বাষট্টি

তখন হাম্বার্গ ইউনিভার্সিটি বেশ কমবয়সী ছিল। ওর জন্ম ২৮ মার্চ ১৯১৯ সাল আর আমি জয়েন করি ১২ই আগস্ট ১৯৬১সাল। এখনও মনে আছে, আমি যেদিন জার্মানি পৌঁছাই ঠিক পরের দিন থেকে ইস্ট জার্মানি ও ওয়েস্ট জার্মানিকে আলাদা করতে বার্লিন প্রাচীর তৈরি হওয়া শুরু হয়েছিল। আমি আর ABC একইসঙ্গে আসি জার্মানিতে। আমি ঢুকলাম ডিপার্টমেন্ট অফ বায়োলজিতে আর ও ঢুকলো ডিপার্টমেন্ট অফ কেমিস্ট্রিতে । সপ্তাহের বাকি দিনগুলো দুজনের মধ্যে দেখা না হলেও আমরা প্রতি রবিবার হামবার্গ পোর্টে চলে যেতাম । সেখানে এলবি নদীর পারে বসে দুই বন্ধু মিলে কতই না গল্প করেছি মন খুলে । কখনো মার্কস ও এঞ্জেলস কমিউনিজম নিয়ে আবার কখনো ভারত বা বাংলাদেশ নিয়ে । কখনও রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল নিয়ে আবার কখনও নেহাত জার্মান ও কলকাতার মেয়ে নিয়ে । কিন্তু যত দিন যেতে লাগল আমাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে লাগলো । আমরা এক ইউনিভার্সিটিতে পড়লেও দুজনের ডিপার্টমেন্ট ছিল আলাদা এবং ক্যাম্পাসের দুই প্রান্তে। আবার আমাদের দুজনের দুটো হস্টেলের দূরত্বও অনেকটা। বছর না ঘুরতেই আমাদের একটা বান্ধবী জুটে গেল । আমাদের ডিপার্টমেন্টে ক্লাসমেট ইস্লোভা ।তাই রবিবার গুলো ABC তে আটকে না থেকে পরবর্তী বর্ণমালার দিকে এগিয়ে যাওয়ায় ব্যস্ত থাকতাম । মাস্টার্স শেষ করে আমি পি. এইচ. ডি করি । ABC সুযোগ পেয়েও পি. এইচ. ডি করলো না । ও বরাবরই একটু অন্যরকম । ও দেশে ফিরে গেল । ওর ইচ্ছে ভারতবর্ষকে সেবা করতে চায় ও । বিদেশের উন্নত শিক্ষা, ও দেশের কাজে লাগতে চায় । আমি ওকে অবশ্য বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে পি. এইচ. ডি করেও তো ও দেশের সেবা করতে পারে । কিন্তু ও ওর সিদ্ধান্তে অনড় । ও দেশে ফিরে গেল । আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ছিলেন ওর রোল মডেল । তারপর ওর সঙ্গে অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না । ওর সঙ্গে আবার দেখা হল বছর পাঁচেক পর । ও আবার জার্মানিতে ফিরে আসে স্কলারশিপ নিয়ে হামবার্গ ইউনিভার্সিটিতেই পি এইচ ডি করতে । অদ্ভুত এই ABC। সেই তো বাবা পথে এলি, মাঝখান থেকে পাঁচটা বছর নষ্ট করলি আমি ততদিনে ডক্টরেট পেয়ে রিসার্চ করছি আর পড়াচ্ছি। পার্টটাইম বিয়েটাও সেরে ফেলেছি । আমি তখন জার্মান নাগরিক।
আমি মন দিয়ে পড়ছিলাম ডায়েরিটা পুরোদস্তুর ডুবেছিলাম ডঃ চোঙদারের গল্পে । পাশে রাখা মোবাইলটার বিকট আওয়াজে আমি চমকে উঠলাম । আমার মনোযোগ একদম ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল । বিরক্ত হয়েই হাতে ফোনটা তুলে দেখলাম সেই কালনাগিনীর ফোন লুলিয়া । নিশ্চই ডায়েরির খবর জানার জন্য হাঁক পাঁক করছে । ডায়েরি থেকে কি পেলাম না পেলাম তা ওর বসকে তো জানাতে হবে । ফোনটা ধরলাম না । আরও তিনবার ফোনটা বেজে উঠল। বুঝতে পারছি জানার জন্য ছটফট করছে। ওর ওপরেও নিশ্চই চাপ আছে । কিন্তু ফোনটা আমার মনোযোগ ভেস্তে দিলো। ফোনটাকে বন্ধও করা যাচ্ছে না । তাহলে লুলিয়ার সন্দেহ হবে । তাই ফোনটাকে সাইলেন্ট করে রাখলাম । কিছুক্ষন পরে মোবাইলের আলো জ্বলে উঠল । এবার আননোন নাম্বার। তার মানে আমি যে ফোন ধরছিনা সে খবর বসকে পৌঁছে দিয়েছে । মোবাইলটা এবারে চোখের আড়ালে রাখলাম । ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে ডায়েরির এই পর্যন্ত পড়া গুলো একবার গোড়া থেকে ভেবে নিলাম । এই ABC অমিত বিক্রম চৌধুরী হলেন আমার বাবা । বাবা যে পড়ার মাঝে দেশে ফিরে এসেছিলেন বা এখানে চাকরি করেছেন এইসব আমার জানা ছিল না । ফিরে এসে আবার জার্মানিতে গেলেনি বা কেন? মনে হচ্ছে ডায়েরিটা ডঃ চোঙদার ও বাবার দুজনের কমন ঘটনা নিয়ে লেখা । এটা কোনো আত্মজীবনী নয় । কারণ নিজের সমন্ধে বিস্তারিত না লিখে, গল্পের মাধ্যমে বাবার ব্যাপারে বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছেন । ডায়েরিটা লেখার আসল উদ্দেশ্যটা কি? সেটা গোটা ডায়েরিটা পড়লে পরিষ্কার হবে না । আবার পড়া শুরু করলাম…..