বেনু মশলাঘর

মাঝরাতে প্রচণ্ড অস্থিরতা নিয়ে ঘুম ভাঙল শাহানা বেগমের। বুক ধড়ফড়। বয়স হলে শরীরটা শরীর থাকে না আর। কত যে উপসর্গ তার। কর যে অসুবিধা। বিরক্ত শাহানা বেগম উঠে পড়ল বিছানা ছেড়ে। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ল ওজু করে। অস্থিরতাটা কাটল না তবু। অনেকদিন হলো এমন হচ্ছে তার। টোটন এবার বিদেশ যাওয়ার পর থেকে প্রতি রাতে স্বপ্নটা দেখছে শাহানা বেগম। প্রতি রাতে প্রায় একই সময়ে স্বপ্নটা এসে হানা দিচ্ছে তার ঘুমে। বাকি রাতটা নির্ঘুম কাটছে নানান দুশ্চিন্তায়। ভিয়েতনামে গিয়ে শেষবার ফোন দিয়েছিল টোটন। তারপর যোগাযোগ করেনি আর। টোটন বলেছিল পরদিনই কম্বোডিয়ার পথে রওনা দেবে সে টিমের অন্য সদস্যদের সঙ্গে। সেখানে গিয়ে যোগাযোগ করবে আবার। শাহানা বেগম যেন চিন্তা না করে একদম। কিন্তু টোটন তো ‘চিন্তা করো না’ বলেই খালাস, শাহানা বেগমের মাতৃহৃদয় তো অত অল্পে বোঝে না। ডাঙায় তোলা মাছের মতো সে অনবরত তড়পায়। টোটনের সংবাদ না পেয়ে দুশ্চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে যায় তার। সন্তানের অমঙ্গল শঙ্কায় ছটফট করে। আর প্রতিরাতেই কোনো মতো একটু চোখ লেগে আসতেই স্বপ্নটা এসে ঘুম ভাঙিয়ে দেয় তার। বাড়িয়ে দেয় অস্থিরতা। স্বপ্নে টোটনকে পাঁচ-ছয় বছরের শিশুবয়সে ফিরতে দেখে শাহানা বেগম। নিজেকে দেখে মধ‍্যবয়সী। মার হাত ধরে হাঁটে টোটন। গন্তব্য বোঝা যায় না ভালো। শাহানা বেগম টোটনকে নিয়ে নির্জন একটা পথ ধরে হেঁটে যায়। কেমন ছায়া ছায়া জায়গাটা। অন্ধকার। কারা যেন দূর থেকে কথা বলে। অস্পষ্ট কানে আসে তাদের কথাগুলো। টোটন ভয় পায়। শাহানা বেগমকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সে। কিসের শব্দ মা? কারা কথা বলে? -ভয়ার্ত কণ্ঠে জিগ্যেস করে টোটন। টোটনের কণ্ঠ আর দূরের অস্পষ্ট আওয়াজ ছাপিয়ে হঠাৎ গমগম আওয়াজ তুলে ভীষণ শব্দে একটা ট্রেনকে পাশ কাটিয়ে যেতে দেখে শাহানা বেগম। টোটন ভয়ে চোখ বন্ধ করে মাকে জড়িয়ে ধরে প্রাণপণে। ট্রেনটা বিকট শব্দ করে থেমে যায় তখন। ভীষণ লম্বা ট্রেনটা আঁকাবাঁকা শরীর নিয়ে থেমে যেতেই কাছের বগিটার দরজা খুলে যায় হুট করে। বিচিত্র মুখোশ পরা একটা মুখ বকের মতো গলা বের করে ইশারায় টোটনকে ডাকে। টোটন ইতস্তত করে প্রথমটায়। তারপর কী হয় তার, বুঝতে পারে না শাহানা বেগম। হঠাৎ সে শাহানা বেগমের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে যায় ট্রেনটার দিকে। মুখোশ পরা লোকটার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় টোটন। আর বিচিত্র মুখোশের সেই লোকটাও তখনই তার হাত ধরে উঠিয়ে নেয় ট্রেনে। তিলমাত্র দেরি না করে ট্রেনটা তুমুল শব্দ তুলে ছুট লাগায় শাহানা বেগমকে থোড়াই কেয়ার করে। শাহানা বেগম চিৎকার করে। গলা ছেড়ে ‘টোটন’ ‘টোটন’ বলে ডাকে। কিন্তু কোনো শব্দ বের হয় না গলা থেকে। ভীষণ মানসিক যন্ত্রণায় শাহানা বেগম ছটফট করে। কাঁদে। আতঙ্কে অস্থির হয়ে ট্রেনটার পেছনে ছোটে পাগলের মতো। আর তখনই ঘুমটা ভেঙে যায় তার। বাকি রাতটা কাটে নির্ঘুম। টোটন এবার বিদেশ যাওয়ার