সংগ্রামী লাহিড়ী নিউ জার্সির বাসিন্দা, বৃহত্তর নিউইয়র্ক বলা যায় | পরিচয় - শিক্ষায় প্রযুক্তিবিদ, পেশায় কন্সাল্ট্যান্ট, নেশায় লেখিকা | শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে বহুকালের সিরিয়াস চর্চা আছে, অল ইন্ডিয়া রেডিওর A গ্রেড শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী | উত্তর আমেরিকায় করোনা ভাইরাসের এপিসেন্টারে বসে বদলে যাওয়া প্রবাস-জীবনের ডায়রী লিখছেন |

করোনা-ধারায় এসো – 12

অর্ধেক আকাশ – পর্ব ২

ক্যাথিকে মনে আছে নিশ্চয়ই? ক্যাথি মার্টিন, ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট| বৃহত্তর নিউইয়র্ক অঞ্চলের এক লিবারাল আর্টস কলেজে গ্লোবাল ফেমিনিজম ক্লাস চালু করতে লড়ে গিয়েছিল| বেশিদিন নয়, এই বছর কয়েক আগের কথা| সে ক্লাসে ছিল পাঁচটি পড়ুয়া| আর পুরুষজাতির হয়ে একমাত্র প্রতিনিধি ছিল আমারই পুত্র|
সে ছিল ক্যাথির বিশেষ স্নেহধন্য| ক্যাথির সঙ্গে মিলে অর্গানাইজ করেছিল “In Your Shoes”| প্রতীকী ইভেন্ট| মেয়েদের জুতো পরে ছেলেরা হেঁটেছিল| জনান্তিকে বলে রাখি, পুত্রের পায়ের মাপে আমায় একটি লাল টুকটুকে স্টিলেটো কিনতে হয়েছিল সে সময়|
মরিসটাউনের এক ক্যাফেতে গিয়ে তারা প্রায়ই লাঞ্চ খেত| আর অবশ্যই তার সঙ্গে দেশবিদেশের গল্প| সে গল্পের ভাগ আমিও একটু-আধটু পেয়েছি| তার থেকেই একটা – ক্যাথির জবানীতেই বলি|
সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা কাজের শেষে ডক্টর সারা ব্রাউন সবে একটু বসেছে| ওয়াশরুমে গিয়ে চোখেমুখে জল ছিটিয়ে ক্লান্ত শরীর কিছুটা স্নিগ্ধ হয়েছে| রাত হয়েছে| ডিনার শেষ| মাপা বরাদ্দ দুপিস রুটি, দু’টুকরো চিকেন, কফি| তিনটে টেবিল পেতে সার্ভাররা দাঁড়িয়ে আছে| লাইন দিয়ে একে একে চিকেন, রুটি আর কফি নিয়ে একসঙ্গে সার দিয়ে বসে খাওয়া| রাতটুকুই শুধু বিশ্রাম|
এইসময় রাতের অন্ধকার খানখান করে বেজে উঠলো সাইরেন| ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো ছিটকে ওঠে সারা| দৌড়োয় হাসপাতালের দিকে| এক ঝাঁক মেয়ে ক্ষিপ্রগতিতে পৌঁছে যায় যেখানে সার সার বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছে যুদ্ধে জখম হওয়া সৈন্যরা| আর বোমায় জখম সাধারণ মানুষ|
ঝাঁপিয়ে পড়ে ওরা| মুহুর্তে সব আলো নিভিয়ে দেয়| নিশ্ছিদ্র অন্ধকার| বোমারু বিমান দেখতে পাবে না অন্ধকারে ডুবে থাকা আহত মানুষের আশ্রয়টিকে| রাতের অন্ধকার কেঁপে ওঠে মুহুর্মুহু বোমার শব্দে| আতঙ্কে বোবা সবাই|
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মরণপণ করে লড়ছে আটাত্তর জন আমেরিকান মেয়ে| ওরা সবাই ডাক্তার আর নার্স| আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফ্রান্সে এসে যোগ দিয়েছে যুদ্ধে| ওদের লড়াই মৃত্যুর সঙ্গে| যমের মুখ থেকে প্রাণ ছিনিয়ে আনার চেষ্টা|
