নিজে স্কুলে পড়াচ্ছি , ফেরার পথে ঠিক একইভাবে সন্ন্যাসী ভক্তদের দেখে চমক লেগেছিল ! কিছু কিছু জিনিস একইরকম থেকে গেলে এত আনন্দ হয় বুঝি !
চড়ক সংক্রান্তি ঘিরে এই উৎসব ,এই ভক্তরা , জলন্ত অগ্নিকুন্ডের ওপর কি নির্ভয়ে সন্ন্যাসীদের দোল খাওয়া , দীর্ঘ চড়ক কাঠের অনেক উঁচুতে পিঠে আঁকশি বাঁধা পাটভক্তের শূন্যে নির্বিকার পাক খাওয়া . নিচে উৎসুক মানুষের জয়ধ্বনি আর গাজনের সঙ ! এসবের মধ্যে ধর্মের চেয়েও, আমার মনে হয় . অনেক কবেশি করে আছে আনন্দ। মেলায় যারা বিক্রিবাটায় আসে , কেনাকাটায় যারা ,বাবা মার হাত ধরে ছেলে মেয়ে , দল বেঁধে বন্ধুরা , যে অন্য কাজে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ায় , যে চলে যায় পাশ দিয়ে ,সবার , সবার মুখেই প্রসন্ন একটা হাসি লেগে থাকে । সমস্ত ধর্মের সব অনুষ্ঠান গুলোর এটাই সবচেয়ে সুন্দর দিক , এই প্র্সন্নতা !
ধর্ম কি না জেনেও দিব্যি চলে যায় মানুষের , কিন্তু এইসব মিলনমেলা ঘিরে পাওয়া আনন্দকে বাদ দিতে বোধহয় কোন ধর্মের ছোটরাই রাজি হবে না ! তারা অপেক্ষা করে , যেমন করতাম আমরা !
নীলষষ্ঠীর দুদিন আগে থেকে সব বাড়িতে বাড়িতে উৎসবের আমেজ। আগের রাতে এদিন ভক্তদের শেষ ভোগ, গুড়ান ভোগ নাম তার। সারা গ্রামের মানুষের দানে হবে সেই হবিষ্যি আর পায়েস ভোগ। সন্ন্যাসীরা শুধু কণিকামাত্র ছোঁয়াবে মুখে, বাকি যাবে ঢাকীর বাড়ি।
নীলষষ্ঠীর দিন থেকে তিনদিন স্কুলে ছুটি পড়ে যেত। সারাদিন শিব পার্বতী সেজে বহুরূপীরা ঘুরে বেড়াত। টাকা পয়সা চাল ডাল তাদের ঝোলায় দিতে গিয়ে সাদা ছাইয়ের মত পাউডার মাখা মুখ আর গলায় সত্যিকার সাপ জড়ানো বহুরূপী দেখে বাপরে বলে পালিয়ে এসেছিলাম একবার । নিশ্চয়ই নির্বীষ ছিল সেই সাপ, কারণ ভিড়ে থইথই চত্বরে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াত তারা। ৷ ৷ এইদিনই দুপুরে শিবের আইবুড়ো ভাত দেওয়া হয়। আতপচালের ভাত, টকের ডাল, এঁচোড়, ক্ষীরভোগ, মিষ্টি আর পান।
প্রতিবছর আইবুড়োভাত খায় শিব ঠাকুর, প্রতিবছর বিয়ে হয়, বেশ মজা তো! বলে নিজেদের ভেতর হাসাহাসি করতাম খুব গুরুজনদের কান বাঁচিয়ে৷
নীল ষষ্ঠীর রাত্রে হিঁদোলা দেখতে যাওয়া হত , কারণ সেদিনই সবচেয়ে জাঁকজমকের ব্যাপার ছিল। দুপুরে পড়াশুনা করে নিতে হত, কারণ সন্ধ্যেটা জমজমাট কাটবে। আমাদের বাড়ির রাস্তাটা যে বাড়িতে গিয়ে শেষ হয়েছিল, সেই একদা জমিদারবাড়ির বাসিন্দারা, যারা বাবার কাকা হবার সুবাদে, তরুণ বয়স থেকেই আমাদের দাদু আর তাদের তরুণী স্ত্রীরা দিদি, সেইসব মায়ের বন্ধু মেজদি সেজদিরা, আর তাদের ছেলেমেয়েরা মিলে বিশাল এক দলবল নিয়ে বিশ্ব জয়ের ভঙ্গিতে আমাদের হিঁদোলা দেখতে যাওয়া। পাশাপাশি গ্রাম ভেঙে লোক আসত। উৎসর্গ করা উত্তরীয় জড়িয়ে দেওয়া হত পাটভক্তের মাথায়। হাতের বেতটাকে চড়ককাঠে ঠেকিয়ে চড়ককাঠ আলিঙ্গন করত পাঠভক্ত, বিড়বিড় করে বলত, ‘ শিবে শিবে শিবায়ন, ভূমি নদী পাহাড় সকল জীবকে প্রণাম জানিয়ে…। ‘
এসবের মানে কি সে জানে না, আমি জানতে চাইলে একবার বলেছিল এক পাটভক্ত। বলেছিল বংশ পরম্পরায় বলে আসছে এটুকুই জানে।
