আমার মেয়েবেলা

আমাদের জীবনে প্রত্যেকেরই একটা লুকানো “আমি” থাকে। সেই আমিটা কোনও সময় হয় একদম এলোমেলো,,, ঠিক যেন নিজের মতো, ছটফটে ছন্নছাড়া,,, অবাধ্য,,,, অসভ্য,,,,, আবার অসম্ভব ভাল,,, শান্ত,, সৎ।
কখনও আবার নিষিদ্ধ গোপন খেলায় ভেসে যাওয়া বেরঙিন স্বাধীন একটা বাউন্ডেলে,,,
সেই আমি,,, যে কিনা বিনা শর্তে আমার সব অপরাধ ক্ষমা করে। আমার গোপন লুকোনো পাপগুলোকে
লুকিয়ে রাখে,,আমার কলঙ্কগুলোকে পরম পশ্রয় মিশ্রিত আদর ভালোবাসায় ঢেকে রাখে।
আগলে রাখে, আমার সমস্থ কুকর্ম কে,,,
যে আমাকে কখনও ঘৃণা করে না। লুকানো কিছু ব্যথা সামলে জড়িয়ে থাকে,, ভরসা জোগায়,,, জড়তা বিহীন মেকিহীন একটা আমি।
সেই আমিটার কাঁধে ভাঙা গড়ার প্রতিশ্রুতির কোনও
দায়বদ্ধতা থাকে না । সমাজ সংস্কারের
আবদ্ধতায় সে বাঁধা পড়ে না কখনও । কথা রাখা না রাখার বাধ্যবাধকতার নিয়ম অন্তত তার জন্যে খাটে না।
চতুর্দশীর অন্ধকারেও সে যেন পূর্ণিমার চাঁদ ।
পাহাড়ি ঝর্না কিংবা শ্যাওলা ধরা বেরঙিন ঘর গেরস্থালির স্যাঁতস্যেঁতে জীবনে সে যেন সূর্যের প্রথম হলুদ আলো।
সবার মতো আমার ভেতরেও এমনই একটা আমি ছিল, সে ছিল সৎ,, অসম্ভব জেদী,,, স্বাধীন,,একনিষ্ঠ প্রেমিকা,, এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা,,
সেও থাকত গোপনে,, আদরে। একদম আমার মনের খাঁজে সুরক্ষিত ।
এই আমিটা কে নিয়ে আমার একটা অসম্ভব ভালোলাগা ছিল। কাউকে না জানানোর একটা অহংকার ছিল। কখনও একাকিত্বে মন ভারি হলে বসতাম শীতল পাটি পেতে এই আমিটার কাছে।
কীভাবে যে মনটা ভাল হয়ে যেত !
কোনও দিন অসম্ভব মন খারাপেও কোনও বন্ধুর দরজায় কড়া নাড়িনি। আজও সেই আমিটা আছে কিন্তু ।আমার মধ্যে,, হয়তো আমাদের সবার মধ্যে তেমন ভাবেই,,,
আগেও বলেছি আমার মেয়েবেলায় একটা ঝকঝকে সকাল ছিল। ভীষণ ভাবে মন ভাল করার একটা সকাল।।
অত্যন্ত সাধারণ একটা জীবন ছিল আমার।সাধারণ পরিবার,, সাধারণ স্কুল, সাধারণ কোয়ার্টার। সাধারণ জীবন যাপনের মধ্যেও যেন অসাধারণ ভালোলাগা নিয়ে ঘুরতাম। তবে এতসব সাধারণ হলেও আমার বাবা মা কিন্তু মোটেও সাধারণ ছিল না। ছিল না আমার ভাইও।। অসাধারণ মানুষ ছিল তিনজনেই। আজ এই বয়সে এসে ওদের চরিত্র গুলোকে বিশ্লষণ করলে বুঝতে পারি।
ফরাক্কা ব্যারেজ তখন একটু একটু করে সেজে উঠছে। ফরাক্কার পরিচিতি বাড়ছে ,,,
ট্রেন বাস একটু একটু করে ফরাক্কাকে চিনছে। স্টেশনে,, স্ট্যান্ডে দাঁড়াচ্ছে বেশিক্ষণ। ট্রেন দাঁড়ালেও বেশিরভাগ মেল ট্রেন তখন দাঁড়াত না। ফরাক্কা ফার্স্ট প্যাসেঞ্জার,, বারহাড়োয়া প্যাসেঞ্জার । দার্জিলিং মেল। এসব ট্রেন ই ছিল আমাদের ভরসা।
তবে অত ট্রেন ফ্রেন
নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। কারণ তখন আমার ট্রেনে চড়াই হত না। দাদুর বাড়ি ছিল রঘুনাথগঞ্জ । আর মামার বাড়ি ছিল বহরমপুর । বাসেই যেতাম বমি করতে করতে। ট্রেনে তখন চড়া হত কই?
