রেকারিং ডেসিমাল

মাকে, বউকে এবং হাসপাতালে যাওয়াকে সামলাতে মায়ের ছেলেকে ছুটি নিতে হল শেষ অব্ধি।
ফাঁকা সময় পেয়ে হবু মা গল্প শুনতে বসে দাদু দিদার ঘরে।
হ্যাঁ দিদা, কাশী ডাক্তার গ্রামে ডাক্তারি করতেন ?
মোটা কাঁচের চশমার পিছনে ঘোলাটে চোখ অন্যমনস্ক হয়ে যায়।
মারাত্নক ডায়াবেটিস। ইন্সুলিন নিয়ে নিয়ে সারা গায়ে চামড়ার তলায় কালশিটে। চোখের বারোটা বেজেছে তার জন্যই। কিন্তু তাই বলে খাওয়া দাওয়ার নিয়ম মানতে ঘোর আপত্তি। তাই রোগ কমেও না। নানা রকম সমস্যা বাড়ে। আজ চামড়ার অসুবিধে থেকে এবসেস তো কাল হার্টের সমস্যা, বা কিডনির গণ্ডগোল। লাগাতার ঝঞ্ঝাট ঝামেলা চলতে থাকে। ছেলেমেয়েরা অস্থির। বউয়েরা নাজেহাল। বুড়ো বর আগলে আগলে ডাক্তার হাসপাতাল করে নাকের জলে চোখের জলে।
স্বাস্থ্য খুব শক্ত, আর যত্ন অনেক, তাই টিকে যান বার বার। এবং তারপরেই আবার দিব্যি মোটা তেলের মাছের পেটি, মাংস, পোলাও শুরু করে দেন।
কাজে কাজেই দিদার চোখে অনেক দিন ধরে বারোটা বেজেছে।
সেই মোটা চশমার ফাঁক দিয়ে অতীতকে ছোঁয় দৃষ্টি।
তারপর বলে ওঠেন, হ্যার লেইজ্ঞাই ত বেকার পোলার বিয়া দিলাম।
— কার দিদা ?
একটু নড়ে চড়ে বসেন মানুষটা, বাংলা করে পরা শাড়ির আঁচলখানা গুছিয়ে নিয়ে।
কার আবার ? তোমার শ্বশুরের।
সে ত বড় ছেলে বাড়ির। তখনও চাকরি বাকরি পায়নাই।
ধুনু আমার এই বাড়িতে আইস্যা কইল, সুশীলাদি, আমার মাইয়ার বিয়া দিমু। তোমার পোলার সাথে দিবা ?
ধুনু আমাদের বরিশালের গ্রামের ছেলে। অ গো পরিবার আমাগো জমিদারই কইতে পারো।
বাংলাদেশের গ্রামে বাঁশের খুঁটির ঘর, বেড়া। শীত কালে ঘরে আগুন রাখে গরম করতে। হের থিক্যা আগুন লাইগ্যা সব পুইরা গেসিলো মামার বাড়ির।
ধুনুদের বাড়ি থিক্যা শীতের কম্বল, জামা কাপড়, বাড়ি বানানোর জিনিস সব পাঠাইসিলেন ধুনুর ঠাকুমায়ে। তাঁর মত মানুষ আর দেখিনাই। জানো, রোজ সকালে সারা গ্রামখান হাইট্যা আসতেন। কারো ঘরে হাঁড়ি চড়ে নাই দ্যাখলে সিধা পাঠাইতেন ঘরে গিয়া। পাড়ার সবাই খাইসে জানলে তবে নিজে খাইতে বইতেন দুফুরে।
স্বদেশী মিটিং করতে দেশবন্ধু, আরও নেতারা অগো বাড়িতেই আইতেন তো।
সেই বাড়ির মাইয়া আমার বউ হইবো, আমার এই ত সৌভাইগ্যো। আমি কি আর না কইতে পারি?
তাও কইসিলাম, পোলা ত কিসু করেনা ধুনু।
সে কইল, যত দিন চাকরি না পায়, আমি হাত খরচা দিমু দিদি। দিসিলো ও। যত দিন চাকরি না পাইসে পোলায়। তিরিশ ভরি সোনায় মুইরা দিসিলো মাইয়ারে। দেয়াথোয়া যা করসিলো, এই বাড়িতে আগে কেউ দ্যাখে নাই।
যুদ্ধ চলতাসিলো ত। চাইনিজ এগ্রেসন।
মাইয়া রাখা মুশকিল হইসিলো ওই পারে। পুরা বিয়ার গয়না আপাদমস্তক পরাইয়া প্লেনে মাইয়া লইয়া আইসিল ধুনু।
এইহানে তার বড় মাইয়ারা চইলা আইসিল আগেই। যাদবপুরে বাড়ি করসিলেন বড় মাইয়ার শ্বশুর আদিনাথ বাবু। বিয়ার আগে ওইখানেই রাখসিল খুকুরে।
বিয়া দিয়াই ধুনু ফিরা গেল বাংলাদেশ। ওই দিদিই সব লোকলৌকিকতা করত আমাগো সাথে।
পুরোনো সময়ের আবছা ছবি ফুটে ওঠে নতুন বউয়ের চোখে।
দেশ ভাগের নানান যন্ত্রণা সাধারণ মানুষকে কত দিকে কত ভাবে এলোমেলো করে দিয়েছে।
সমাজ, অর্থনৈতিক বিভাগ, নিজস্ব পরিমণ্ডল সব টুকরো টুকরো হয়ে ছিটকে গেছে মানুষজন।