রেকারিং ডেসিমাল

মায়ের বাবু গলদঘর্ম হয়ে অফিস থেকে এসে পড়লেন। ঘেমে ঝোল, তিতিবিরক্ত, একেবারে অস্থির। অফিসের গাড়ি এই অসময়ে পাওয়া যায়নি। তার ওপরে টেনশন। বউ ফোনে বলেছে হয়ত পায়ের হাড় ভেঙেছে।
ধুর বাবা। এই সবে পুজোর হইহই শেষ হয়েছে। ক্লান্তি মেখে অফিস যাওয়া। তার মধ্যে এইসব উটকো ঝামেলা পোষায়? চেঁচামেচি করতে করতেই সিঁড়ি দিয়ে ওঠা।
মা শাড়ি পড়ে রেডি হবার আগেই পুত্রের জন্য জলখাবার বানিয়ে রেখেছিলেন বাবা রে মা রে করতে করতে। তাড়াতাড়ি বউকে বললেন, বাবুকে খেতে দাও শিগগির।
বউ বকুনির আওয়াজ কানে রেখেই পরোটা তরকারি আর প্লেটের পাশে কাঁচা লঙ্কা নিয়ে হাজির।
খাওয়া সেরেই পুত্রের তাড়া, নামো নামো, এখুনি নামো।
মা যত বলেন, দাঁড়া বাবা ব্যথা আছে।
কে শোনে কার কথা।
শেষে বউমা ফিল্ডে নামলেন।
পেটের ভেতর পুচকের বয়স সাত মাস। ডাক্তার এত দিন বেড রেস্ট দিয়ে রেখেছিলেন। তাই বউমা ইদানীং লাফালাফি কিঞ্চিৎ কমিয়ে রেখেছেন নিজেকে সামলে সুমলে।
কিন্তু চোখের সামনে পেশেন্ট দেখেই হবু মায়ের ভিতরটা ডাক্তার মোডে চলে গেছে।
এবার গলাটা চড়ার দিকে যায়।
এত তাড়া দিলে এই খাড়া সিঁড়ি দিয়ে সাস্পেক্টেড ফ্র‍্যাকচার পা নিয়ে নামা যায় ?
মায়ের বাবু গিয়ে একটা ট্যাক্সি ডেকে আনো না।
— উফ আবার আনতে হবে কেন ?
— এত ব্যথা নিয়ে বড় রাস্তা অব্ধি গলি পেরিয়ে যেতে পারবে না পেশেন্ট, তাই।
মা একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন বউ ত্রানকর্তা হয়ে লড়ে যেতে।
সত্যিই খুব ব্যথা লাগছে। কিন্তু এ বাড়িতে ” ব্যাটাছেলে “দের চোটপাট প্রবল। মেয়েদের কষ্ট যন্ত্রণা এসব গর্জনের প্রাবল্যে উড়ে যায়। সেগুলো গিলে ফেলতেই হয় জোর করে।
আজ একটা জোরদার গলা পাশে পেয়ে শ্বাশুড়ি ব্যথা সহ্য করে পা টেনে চলা থেকে রেহাই পেয়ে একটু স্বস্তি পেলেন। এক পা এক পা করে সিঁড়ির দেয়াল ধরে নেমে নিচের সরু প্যাসেজ দিয়ে গলির মুখে এসে দেয়ালে ঠেসান দিয়ে দাঁড়ালেন কোন রকমে।
বউমার বর ততক্ষণে ট্যাক্সি নিয়ে গলিতে ঢুকে পড়েছেন। গলির মাঝামাঝিতে বাঁদিকে ঘোরার একটা বাঁক। সেইখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ছেলে ডাকতে থাকে, এসো এসো।
মা করুণ মুছে বউয়ের দিকে তাকান। অনেকখানি হাঁটা।
নতুন বউ চেঁচিয়ে বলে, ঘুরিয়ে আনো গাড়িটা বাড়ির সামনে এখানে।
বর ও চেঁচায়, অত ঘোরানো যাবে না।
বউ ফের চেঁচায়, না মা অতখানি পারবে না যেতে। যদি ফ্র‍্যাকচার হয় হাড় সরে যাবে কিন্তু।
এ রকম ডাক্তারি থ্রেট খেয়ে কটমট করে তাকিয়ে অবশেষে কর্তা ট্যাক্সিওয়ালাকে বলে গাড়ি ঘুরিয়ে একেবারে সামনে এনে দাঁড় করায় ক্যাঁচ করে।
বাড়ির সবাই উৎকন্ঠায় থাকে বিকেল গড়িয়ে রাতের দিকে।
শ্বশুর অফিস থেকে ফিরে জলখাবার ইত্যাদি খেয়ে দাদু দিদার ঘরে বসে।
অবশেষে ফিরে এল মা আর ছেলে। মা খুব আস্তে আস্তে উঠছেন পিছনে। সামনে অফিসের সাদা শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে উঠছেন ছেলে। সঙ্গে হাঁক ডাক।
এই কাকি, শিগগির শোনো। মায়ের পা ভেঙে গেছে নিয়ে যাও ওপরে। উফ কি কান্ড!
বাপরে, এত কেন মোটা!
সব্বাই দৌড়ে সিঁড়ির মুখে চলে এসেছে ততক্ষণে।
ছোটরা জেঠির পাশে হাত ধরে তুলছে।
দিদা দেয়াল ধরে এগিয়ে আসছেন, কি হইল কি, বলতে বলতে।
মা এবারে উঠে বারান্দায় রাখা কাঠের ভারি চেয়ারে বসে হাঁফাচ্ছেন।
তারপর বউমাকে ডাক।
শোন শোন তোর বরের কথা। উফ বাবা, সারা ইইডিএফ আমায় কি গালি কি গালি রে মোটা বলে।
ছেলে হাউমাউ করে ওঠে।
হ্যাঁ, গালি দেবে না তো কি? মোটা কোথাকার। কি ভারি কি ভারি!!
হ্যাঁ! আমি হুইলচেয়ার করে এক্সরে অব্ধি নিয়ে যেতে ত গলদঘর্ম হয়ে গেলাম। হাতির মত চেহারা, আবার বলে মোটা বললি কেন?
মা অত ব্যথার মধ্যেও প্লাস্টার করা গোড়ালি নিয়ে কুলকুল করে হেসে চলেন ছেলের বকুনির তোড় দেখে।
বাড়ির বাকি সবার এতক্ষণের দুশ্চিন্তা ভেসে গেল হাসির স্রোতে।
যাক বাবা ঘরের মানুষ চিকিৎসা হয়ে ঘরে ফিরে এসেছে ত। বাকি সব সামলে নেওয়া যাবে।