প্রণাম শেষে দুজন সন্ন্যাসী তাকে তুলে ধরত শূন্যে, চড়ককাঠে ঝোলানো দড়ির ফাঁসে পা বেঁধে মাথা নিচে আগুনের কুন্ডের ওপর ঝুলিয়ে দুলিয়ে দিত ( দেয়) প্রথমে আস্তে, তারপর জোরে জোরে । রুদ্ধশ্বাসে দেখতাম চড়বড় করে ধুনো পড়ছে আগুনে চতুর্দিক থেকে, লকলক করে লাফিয়ে উঠছে আগুন। চোখ বন্ধ করে হাত দুটি বুকের কাছে জড়ো করা পাটভক্ত নেমে আসছে আগুন ছুঁয়ে, উঠে যাচ্ছে শূন্যে। চুল পুড়ছে না, মুখ পুড়ছে না। অগ্নিকুন্ডের চারদিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে অন্য সন্ন্যাসীরা ‘ বাবা শম্ভূনাথের চরণের সেবা লাগে ‘ করছে। মেয়ে সন্ন্যাসীরাও থাকে অনেক একইসংগে। ঢাকের বোল এইসময় ভিন্ন রকমের সংগত করে। গায়ে কাঁটা দিত। আগুনদোলা শেষ করে পাটভক্ত মাটিতে না নামা অবধি নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে যেতাম। দন্ডধারী ভক্ত তখন দুহাতে গরম ধুনুচি নিয়ে মন্দির প্রদক্ষিণ করে চলেছে। কী বিশ্বাসে, কী প্রাপ্তির আনন্দে এই মারাত্মক কৃচ্ছসাধন ওরা স্বেচ্ছায় করে যাচ্ছে যুগ যুগ ধরে, ভেবে পাই না। বিশেষ করে এদিন ভক্তদের ওপর যেন অমানুষিক শক্তি ভর করে।
হিঁদোলা শেষ হলেও মন্দিরের ভিড় কমে না। মেলপুজোর পর গ্রহাচার্য বর্ষফল পড়বেন। ‘ ক আড়া জল এবছর, শস্য কেমন হবে, বন্যা না খরা… প্রাচীনকাল থেকে শিবচতুর্দশী র দিন এই নিয়ম চলে আসছে। মিলল কি না মিলল, সারাবছর তা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই, মনেই থাকে না কারো, কিন্তু আজকের দিনটা আলাদা। এরপর পুবমুখো করে ছাড়া হবে মাগুর মাছ, ছাড়া পেয়ে সে প্রথম যেদিকে মুখ ঘোরাবে, সেদিক নাকি শুভ।
এসব নিয়েও কারো বিশ্বাস অবিশ্বাস সেরকম দেখিনি, তবে সমস্ত প্রথা বেশ কৌতুহল নিয়ে দেখে অনেকেই। আমাদের অবশ্য এসব দেখার আগ্রহ বা অনুমতি কিছুই ছিল না, ফলে সবই শোনা কথা।
এরপর ফুল মালা চন্দন নিয়ে পুকুরে গিয়ে চড়ক কাঠকে আমন্ত্রণ। পরের দিন সারাবছর অতল জলে ডুবে থাকা ওই বিশেষ কাঠ নাকি সন্ন্যাসীদের আমন্ত্রণে ভেসে আসত, আসে পাড়ের দিকে!
ওদের কাজ শেষ হয় ভোর রাতে আমাদের বাড়ির সামনের পুকুরে বাণ ডুবিয়ে যাওয়ার পর। সে ছিল সন্ন্যাসীদের গোপন অভিসারের মত , অন্যদের দেখা নিষেধ । মৃদুস্বরে ঢাক বাজত সেসময় , ঢ্যাং কুড়কুড় ঢ্যাং কুড়কুড় ! রাত জেগে সেই শব্দের আসা যাওয়া শুনতাম আমরা গা ছমছমে অপ্রাকৃত একরকম আনন্দ নিয়ে । কিন্তু সারা গ্রামে কেউ একবার উঁকি দিয়েও দেখত না কি ঘটছে। সেদিন ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে দেখতাম আমাদের শীতলা পুকুরের ( পুকুরের নাম সর্বত্রই থাকে) ঘাটের ওপর থেকে নিচের সিঁড়ি অবধি অজস্র বাবলা কাঁটার ডাল বিছানো। সেদিন পুকুরেই নামত না কেউ। আর দুপুর শেষ না হতেই বাড়ির সামনে ভেঙে পড়া লোকের ভিড় । বাবা আর বাবার কাকারা,আমাদের দাদুরা সব আমাদের হাত ধরে দাঁড়াত। সন্ন্যাসীরা আকন্দ , কলকে আর গোলঞ্চ ফুলের মালা পরিয়ে প্রণাম করত আর কপালে দিত চন্দনের ছোপ । আমার সুদর্শন বাবাকে কি সুন্দর যে দেখাত তখন ! সেই প্রসাদী মালায় প্রায় ঢেকে যেত বাবা , তা থেকে দু চারটি করে পেয়ে আহ্লাদে ডগমগ করতাম আমরা !