দক্ষিণ পশ্চিম ফ্রান্সের ছোট্ট একটি শহর লাব্যুয়ের (Labouheyre)| বোর্দো থেকে ট্রেনে ঘন্টা দেড়েক| সারা এই পথেই এসে পৌঁছেছে|
নিউইয়র্কের কর্নেল মেডিক্যাল কলেজে পড়তো সারা| কলেজেই আলাপ রবার্ট মার্টিনের সঙ্গে| ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক পরিবারের ছেলে| সে আলাপ প্রলাপে পৌঁছতে দেরি হয় নি| সারা-র পরিবারও খুশি| দুজনে পাস করে বেরোলেই বিয়েটা হয়ে যাবে|
কলেজের সিনিয়র ক্যারোলিনের সঙ্গে সারার খুব বন্ধুত্ব| ক্যারোলিন ফিনলে| অগাধ জ্ঞান, প্রচুর পড়াশুনো| সারা মুগ্ধ|
ক্যারোলিন স্পষ্টবক্তা| প্রতিটি ব্যাপারেই তার সুচিন্তিত মতামত আছে| আর জোরগলায় সে মতামত ব্যক্ত করতেও তার দ্বিধা নেই| প্রতিবাদী বলে কলেজে তার খ্যাতি ও কুখ্যাতি – দুইই আছে|
ক্যারোলিনের ঠিক উল্টো সারা| নরম-সরম, বাধ্য মেয়ে| নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারলেই যেন বাঁচে| প্রতিবাদ তো দূরের কথা, কারোর চোখে চোখ রেখে কথা বলতেই তার প্রবল কুণ্ঠা, সংকোচ|
এহেন নির্বিরোধী সারার সঙ্গে বিদ্রোহী ক্যারোলিনের মনের মিল দেখে অনেকেই অবাক!
কয়েকমাস আগেই দেশের আঠাশতম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘটে গিয়েছে| উড্রো উইলসন দ্বিতীয়বারের জন্যে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন| ক্যারোলিন আর সারাদের অবশ্য ভোট দেওয়ার অধিকার নেই| মেয়ে যে! এদেশে মেয়েরা ভোট দিতে পারে না| প্রশাসনিক কোনো পদে মেয়েদের জায়গা নেই|
ক্যারোলিন আর তার দুই বন্ধু মরিয়া হয়ে একটা চেষ্টা চালিয়েছিল| ভোট দেবার জন্যে হাজির হয়েছিল কাছের এলিমেন্টারি স্কুলে| সেখানে তখন প্রাইমারি ইলেকশনের ভোটিং চলছে| শ্বেতাঙ্গ পুরুষরাই শুধু ভোট দেওয়ার অধিকারী|

ক্যারোলিন আর তার বন্ধুরা সটান দাঁড়িয়ে পড়েছিল লাইনে| গলাধাক্কা জুটতে অবশ্য দেরি হয় নি|
ক্যারোলিন সহজে ছাড়বার পাত্রী নয়| বোঝাতে গিয়েছিল যে সেও একটা মানুষ, আমেরিকান নাগরিক| দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার নিশ্চয়ই ভোট দেবার অধিকার আছে| দুদিন হাজতবাস হয়েছিল|
সেই থেকে ক্যারোলিনের ধনুর্ভঙ্গ পণ, এদেশে মেয়েদের ভোট দেওয়ার অধিকার সে লড়াই করে ছিনিয়ে নেবে| বড় একটা অ্যাক্টিভিস্ট দলের সঙ্গে যুক্ত| নানা প্রতিবাদ মিছিলে হাঁটে, মিটিঙে যায়|
কয়েকবার চেষ্টা করেছে সারাকে নিয়ে যাওয়ার| সারা লুকিয়ে থেকেছে| ক্যারোলিনের ওপর তার পূর্ণ সমর্থন| কিন্তু জনসমক্ষে যেতে প্রবল অনীহা|
ইদানিং ক্যারোলিনএর সঙ্গে কেরির পরিচয় হয়েছে| কেরি চ্যাপম্যান ক্যাট| মেয়েদের অধিকারের জন্যে লড়ছে| ওম্যান সাফরেজ অ্যাসোসিয়েশনএর নেত্রী| কেরি আর ক্যারোলিন মিলে চেষ্টা চালাচ্ছে ডাক্তার আর নার্স মেয়েদের নিয়ে একটা ওভারসিজ হাসপাতাল খোলার|
মেয়েদের ভোট দেওয়ার দাবী জানালে মাঝেমধ্যেই শুনতে হয় – “মেয়েরা কি দেশের জন্যে যুদ্ধে যায়? দেশের সেবা করে? তাহলে কেন মেয়েদের ভোটিং রাইট থাকবে?”
তাই ক্যারোলিনের এখন পাখির চোখ যুদ্ধে যাওয়া – মিলিটারি সার্ভিস| ফ্রন্টলাইনে সে লড়তে চায়| এদেশে মানে আমেরিকায় সেটা সম্ভব নয়| মিলিটারিতে মেয়েদের জায়গা নেই| কিন্তু ইউরোপে আছে| বিশেষত, সেখানে এখন বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে| ডাক্তার আর নার্সের দরকার সেখানে এখন অনেক বেশি|
উনিশশো সতেরো সালের শেষের দিকে ডাক্তারী পাস করে সারা ঘোষণা করলো সে ফ্রান্সে যাচ্ছে| বিশ্বযুদ্ধে ডাক্তারী পরিষেবা দিতে|
নরমসরম সারার এমন ঘোষণায় ব্রাউন পরিবারে আকাশ ভেঙে পড়লো| সারার বাবা ধর্মপ্রাণ যাজক| মা সংসারে নিবেদিতপ্রাণ গৃহবধূ| মেয়ের এমন সৃষ্টিছাড়া পরিকল্পনায় মর্মান্তিক শোক পেলেন দুজনেই|
শুধু রবার্ট বলেছিল, সে অপেক্ষায় থাকবে|
তারপর তো এই লাব্যুয়ের শহর| উনিশশো আঠারো সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আটাত্তর জন মেয়ে ডাক্তার আর নার্সের প্রথম দলটি এসে হাজির হলো সেখানে| কেরি চ্যাপম্যান ক্যাট, ক্যাটরিনা টিফ্যানি-রা ফান্ডরেইজিং করে তুললেন দু’লক্ষ ডলার| এখনকার হিসেবে যা তিন মিলিয়ন ডলারেরও বেশি| তৈরী হলো হাসপাতাল|
ইউরোপে তখন মহামারী| স্প্যানিশ ফ্লুতে দলে দলে মানুষ মরছে| ঠিক যেন এখনকার মহামারীর ছবি| তার মধ্যে বিশ্বযুদ্ধের দামামা| মেয়েরা কিন্তু অকুতোভয়|
“বলেছিলে না তোমরা, মেয়েরা যুদ্ধে গিয়ে দেশের সেবা করে না? এবার দ্যাখো আমরা যুদ্ধে যেতে পারি কী না| কেন ভোটের অধিকার দেবে না আমাদের?”
দলে দলে এসেছিল তারা| যখন তখন বোমারু বিমান, এয়ার রেইড| তার মাঝে প্রাণ হাতে করে একদল আমেরিকান সাহসিকা নিজেরাই গড়েছিল তাদের একান্ত নিজস্ব হাসপাতাল| পৃথিবীতে আর কোথাও কি এমন উদাহরণ আছে? যেখানে গোটা হাসপাতালটাই তৈরী হয়েছে একদল ডাক্তার আর নার্স মেয়ের পরিশ্রমে? মনে হয় না|
জুন মাসের মধ্যেই আমেরিকান মেয়েরা পঞ্চাশটা ব্যারাক তৈরী করে ফেলল| সাহায্য করল জার্মান যুদ্ধবন্দীরা|
জুলাই মাসের মধ্যে শুধু লাব্যুয়ের শহরেই পাঁচশোটি বেড| দশহাজার আহত মানুষের চিকিৎসা আর শুশ্রূষা হতে থাকল|
ওম্যান’স ওভারসীজ হাসপাতাল ফ্রান্সের উত্তরে আরো তিনটি শহরে একই রকম চিকিৎসাকেন্দ্র গড়েছিল| প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে পনের হাজার মানুষ চিকিৎসা পেতেন|
সারা নিউইয়র্কে বাবাকে চিঠি লিখল – ‘জানো বাবা, এখানকার সৈন্যদের কাছে আমরা খুব পয়া, lucky charm. আমাদের মতো ডাক্তার আর নার্স মেয়েদের ওরা কী চোখে যে দেখে! বিশ্বাস করে, আমরা একবার ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেই ওরা ভালো হয়ে যাবে| আদর করে আবার নাম দিয়েছে – “মিলিয়ন ডলার”| আমি ওদের কাছে গিয়ে বুকে ক্রস এঁকে দিই, মনে মনে প্রার্থনা করি যেন ভালো করে তুলতে পারি সবাইকে|’
সে চিঠি পড়ে নিউইয়র্কে বাবার চোখে জল|
আহতদের চিকিৎসা চলছে পুরোদমে| এমন সময় জার্মানি থেকে সদ্য ছাড়া পেয়ে কয়েকজন ইংরেজ সৈন্য ভর্তি হল লাব্যুয়ের হাসপাতালে| তারা জ্বরে আক্রান্ত| ভয়াবহ স্প্যানিশ ফ্লু| | চিকিৎসাও নেই| ফ্লু ভ্যাকসিন তখনো বেরোয় নি| হাসপাতালের একদিকে আইসোলেট করে দেওয়া হল তাদের, সেবা দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা চললো| কিন্তু সবরকম সাবধানতা সত্ত্বেও সংক্রমণ আটকানো গেল না| উইনিফ্রেড আর ইভা পড়লো জ্বরে| বাঁচানো গেল না| মহামারীর বলি দুই সাহসিকা| সংক্রমণের ভয়ে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে দেহ পাঠিয়ে দেওয়া হল কোন অজানা জায়গায়|
লাব্যুয়ের শহরের যুদ্ধকালীন চিকিৎসাকেন্দ্রের সবাই সেদিন চোখের জলে ভেসে বিদায় দিয়েছিল উইনিফ্রেড আর ইভাকে|
যুদ্ধ শেষ হলেও সারা ব্রাউনদের কাজ শেষ হয়নি| রক্তাক্ত, আহতদের চিকিৎসা, সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলছিল তারা| যুদ্ধোত্তর ফ্রান্স, ইংল্যান্ড অন্তত একশজন আমেরিকান মেয়েকে সম্মান দিয়েছিল| সারাও ছিল তাদের মধ্যে| আমেরিকা তখনো চুপচাপ| যে সব মেয়েরা ভালো স্যান্ডউইচ বানাচ্ছে, তাদের নিয়ে কোনো অসুবিধে নেই| যত গন্ডগোল ওই সাফরেজিস্টগুলোকে নিয়ে! মেয়েদের অধিকার চায় – হুঁহ!
আমেরিকান ওম্যান সাফরেজিস্টদের লড়াইটা ছড়িয়ে গিয়েছিল বিশ্বযুদ্ধ ছাড়িয়ে আরো অনেক অনেক গভীরে| মেয়েদের সমান অধিকার, ভোট দেওয়ার অধিকার, দেশের শাসনব্যবস্থায় অংশ নেওয়া – দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে হয়েছে প্রত্যেকটির জন্যে|
সারা ফিরলো দুবছর বাদে| উনিশশো কুড়ি সালে| ততদিনে কনস্টিটিউশনের নাইন্টিন্থ অ্যামেন্ডমেন্ট সর্বসম্মতিক্রমে আমেরিকান মেয়েদের ভোট দেওয়ার অধিকার দিয়ে দিয়েছে| এক পা এগোনো গেল| এখনো অনেক পথ বাকি| কিন্তু এটুকুই বা কম কিসে?
রবার্ট মার্টিন কথা রেখেছিল, অপেক্ষা করেছিল সারার জন্যে| নিঃশর্ত, প্রত্যাশাহীন অপেক্ষা|
ফেরার পর দুজনে ঘর বেঁধেছিল, সুখের ঘর|
অনেকক্ষণ একটানা বলে ক্যাথি থেমেছিল|
পুত্র সেই সুযোগে জিজ্ঞেস করে, “ডক্টর সারা মার্টিন কি…”
ক্যাথি মার্টিন কথা শেষ করতে দেয় নি, “হ্যাঁ, আমারই প্রপিতামহী|”
দুজনেরই চোখ তখন চিকচিক করছে – ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায়|
* সব চরিত্র সত্য, ইতিহাস থেকে নেওয়া| শুধু সারা ব্রাউনের নামটা বদলে দিয়েছি|

ক্রমশ…