রেকারিং ডেসিমাল

তিন তলায় ছাদ। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডান দিকে লম্বা রান্নাঘর। বাঁ দিকে দু ধাপ ছোট মোজেকের সিঁড়ির উপরে ঠাকুর ঘর। রান্নাঘরের মুখোমুখি আরেকটা ঘর। তাতে সব সময়ের কাজের মেয়ে গায়ত্রীদি থাকে।
তার পাশে আবার দু ধাপ লম্বা সিঁড়ির পরে চাতাল, এক দিকে জলের মস্ত ট্যাংক। ট্যাংকের গায়ে কল, বাসন ধোয়ার জায়গা। উল্টো দিকের কোনায় একখানা ছোট বাথরুম। কাজের মানুষদের ব্যবহার করার জন্য। ঠাকুর ঘরের সামনে রান্নাঘরের লাগোয়া ঢাকা জায়গায় দাদুর সখের বাগান। ফুল, লংকা, এটা ওটা পাতাবাহার, টবের অন্ত নেই।
সেজ ছেলে এই সখের সহযোগী। যেখানে ভালো গাছ দেখা যায়, চারা এনে উপস্থিত করেন।
বিকেলে ঘুম ভেঙে উঠেই দাদু ঘড়িতে চারটের ঘন্টা শুনে একটি মিষ্টি বা ফল খান। খেয়েই ছ ফুট শিরদাঁড়াখানা একেবারে স্কেল দিয়ে আঁকা সরলরেখার মত টানটান করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যান ছাদে খুরপি হাতে।
ব্যায়াম কে ব্যায়াম হয়, বাগানকে বাগান।
বাড়ির সামনের রাস্তায় লাইটপোস্টে কাকের বাসা। সেটা ছাদের পাশেই একেবারে। ডিম পাড়ার পর মা কাক তিরিক্ষি মেজাজে পাহারা দেয়।
এবাড়ি চিরকাল দুষ্টু ছেলেপিলেতে ভর্তি। উঁকি ঝুঁকি মারে। লাঠি এনে খোঁচাখুঁচির চেষ্টা। কাকেরা তাই এই সময়ে ছাদে মানুষ দেখলেই কা কা করে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করে। আর পাঁচিলের ধার ঘেঁষে লাইটপোস্টের কাছে আসছে বলে মনে হলেই ঠোক্কর।
দাদু ওরে বাবারে মা রে করতে করতে নেমে এলেন এক দিন।
ছোটদের ত সকালে ঠুকরেছিল। এখন দাদু খুরপি হাতে টবের সারির দিকে এগিয়ে যেতেই দাদুর টাক মাথায় ঠকাস।
সে কি কান্ড!!
দিদা ষাট ষাট করে লাল ওষুধ লাগিয়ে কোনো মতে সামলালেন সে দিন।
তাই বলে নেড়া কি আর বেলতলায় যাবে না?
হুঁঃ
সামান্য ভুষুন্ডি কাকের ভয়ে নিজের বাড়ি, নিজের ছাদ, নিজের গাছদের ফেলে পালাবেন নাকি বীর মুখুজ্জে মশাই। গামছা দিয়ে মাথায় মস্ত পাগড়ি পড়ে উঠছেন দাদু।
ছোট নাতনি দোতলার বারান্দায় ছিল। দেখতে পেয়ে হ্যা হ্যা হই হই, এই সবাই এসো, শিগগিরী। দেখো দেখো, দাদু পাগড়ি পড়ে ছাদে চলেছে বীর সেজে।
হো হো।
সব ঘর থেকে সবাই পিলপিল করে বেরিয়ে আসে।
দাদু কিন্তু হাসেন না। বেজায় গম্ভীর মুখে সিঁড়ি দিয়ে ছাদের দিকে পা চালিয়ে চলেন । দেখে মনে হচ্ছে মহাযুদ্ধে চলেছেন। ছোটোরা আর থাকতে পারে না। রান্নাঘর থেকে কড়াই গামলা নিয়ে মাথায় চাপায় ঠোক্কর থেকে বাঁচতে। তারপর হুড়মুড় করে চলে ছাদে বিচিত্র ব্যাটেলিয়ন।
কাক বনাম মানুষ। নারদ নারদ।