পর থেকেই এই একই স্বপ্ন প্রতিদিন দেখছে সে। দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরছে তাকে। এই স্বপ্ন কেন দেখছে সে প্রতিদিন, এর অর্থই বা কী, ভেবে কিছুতেই কূল পায় না শাহানা বেগম। দুশ্চিন্তায় গলা শুকিয়ে আসে, বুক ধড়ফড় করে। কেন আর যোগাযোগ করছে না টোটন? কোথায় হাওয়া হয়ে গেল সে? টোটনের ভিয়েতনামের নাম্বারটা বন্ধ। বলেছিল কম্বোডিয়া গিয়ে নতুন নাম্বার নিয়ে ফোন দেবে সে পরদিন। তাহলে কেন সে ফোন করল না আর? এমন তো হয় না কোনোদিন! দেশের বাইরে টোটন প্রতিবছরই যায়। বছরে একাধিকবার কাজে-অকাজে দেশের সীমা পার হতে হয় তাকে। কিন্তু শাহানা বেগমের সঙ্গে কখনও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় না সে। মা অন্তপ্রাণ ছেলে শাহানা বেগমের। মা কষ্ট পাবে এমন কোনো কাজ সে করে না পারতপক্ষে। তাহলে কেন সে ফোন করে না মাকে? আর এই স্বপ্নই বা কেন দেখে প্রতিদিন শাহানা বেগম? ভাবনাটা পাগল করে তোলে শাহানা বেগমকে। টোটনের খবর জানার জন্য উথালপাথাল করে মন। রাতটা কোনোমতো কাটিয়ে খুব ভোরে বড়ছেলে রতনকে ফোন দেয় সে। রতন তখনও ঘুমে। অনেকক্ষণ বাজার পর ফোন ধরল সে। ঘুম-ঘুম ভারীগলায় বলল, হ‍্যালো আম্মু, বলো।
বাবা রে, টোটনের তো কোনো খবর পাই না এখনো। কী করব বলতো। চিন্তায় তো রাতে ঘুমাতে পারি না আমি। -শাহানা বেগমের কণ্ঠে কান্না উপচে পড়ে। উদ্বেগ ঝরে।
ও হয়তো কোনো কাজে ব‍্যস্ত আছে মা। ফ্রি হয়ে নিশ্চয়ই ফোন করবে। তুমি চিন্তা করো না। টোটন ভালো আছে।
না বাবা। আমার মনটা ভীষণ অস্থির হয়ে আছে। প্রতিদিন একই খারাপ স্বপ্ন দেখছি। তুই একবার খোঁজ নে তো বাবা। কী এমন ব‍্যস্ততা টোটনের যে একটা ফোন করার সময় পর্যন্ত পাচ্ছে না। কত তো বাইরে যায় টোটন, কখনও এমন তো করে না সে। আমার মন আর মানছে না। মনে হচ্ছে ওর কোনো বিপদ হয়েছে। তুই ওর খোঁজ নে রতন।
আচ্ছা মা। তুমি চিন্তা করো না। আমি খোঁজ নিচ্ছি।
ফোনটা রেখে বিছানা ছাড়ল রতন। গুম হয়ে বসে থাকল কিছুক্ষণ। টোটনকে নিয়ে তারও চিন্তা কম নয়। সত্যিই এমন কখনও করে না টোটন। তার দায়িত্বজ্ঞান বরাবর সবার চেয়ে বেশি। তার পক্ষে এভাবে যোগাযোগ না করে থাকা স্বাভাবিক নয় মোটেই। রতন ভেতরে ভেতরে টোটনের খোঁজ নেয়ার চেষ্টা এ কয়দিনে কম করেনি। কিন্তু কোনোভাবেই টোটনের খোঁজ পাচ্ছে না সে। সম্ভাব‍্য সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেও লাভ হয়নি কোনো। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো টোটনের যাদের সঙ্গে ওঠা-বসা তাদের কাউকেই প্রায় চেনে না সে। কিন্তু মাকে এসব বলা যায় না। তাতে আরো দুশ্চিন্তা করবে মা, অসুস্থ হয়ে যাবে আরও। দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে পড়ল রতন। যেভাবেই হোক টোটনের খোঁজ তাকে বের করতেই হবে। পাগল ভাইটা তার। কোথায়, কোন সুদূরে সে আছে, কেমন আছে, কে জানে! হঠাৎ ভাবনাটা মাথায় উঁকি দেয় রতনের। যদি মার আশঙ্কাই সত্যি হয়! যদি সত্যিই কোনো বিপদে পড়ে টোটন! আর ভাবতে পারে না রতন। আল্লাহ! আমার পাগলা ভাইটাকে তুমি ভালো রেখ! -বিড়বিড় করে সে।