অশ্বমেধের ঘোড়া

মাঝে মাঝে কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনার সম্মুখীন হতে হয় এমনভাবে যখন তুমি এক্কেবারে নিঃস্ব৷ ভুল বললাম বোধহয়, কিছু কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা মানুষকে একেবারে নিঃস্ব করে দেয়৷ আপনি বলতেই পারেন, এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না! আরে মশাই সৌরভ মুখার্জী না চন্দ্র আপনার আত্মীয় তো নয়,! হ্যাঁ হতে পারে কয়েক বছর ঐ নন্দন চত্বরে একসাথে বিভিন্ন অনুষঠানে ছিলেন৷ কিছুদিন একসাথে একটা সংগঠনেও কাজ করলেন, কিন্তু তাতে কি? ঠিকই বলেছেন, আমিও ভাবছি, সেই বুধবার থেকেই ভাবছি! কিন্তু বিশ্বাস করুন সমস্ত লজিক তোলপাড় করেও কিছু বোবা কান্না উঠে এল ভেতর থেকে৷ আচ্ছা বলুন তো প্রবল জলপ্রপাতের সামনে আপনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন ? আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে না ? জীবন যেন একটা অশ্বমেধের ঘোড়া ছেড়ে দিয়েছিল আমাদের মাঝে৷ সকলের মনের রাজ্যে সেই ঘোড়াটা অপরাজিতের মত অপ্রতিরোধ্যের মত ঘুরে বেড়িয়েছেন৷
আমি আপনার থেকে বয়সে ছোট অথচ আমার পেশাকে সম্মান জানিয়ে আমাকে সম্মান জানিয়ে দিদি বলতেন৷ কতবার মনে হয়েছে বলল- দাদা নাম ধরে ডাকতে পারেন তাহলে অন্তত দাদা তুমি বলতে পারব! বলা হয়নি, আর বলা হবে না৷ বিশ্বাস করুন আমার দাদা নেই, ভেবেছিলাম এমন একটা দামাল পরোপকারী ছেলেকে দাদা……. বিশ্বাস করুন ঝাপসা হয়ে আসছে চোখ৷ কী লিখব, কেন লিখব সৌরভদাকে নিয়ে এইসব কথা এত তাড়াতাড়ি? কত নতুন প্রজন্মের কবিদের মনে আপনি স্বপ্ন বুনে দিয়েছেন! আগুন ছড়িয়ে দিয়েছেন! এখন তারা তো অভিভাবকহীন হয়ে পড়ল! সব সময় পাশে থাকার অঙ্গীকার করে এভাবে পালিয়ে যাওটা কি আপনাকে শোভা পায়?
হ্যাঁ জানি এযাবৎ কাল বহু অগ্রজ কবিকে নিয়ে এক একটা আশ্চর্য কবিতা সন্ধ্যা উপহার দিয়েছেন আমাদের৷ কারণ আমি নিজেও যে সাক্ষি তার৷ বহু অনামি কবির দক্ষ কলমের সৃষ্টিকে আলো দেখিয়েছেন পথ দেখিয়েছেন৷ কিন্তু আরও অজস্র অজস্র মানুষকে যে নীরবে সাহায্য করে গেছেন, আমরা সচেতন সভ্য মানুষেরা আপনজন না হলে কোভিড রোগীদের ছায়া পর্যন্ত মাড়াই না, আর আপনি অবলীলায় একের পর এক কোভিড পেশেন্টের চিকৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন! তাহলে বলুন তো এখন এইসব মানুষগুলো কার কাছে যাবে? তারা তো অনাথ হয়ে গেল! এতটা স্বার্থপর আপনি কী করে হলেন? এই স্বার্থপরতা যে কিছুতেই আপনার বায়োডাটার সাথে মেলাতে পারছি না!
১৭ ই এপ্রিল যখন ভর্তি হয়েছিলেন কোভিড আক্রান্ত হয়ে বিশ্বাস করুণ বুঝতে পারেনি আর একটু এগোলে সামনেটা এত কালো ধোঁয়ায় ভরে যাবে৷ বুঝতে পারিনি একটা গভীর খাদ তার উন্মুক্ত হা নিয়ে আমাদের গিলে খাবে৷ কারণ আমরা সকলেই জানি সৌরভ মুখার্জী একটা লড়াইয়ের নাম সংগ্রামের নাম৷ ৫ই মে ভাস্করদার লেখায় যখন সেই দুটো ভয়ঙ্কর লাইন ভেসে উঠল আমার মনে হল কোথাও একটা মহীরুহ মরমর করে ভেঙ্গে পড়ল৷ কয়েক সেকেন্ডের জন্য অত উজ্জ্বল আকাশটা কালো অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল৷ পরে বুঝেছিলাম আকাশটা নয় আমার চেতনা কিছুক্ষণের জন্য অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ছিল, আমি কয়েক সেকেন্ডের জন্য অচৈতন্য হয়েছিলাম৷ কিন্তু আপনি দয়া করে আমাকে বলবেন আপনাকে “দাদা- তুমি” –এটুকুও বলে উঠতে পারলাম না৷ আপনি আমার বন্ধু তাও ঠিক বলা যাবে না৷ হ্যাঁ সহকর্মী বটে, তবে তার জন্য এমন মানসিক যন্ত্রণা পেতে হবে!!!! আর তো জানতেও পারব না সৌরভ চন্দ্র আপনার মধ্যে কোন সে জীবনী শক্তি ছিল, কোন এক্স ফ্যাক্টার ছিল যার জন্য এত মানুষ আকুল হচ্ছে, চোখের জল ফেলছে? হয়ত সারাটা জীবন এই খোঁজ চলবে—–
আপনি আপনার একটা কবিতায় বলেছেন-
” এই গাছ আর আমার বাবা ছাড়া কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করবে না “
আপনি ভুল জানতেন কবি সৌরভ চন্দ্র! আমরা সকলে আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, অধীর অপেক্ষা৷ সমস্ত মানুষের জন্য ভাবতে ভাবতে, তাদের ভালো রাখতে গিয়ে বড় কষ্ট পেলেন৷ শেষের কটা দিন বড় কষ্ট পেলেন৷
বেঁচে থাকতে তো বলতে পারলাম না, আজ একবার বলবই ” দাদা তুমি ভালো থেকো, যেখানেই থাকো, ভালো থেকো, আমাদের অশ্বমেধের ঘোড়া৷ তবে আমি জানি আমাদের সকলের মধ্য তোমার অস্তিত্ব কোনদিনও মুছে যাওয়ার নয়”
সে চলে গেল বলে গেল না
সে কোথায় গেল ফিরে এল না…