লকডাউন ডায়েরী

লকডাউনে মিলনবাবু


লকডাউন শুরু হল বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের প্রকোপে। দোকান, বাজার, হাট স্কুল, কলেজ সব বন্ধ।তবু মিলনবাবু দোকানে গেলেন একবার। তিনি বলেন, আমার কিছু হবে না’,।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা  বলছেন এই ভাবনাটাই করোনাকে, বিশ্ব মহামারীতে, পরিণত করার ক্ষেত্রে অন্যতম কারণ। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং নিয়ে বারবার বলা সত্ত্বেও এ দেশে বাজার-ঘাটে সেই দৃশ্য খুব কমই দেখা যাচ্ছে। অথচ দেশে ক্রমেই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার একটি ঘটনা রীতিমতো আশঙ্কার সৃষ্টি করতে পারে। লকডাউন চলাকালীন মাত্র একবারের জন্য দোকানে গিয়েই করোনা আক্রান্ত হলেন এক ব্যক্তি। অথচ তিনি মাস্ক, গ্লাভস সমস্ত কিছুই পরে গিয়েছিলেন।

মিলনবাবু  জানিয়েছেন, তিনি লকডাউন সম্পূর্ণই মেনে চলছিলেন। কিন্তু ঘরে খাবার শেষ হতেই তাঁকে যেতে হয়েছিল দোকানে। তাও একটি দোকানেই গিয়েছিলেন তিনি। সেদিন পর থেকেই শরীর খারাপ হতে থাকে। জ্বর, শরীরে অসহ্য ব্যথা। এরপরই প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁর করোনা টেস্ট হয়। সেখানেই তাঁর রিপোর্ট পজিটিভ আসে।

বেআক্কেল বিজু


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশি থেকে ভাইরাস ছড়ায়। সেক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখলেও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তির ড্রপলেট অন্য কারও নাক, মুখ, চোখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই ভাল মাস্ক, চশমা পরাটা আবশ্যক বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বেনজির ক্ষেত্রেও সেভাবেই সংক্রমণ ছড়িয়েছে।এই কঠিন সময়ে  বিজু বাইরে গেছে। কিন্তু তার স্ত্রী খুব চিন্তিত। সাতটা বেজে গেলো এখনও বিজু ফিরে এল না। বিজুর স্ত্রী পাড়ার সব প্রতিবেশীদের বলল,দেখুন আটটা বেজে গেল এখনও আমার স্বামী ঘরে ফেরে নি। পাড়ার ছেলে পিরু বলল, চিন্তা নেই। আমি আছি। দেখছি ফোন করে। ফোন নাম্বার ছিল পিরুর কাছে। কিন্তু ফোনের রিং হয়ে যাচ্ছে। কোন উত্তর নেই। বার বার বারোবার ফোন করেও কোন উত্তর পাওয়া গেল না।বিজু আর রাজু- মাষ্টার দুই বন্ধু। তারা দুজনে মোটর সাইকেলে স্কুলে যেত।  তাই বিজুর স্ত্রী  নিশ্চিত হল, রাত আটটা বেজে গেল। তার মানে কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে। রাজু- মাষ্টারমশাইয়ের মোটর সাইকেল আ্যক্সিডেন্ট হয়েছে মনে হয়। ফোন বেজে চলেছে। তারা হয়ত দুজনেই মরে পড়ে আছে।
বিজুর স্ত্রী বাপের বাড়ি থেকে বাবাকে, দাদাকে ডেকে আনল। বাবাকে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, বাবা চল একবার থানায় যাই।
বাবা বললেন, একটু সবুর করি। হয়ত ফিরে আসবে।
ঠিক সাড়ে আটটায় বিজু সমস্ত চিন্তার অবসান ঘটালো।
সবাই দেখল, বিজু দুইহাতে দুটো বড়মাছ ঝুলিয়ে দাঁত কেলিয়ে আসছে।

