অমৃতায়ণ

সবার হাতে কেক দিলো অমৃতা, নিজে কেকটা নিয়ে বসলো বিছানার তলা থেকে ড্রেসিং টেবিলের টুলটা বার করে।
আমাদের হাতের পাশে রাখা আছে চিঠি আর সেই পুরনো ডায়েরিটা। বাইরের পৃথিবীতে এখন নিশ্চয়ই লেইডি আর ফানুসের আলোয় আকাশ মাটি জল – সর্বাংশ দিয়ে কাছে ডেকে নেওয়া হচ্ছে নতুন বছরকে, ঠোঁটের স্পর্শে উদ্দাম ভাবে জরিয়ে ধরছে একটা গোটা ক্যালেন্ডার, পার্ক স্ট্রিটের আলো আর মহাত্মা গান্ধী রোডের অন্ধকার ভ্যপসা গন্ধে এসেও মিশে যাচ্ছে ফ্লুরিসের কেকের উতপ্ত হওয়ার শেষ আঁচ। কিন্তু এখানে –
পারিজাত – তোদের এই জায়গা এতটা নিস্তেজ কেন রে? একটা নতুন বছরের কোনও উন্মাদনা নেই, কিছু নেই, একটা বাজির শব্দ পর্যন্ত নেই।
– চারপাশ শান্ত থাকা মানেই কিন্তু নিস্তেজ নয় পারিজাত, জানবি তুই ভাবছিস শান্ত , হ্যাঁ শুধুই এটা মনে হওয়া , অনেকে এখানে ওখানে ওপারে কথা বলছে , প্রস্তুতি নিচ্ছে কিছু একটা। চিঠিটা হাতে নিলাম , ঘরের মধ্যে নীরবতার ঘন প্রলেপ আরও একমাত্রা বেড়ে গেলো। ঘড়ির কাঁটাটা অমৃতা নিজের হাতে ঘুরিয়ে দিচ্ছে –
ঘুরিয়ে পিছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে – আবার ঘুরছে …. আবার ঘুরছে কাঁটা- আবার ঘুরছে পিছনের দিকে … অমৃতা আবার….
দেখতে একই লাগছে হয়তো- কিন্তু নিউরনের মধ্যে জমে থাকা কোনও স্মৃতির বাক্স থেকে ধুলো উড়তে শুরু করেছে দুজনের – খুলির ভিতর শুধু স্মৃতিধুলোবালি তে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ছবি , কড় কড় করছে মনের রেটিনা… চিঠি খুলতে খুলতে একটা সময় বার হতে শুরু করলো আমাদের তিনজনের সামনে। ওর হাতে চিঠিটা দিয়ে বললাম –
” হাতের লেখাটাও দেখ পাল্টায় নি। কোথায় আছে ঠিক বুঝতে পারলাম না। আসলে অমৃতা যখন চিঠিটা আমাকে দিলো এতটাই চমকে গেছিলাম যে বুঝতে পারছিলাম না প্রথমে কিছুই !”
মুখে একটা করুনার হাসি নিয়ে পারিজাত বললো – ” আবার কি তাহলে পোস্টার ….”
২০১৩ সাল, ২৬শে সেপ্টেম্বর
সকাল থেকে রোদ ঝলমল করা আকাশে মেঘের ভেলা খেলা করছে। সারাদিনে আজ চারটে ক্লাস নিতে হবে। তবুও মেঘের দিকে তাকিয়ে বেশ পুজোর একটা গন্ধ চারিদিকে ভেসে যাচ্ছে । গড়িয়া মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি, পিকনিক গার্ডেন যাবো। কিছুক্ষণ পর বাস আসতেই একটা জানলার ধারে গিয়ে বসলাম, চতুর্থী বলে বাইরে শেষবারের মতো কেনাকাটার ভিড়, – পুজো আসছে আসছে এই সময়টা আমার মনে একটা অদ্ভূত রোমাঞ্চ তৈরি করে। আর কিছুক্ষণ পর পরেই যে আমার জন্য একটা বড় রোমাঞ্চ অপেক্ষা করে আছে তখনও আন্দাজই করতে পারি নি। বাস হাইল্যান্ড পার্ক থেকে এগিয়েছে এমন সময় একটা অজানা নম্বর থেকে ফোন। হাইল্যান্ড পার্ক সপিং মলের একটা বিরাট ভিড় তখন বাসের পেটে…উফ , আস্তে .. একটু সরে দাঁড়ান… ভালো ভাবে ফোনটা শুনতে পাচ্ছিলাম না , দু’একবার হ্যলোওওওও হ্যলোওও করতে একটা চাপা গলায় ভেসে এলো –
– “হ্যলো.. হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছিস – আরে আমি রথীন”
– ও হ্যাঁ … বল.. কি খবর ?
– কোথায় আছিস তুই?…. দশ মিনিটে কলেজের কাছে আসতে পারবি?
– না রে আমি তো পড়াতে যাচ্ছি, এখন বাইপাসে… কথাটা কেটে নিয়ে রথীন ভয়ার্ত গলায় বললো –
– ভাই খুব দরকার, একটু আয় না ।