এ সবই খুশির, আনন্দের । শুধু গাজনের এই জিভফোঁড়ার অনুষ্ঠানটা বাদ দিলে ! দুপুর শেষ না হতে ভিড় ভেঙে পড়ত আমাদের বাড়ির চাতালে আর রাস্তায়, এখনও হয়। নাচতে নাচতে গাজনের সন্ন্যাসীদের সামনে রেখে আসত যারা, তারা সব একে একে নামবে ঘাটে। আর কামার ওই ডুবিয়ে রাখা বাণ দিয়ে এক একজনের জিভ ফুঁড়ে দেবে , সেই অবস্থায় ঢাকের বাদ্যি সহযোগে নাচতে নাচতে তারা মন্দিরে যায় । সমস্ত অনুষ্ঠানের মধ্যে এটা মূর্তিমান বিষাদ , যা আমি তাকিয়ে দেখি নি কোনদিন । শুধু আমাদের বাড়িতে ফাইফরমাস খাটার জন্যে সুধা,সন্ন্যাসী, রবি বলে যে ছেলেগুলো পরপর থেকেছে, প্রতিবার বাবার তর্জন গর্জন সহ সমস্ত বারণ সত্ত্বেও তারা দুপুর থেকে বেপাত্তা হয়ে যেত। আর বিকেলে তাদের জিভ বিঁধিয়ে রক্তঝরা বাণ নিয়ে ঢাকের সঙ্গে নাচতে বাচতে যেতে দেখা যেত । আমরা অস্থির হতাম তাদের কষ্টে, কিন্তু তারা কোনদিন স্বীকার করে নি এটা কষ্টকর কিছু। বরং অনেক রাত্রে বাড়ি ফিরে প্রচুর বকুনির সঙ্গে মায়ের তৈরি পাতলা দুধ সুজি খেতে খেতে হাসত মিটমিটি । ওটা ছিল তাদের নেশা । আর এটাও ঠিক প্রায় এক মাইল রাস্তা ওই রক্তাক্ত ভাবে যাওয়ার পর শিবের মন্দিরে যে ওদের জিভ থেকে বাণ খুলে দিত, নতুন খরখরে গামছা দিয়ে জিভ চেপে ধরে বান খুলে ফুল বেলপাতার সংগে কী ওষুধ তারা লাগাত, আজও জানি না কেউ, কিন্তু অতখানি কাটা জিভ বেমালুম জুড়ে যেত, পরদিন সব একদম স্বাভাবিক, এ আমার নিজের চোখে দেখা।
চড়ক এলেই এসব মনে পড়ে খুব ! আজ বহু বছর হল রবি বলে ছেলেটি নিরুদ্দেশ । কে জানে , কোথায় কোন মেলায় নেচে বেড়াচ্ছে সে !
বর্ষশেষের শেষ সন্ধ্যে নামত, প্রচন্ড ভিড়ের চাপে হারিয়ে যাবার ভয়ে আমাদের বাবারা আমাদের সব ভাইবোন, বন্ধুদের হাতে হাতে মেলবন্ধন করিয়ে দিত। সেই অবস্থায় আমরা তখনও হাঁ করে ওপরদিকে চেয়ে দেখছি, বিশাল চড়ককাঠে বুকের গামছায় শিকলি আঁটা পাটভক্ত আকাশ জুড়ে পাক খেতে খেতে কী নিরুদ্বিগ্ন ভাবে আর কী আশ্চর্য কৌশলে কোমরের ঝোলা থেকে জিলিপি মোয়া ছুঁড়ে দিচ্ছে নিচের বিশাল জমায়েতের দিকে। আমাদের এক হাত অন্যের হাতে, আর অন্য হাতে মেলার টাটকা তেলের থালার মত পাঁপড় ভাজা। বাবার মতে ছোট ছোট দোকানিরা, যারা এইসময়েই শুধু কেনাবেচা করে, তাদের জিনিস পোড়া তেলে ভাজা নয়, অতএব খাওয়া চলবে। হাতে ধরা সেই গরম জিলিপি পাঁপড় ভাজা আর শূন্যে ঘূর্ণায়মান পাটভক্ত দেখতে দেখতে একটা উৎসবের সাঁকো দিয়েই আমাদের যাত্রা হত পুরোনো বছর পেরিয়ে নতুন দিনের দিকে।