বিজুকে সবাই রেগে বলল, কি বেআক্কেলে লোক তুমি। কোথায় গেছিলে?
বিজু বলল, মাছ ধরতে গেছিলাম। ফাতনার দিকে তাকিয়ে ফোনের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছি। রিং হলেও পকেট থেকে বের করেনি রাজুমাষ্টার । আমি বললাম ফোনটা ধরতে।
রাজু মাষ্টার বলল, এখন ফোন নয়। শুধু জল আর ফাতনা। মেছেল আমি। এবার বুঝেঝি বড় রুই ঘাই মারছে। তু দাঁতকেলা, ডিস্টার্ব করিস না। কেলিয়ে দেব। বন্ধু হয়ে শত্রুতা করিস না। দিলি কথা বলে চারঘোলা করে।
বিজুর বৌ রেগে বলল,এই দাঁতকেলা। তোর মাছ,  তুই খা। কোন বাপে রেঁধে দেয়,দেখি….
পিরু বলল, এখন তে লকডাউন। পুলিশ কিছু বলেনি।
বিজু বলল, খুব কেলিয়েছে। এই দেখ পিঠে কালশিটে দাগ।

ছাবু


খবরে পড়ছি না খেতে পেয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে অনেক। আজ খবরে শুনলাম  গলায় দড়ি দেওয়ার আগে একটি কাজ করে গিয়েছেন দিল্লির সরস্বতীকুঞ্জের বাসিন্দা, বিহারের ছাবু মন্ডল। নিজের শখের মোবাইল ফোনটি ২৫০০ টাকায় বিক্রি করে নিজের ঝুপড়ি ঘরের জন্যে একটা টেবিল পাখা কিনেছেন। নয়ত ছাবুর বউ পুনম, ওদের ছয় বছরের বাচ্চাটার এই প্রচণ্ড গরমে খুব কষ্ট হচ্ছিল। আর বাকি টাকায় কিনেছিলেন কিছু খাবার। লক ডাউনে রোজগার বন্ধ হলেও পেটের খিদে তো সরকারি নিয়ম মেনে চলে না। চূড়ান্ত অসহায়তা আর হতাশায় নিজের প্রাণ নেওয়ার আগে ওইটুকুই ছিল পরিবারের প্রতি ছাবুর শেষ কর্তব্য।
শিল্পী ছিলেন ছাবু মন্ডল। রঙ–তুলি নিয়ে বিহার থেকে এসেছিলেন অন্য লোকের সংসার রঙিন করতে। গুরগাঁওয়ের বাড়ি বাড়ি ছবি এঁকে বেড়াতেন। কিন্তু লক ডাউনের কারণে ঘর থেকে বেরোনোই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অথচ ঘরে বউ, চারটে বাচ্চা, বাবা, মা। রোজ দুবেলা খেতে খেতে শেষে আর এক দানা চালও পড়ে ছিল না। হাত পাততে হতো প্রতিবেশীদের কাছে। নিঃস্ব ছাবুর দাহ করার খরচও প্রতিবেশীরাই শেষ পর্যন্ত চাঁদা তুলে দিয়েছেন। কিন্তু তার পর?‌ কাঁদতে কাঁদতে পুনম বলছেন, ‘‌স্বামী ছিল। ভরসা ছিল। এখন তো আরোই ভাত জুটবে না।’

সরস্বতীকুঞ্জের আরও এক বাসিন্দা ফিরোজ ছাবুর সঙ্গেই কাজ করতেন। তিনি বলছেন, লকডাউনের আগে থেকেই সেভাবে কাজ পাচ্ছিলেন না ছাবু। টুকিটাকি কাজ থেকে রোজগার খুব সামান্যই হত। তা দিয়ে সংসার চলে না!‌ তার ওপর শুরু হল লকডাউন। পুনম বলছেন, ‌‘‌বাড়ি ভাড়াও দিতে পারছিলাম না আমরা। বাড়িওয়ালা বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন। কিন্তু দেব কোত্থেকে!‌ ফোন বেচে হাতে এসেছিল ২৫০০ টাকা। সেই টাকায় কিছু খাবার কেনা হয়েছিল। বাকি টাকা দিয়ে একটা পোর্টেবল ফ্যান কেনা হয়েছিল। কুঁড়েঘরে থাকি। টিনের চাল। বাচ্চাগুলো ঘুমতে পারে না। গরমে কষ্ট হয়। বাধ্য হয়েই ফ্যান কিনতে হয়েছিল।’‌
পুলিশ বলছে, ছাবু মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। পরিবার–সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন।তবে কি আবার দুর্ভিক্ষ এগিয়ে আসছে গরীব দেশে।

চলবে…