তেষট্টি

ABC ও আমার নিয়মিত দেখা না হলেও যোগাযোগ ছিল । ও দিন দিন কেমন যেন সন্ন্যাসী হয়ে যেতে লাগলো । দেখলে সবসময় মনেহয় আনমনা । চুল দাড়ি বাড়াতে থাকলো । ও ক্রমশ মনে হল আধ্যাত্মিক দিকে ঝুঁকছে । ক্রিশ্চান ও পাশ্চাত্য দর্শন ও ধর্ম নিয়ে গভীর পড়াশোনা করছে। ও প্রফেসার মুলারের অধীনে পি. এইচ. ডি করছিলো । প্রফেসার রোজার মুলার হাম্বার্গ ইউনিভার্সিটির একজন উজ্জ্বল রত্ন । রসায়নের ক্ষেত্রে একজন দিকপাল । পরে ওনার নেমে বদনাম রটে উনি নাকি অ্যালকেমি প্রাকটিস করেন । অ্যালকেমির বেপারে ABC আমাকে অনেক কিছু জানায় । অ্যালকেমিকে অনেকেই বুজরুকি বলে । অ্যালকেমিস্ট দের উদ্দেশ্য ছিল অলীক ও অবাস্তব । মূলত ফিলসফারস স্টোন নাকি যেকোনো মৌলকে সোনা বা রূপায় পরিণত করতে পারবে । ঠিক পরশ পাথরের মতন । আর এলিক্সির অফ লাইফ মানুষকে দীর্ঘ জীবন বা অনন্ত যৌবন দিতে পারবে । যদিও আধুনিক বিজ্ঞানের প্রগতির পেছনে অ্যালকেমির বিশেষ গুরুত্ব আছে । কিন্তু অ্যালকেমিকে ঠিক বিজ্ঞান বলা হয়না । কারণ এর মধ্যে তন্ত্র মন্ত্র অধ্যাত্মিক উপকরণ আছে । অনেক বিখ্যাত রসায়নবিদই নাকি অ্যালকেমিস্ট ছিলেন । যেমন বয়েলস ল এর আবিষ্কর্তা রবার্ট বয়েল । নিউটন ও নাকি একসময় অ্যালকেমি প্রাকটিস করতেন । অ্যালকেমির উদ্দেশ্য শুধু পাশ্চাত্য দেশই নয়। চায়না, ভারত, আরব এও অ্যালকেমির প্রচলন ছিল । ভারতে আলেকজান্ডার ঢোকার পরেই অ্যালকেমিতে গ্রিক প্রভাব পরে । যাই হোক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অ্যালকেমিও অবলুপ্ত হয়ে যায় । কিন্তু ABC আমায় বলে এখনও অ্যালকেমি চর্চা করা যায় । রয়েল অ্যালকেমিস্ট সোসাইটি নামে তাঁদের একটি সংগঠন আছে । বিশ্ব জুড়ে তাঁদের নিটওয়ার্কও আছে ।ABC একান্ত গোপনে জানায় সে ওই মেম্বারের মেম্বারও হয়ে তার প্রফেসারের সুপারিসে । আমি এসব শুনে বেশ মজাই পেয়েছিলাম । বলেছিলাম ভাই তোর মাথাটা একেবারে গেছে । এবার একটা বিয়ে কর। তাহলে সোনা না পাওয়া আর যৌবন হারানোর ভয় থাকবে না । কিন্তু ABC নিরুত্তাপ থেকে অ্যালকেমির কথা চালাতে থাকে । আমিও আর ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাইনি । কিন্তু পরে যখন রজার মুলার খুন হলেন তখন ভাবলাম অ্যালকেমির ব্যাপারটা সহজ নয় । এক বিশাল চক্র আছে । প্রফেসার মুলার খুন হন মাঝরাস্তায় । তাকে গুলি করে এক জার্মান যুবতি । মেয়েটিকে পুলিশ ধরে । কিন্তু পুলিশ সূত্রে জানা যায় মেয়েটির স্বামী নেহাতই একদিনের জ্বরে মাস দুয়েক আগে মারা যায় । তার অভিযোগ প্রফেসার মুলার একজন অ্যালকেমিস্ট ও তিনি জাদুর সাহায্যে ওর স্বামীকে মেরে ফেলে । এই নিয়ে বেশ গোল হয়ে অবশেষে কোর্ট রায় দেয় যে মেয়েটি মানসিক রুগী । প্রফেসার মুলার আর তার স্বামীর মধ্যে কোনো যোগই ছিল না। কিন্তু পরে জেনেছি লোকটি প্রফেসার মুলারের ল্যাবে মাল সাপ্লাই করতো । তবে প্রফেসার মুলারের নামে মিথ্যে দোষ চাপানো হয়েছিল । তার মৃত্যু একেবারেই এক অঘটন । এক পাগলির হাতে নির্মম মৃত্যু । কিন্তু আমার মনে একটা খটকা থেকেই যায় । আমার মন বলছে যেহেতু সে মুলারের ল্যাবে কাজ করতো কোনো তথ্য পায় বা আবিষ্কার চুরি করে । ABC একবারো বিশ্বাস করেনি যে যুবটির মৃত্যু অ্যালকেমির বিদ্যা দিয়ে সম্ভব । তারপর আমি এই ব্যাপারটা একটু সমীহ করে চলতাম । জীবন তার আপন গতিতে চলতে থাকলো । ABC র মধ্যেও অনেক পরিবর্তন এলো ।সে দেশে ফিরলো । বিয়ে করলো । ছেলে হল আবার জার্মানিতে রিসার্চ করতে ফিরে এলো । ABC র চেঞ্জ কিন্তু মুলারের মৃত্যুর পর এসেছে । অ্যালকেমির সর্বনাশা নেশা মুলারি তার মধ্যে ঢুকিয়ে ছিল । তার মোরে যাওয়ার পর স্বাভাবিক সেই নেশা কেটে যাওয়া । হয়তো কেটেছে বলেই আমি ABC র মধ্যে পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছিলাম ।