যাত্রী

বাতাসের এখনো বারুদের গন্ধ লেগে আছে, ধোঁওয়ার মধ্যে আবছা দেখা যাচ্ছে কুঁকড়ে যাওয়া দুটো ছায়ামূর্তি, ঠিক বোঝা যায় না যন্ত্রনায় নাকি ভয়ে, নাকি আঘাতে! আবার একটা বিস্ফোরন, ধর্মের ধ্বজাধারীরা ধর্মরক্ষা করছে। তাই এত হিংসা, হানাহানির অধর্মের রক্ত চারিদিকে। নারী ছায়ামূর্তি নড়ে উঠতেই ওপাশ থেকে দশ বারো বছরের মেয়েটাও উঠে পড়ল, মুহুর্তের চোখাচোখি, তারপর দুজনেই দৌড়ল, পালাতে হবে, কিন্তু কোথায়? নিরাপত্তার আবাসস্থল কোথাও হারিয়ে গেছে। অনেকক্ষন দৌড়োনোর পর দু’জনেই থামল, সামনেই ভাগাড়, সারা শহরের নোঙরা ফেলা হয় এখানে।আবার একটা কোলাহল শোনা যাচ্ছে অদূরেই। সামান্য সময় অপেক্ষা করেই দুজন অসমবয়সী মহিলা নেমে পড়ে আবর্জনার স্তুপে। কোলাহল সরে যাচ্ছে, সারা শহরে বিভৎসতা ছড়ানো লোকেরাও নাক চেপে পেরিয়ে যাচ্ছে এই বিশ্রি দূর্গন্ধ। অথচ দুই সৃষ্টিশক্তি এখানেই নিজেদের সুরক্ষিত মনে করছে। কিছুক্ষন পর দুজনে বেরিয়ে এল বিপদ সরে যাওয়ার আঁচ পেয়ে। সারা শরীরে আবর্জনা, তবু ওরা হাত মিলেয়ে বলল-
আমার নাম রোকেয়া।
আমি জুঁই, ছোট করে বলল বছর দশ বারোর সদ্য ফুটে ওঠা কুঁড়ির মতো মেয়েটা।
দুজনেই চুপ করে রইল আবার। নীরবতাই বুঝিয়ে দিল স্বজন হারানোর কাহিনী।
রোকেয়া বলল- কিছু খেয়েছ সকাল থেকে?
জুঁই বলল- না, বাবা মন্দির থেকে ফিরছেনা দেখে খুঁজতে এসেছিলাম, রাস্তায় দেখি বাবা…
ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল মেয়েটা-বাবা মন্দিরের পুরোহিত, পূজো করতে গেছিল, ওতেই আমাদের সংসার চলত, তবে কেন ওরা বাবাকে…
ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল জুঁই। রোকেয়া ওকে বুকে টেনে বলল, “হিংসার কোনো জাতধর্ম নেই রে বেটি। আমার শোওহর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি, ওকে ওরা দুকান থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে..”
জল গড়িয়ে পড়ল রোকেয়ার গাল বেয়ে।
জুঁই বলল- এখন আমরা কি করব?
রোকেয়া বলে- তোর ঘর যেতে হবে, তোর মা কে বাঁচাতে হবে।
জুঁই রাজি হল চোখ মুছে- হ্যাঁ, মা, আমার মা কে বাঁচাতে হবে, আর তুমি?
রোকায়া হঠাৎ হেসে বলল- মানুষই নাই, তো ঘর! চল দেরি করিস না।
লুকিয়ে লুকিয়ে যখন জুঁইয়ের ঘরের কাছে পৌঁছল, দেখল দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে পাড়ার সবকটা ঘরে। হুড়োহুড়ি, দৌড়োদৌড়ির মাঝে জুঁই আর্ত চিৎকার করল-মা আ আ আ আ..
জুঁইয়ের চিৎকার হারিয়ে গেল ভিড়ে, ওর মায়ের মতই। দুঃখী, ক্ষুধার্ত মেয়েটাকে বুকে চেপে জোর পায়ে নিজের ঘরের দিকে হাঁটছিল রাবেয়া, একটা রোটি খাওয়াতে হবে ওকে, নেতিয়ে পড়ছে মেয়েটা। সামনেই দেখা যাচ্ছে ওর ঘর। তখনই রাস্তা আটকে দাঁড়াল ওরা, রাবেয়া বলল-“আমাদের মা বেটিকে যেতে দাও, ভুখা আমরা।”
জুঁই ভয়ে কাঁপছে, কোনোক্রমে বলল- মা।
দলটার ধর্ম বোঝা যাচ্ছেনা, কোনো চিহ্ন নেই, প্রতীক নেই, পতাকা নেই। ওদের মধ্যে একজন বলল- তোমরাও দেখছি আমাদের মতই বোকা, মানবতাকে এখনো ধর্ম ভাবো, আমাদের আর এই হিংসের পৃথিবীতে জায়গা নেই। আমাদের সাথে চলো, আমরা অনন্তের দিকে পাড়ি দিচ্ছি, স্বর্গ-নরক নয়, জন্নত-জাহান্নুম নয়- নিরাকার অনন্ত। আমরা সূর্যকে সামনে রেখে চলেছি আদি উৎসের দিকে।।