আশ্বাস

সকাল গড়িয়ে দুপুর প্রায় । গত কয়েকদিনের নিম্নচাপ কেটে গিয়ে ঝলমলে রোদ উঠেছে আজ । চার বছর পর আজ ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরছে দিয়া । সহযাত্রী পরিচিত এক ভদ্রলোক ওকে বাড়িতে ড্রপ করে দেবেন । বহু প্রতীক্ষিত এই দিনটার জন্যই তো একটা জীবন অপেক্ষা করেছেন সুমেধা । নিজের জীবনের সমস্ত অপ্রাপ্তি ভরিয়ে দিয়েছে তাঁর আত্মজা ।
ঘন্টাখানেকের মধ্যেই ডোরবেল বেজে উঠল । দরজা খুলেই সুমেধা চমকে উঠলেন । কল্লোল ! বুকের ভিতর ঢেউ আছড়ানোর শব্দ ।
“তাহলে এখন আসি…”
“যদি খুব অসুবিধে না হয় তাহলে লাঞ্চটা এখানেই…”
তৃপ্তি করে কল্লোলকে খেতে দেখে চোখে জল আসছিল সুমেধার । কি অদ্ভুত ফ্যালাসি ! শুধু মাঝখানে ছাব্বিশটা বছর একটা বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এঁকে রেখেছে ।
ছাব্বিশ বছর আগে কল্লোলের সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে এক বছরের দিয়াকে নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন সুমেধা । বরাবরই সুমেধা ভালো ছাত্রী । এম-এ পরীক্ষা দিয়েই এন-আর-আই পাত্রের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল । বিদেশের ইউনিভার্সিটিতে গবেষণার সুযোগও পেয়েছিলেন । উচ্চশিক্ষিত পাত্রী খুঁজলেও কল্লোল কিন্তু ওকে নিছক গৃহবধূ করেই রাখতে চেয়েছিলেন । সংঘাত শুরু হয়েছিল তখনই । কল্লোলের জীবনে সুমেধার মতামতের কোনো গুরুত্বই ছিল না । অবশেষে বছর দুয়েকের মধ্যেই লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখে মেয়েকে নিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন সুমেধা । অমানুষিক সংগ্রামের পর একটা স্কুলে চাকরি হয়েছিল । সব অসম্মান, অপমান দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে সিঙ্গল মাদার হিসেবেই বড় করেছেন দিয়াকে ।
দীর্ঘ বিমানযাত্রার পর জেট ল্যাগ হচ্ছিল তাই দিয়া ওর ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল । এতক্ষণে কল্লোলের মুখোমুখি দাঁড়ালেন সুমেধা । শেষ বোঝাপড়াটা বাকি আছে এখনও । “দিয়ার সঙ্গে এখানে আসার কি খুব দরকার ছিল !”
মাথাটা নামিয়ে নিলেন কল্লোল । বিড়বিড় করে বললেন, “আমার দরকার ছিল মেধা । নিজের ভুল স্বীকার করার এই সুযোগটা আমি হাতছাড়া হতে দিতে চাইনি ।”
হঠাৎই সুমেধার অবাধ্য চোখ বানভাসি । ছাব্বিশ বছর ধরে নিজেকে যে কাঠিন্যের আবরণে মুড়ে রেখেছিলেন সব ভেসে যাচ্ছে উজানস্রোতে । কাঁধে আলতো হাতের স্পর্শ… দিয়া ! এই মুহূর্তে এই আশ্বাসটুকুর বড় প্রয়োজন ছিল তাঁর ।