কিন্তু ট্রেনে না চড়লেও ট্রেনের আওয়াজটা কিন্তু দারুণ লাগত। ব্যারেজ থেকে স্টেশন ছিল মাত্র চার কিলোমিটার। গঙ্গা পেরোলেই স্টেশন। আর যেহেতু আমরা গঙ্গার ধারের খুব কাছেই ছিলাম তাই খুব ভোরে কিংবা বিকেলে,, বা একটু শুনশান রাতে ট্রেনের আওয়াজ বেশ ভালই শোনা যেত।
আমি একটু বেশি রাত পর্যন্ত জাগতাম। বরাবরই আমার রাত ভাল লাগে। রাতের নিস্তব্ধতায় অনেক শব্দ খুঁজে পেতাম আমি। গানের মাস্টার মশাই প্রতিদিন আসতেন। রাত আটটা নটা থেকে শুরু হত আমার গান। কোনও দিন বেহাগ তো কোনও দিন টোড়ি,, কোনও দিন মালকোষের মূর্ছনায় মনটা হুহু করে উঠত। একবার রাগ বসন্ত্ শিখছি। বেশ কঠিন। মাস্টারমশাই ঠিক স্যাটিসফাই হচ্ছেন না। বার বার বলছে ভুলে যাস না তুই বসন্ত্ গাইছিস। মনে ভাব আন। প্রেম আন মনে। প্রেম কথাটা শুনেই কি লজ্জা পেয়ে গেলাম আমি। তখন প্রেম কথাটা শোনা বা বলা আমার কাছে বিরাট ব্যাপার। মাস্টারমশাই বলে কি??? গান শেখাতে শেখাতে পাগল হয়ে গেল নাকি? তখন আমি চতুর্দশী,,, তখন আমি ভীত,, সন্ত্রস্ত,,,মনে একটা ভালোলাগা আসছে,, কিন্তু সেটাকে কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে পারছি না। মা সারাক্ষণ পাহারায়,,, ছাল ছাড়িয়ে নেবে একেবারে। বলে কী,, প্রেম!!!
বাবা বাগানে মাদুর পেতে শুয়ে পা নাচিয়ে নাচিয়ে গান শুনছে। আগুনে ঘি দেওয়ার মতো বলে উঠল একদম কিচ্ছু হচ্ছে না। মন নেই গানে।
মন নেই মানে ইয়ার্কি নাকি? মা শুনলেই কান একেবারে ছিঁড়ে নেবে।। মাস্টারমশাই কে আসতে আসতে বললাম খুব পেটে ব্যথা করছে।।
উফ্ সে যাত্রায় একটা মিথ্যে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল।
তো যা বলছিলাম প্রতিদিনই আমার গান
চলত রাত এগারোটা সারে এগারোটা পর্যন্ত। তাও মা এসে এক একদিন বলত মাস্টার মশাই অনেক রাত হয়ে গেছে।। তবে ছাড়া পেতাম।
তারপর খাওয়া দাওয়া সেরে অনেকটাই রাত হত। আমরা একসঙ্গে খেতে বসতাম। বাবা ওঁর ছেলেবেলার গল্প,,, বাড়ির গল্প বলত। বাবারা পাঁচ ভাই দুই বোন। ভরা সংসার একেবারে জমজমাট বলা যায়। আমার বাবা কাকা জ্যেঠু রা প্রচন্ড গল্প করতে ভালবাসত। রাতে খাওয়ার সময় জোর গল্প হোত। শেষ পাতে রুটির সঙ্গে গুড় চলছে। তরকারি সব শেষ । গল্প হচ্ছে আর রুটি খাওয়া চলছে। কোনও গোণাগুন্তি করে রুটি খাওয়া হত না কিন্তু । গল্প জমলে রুটি খাওয়া বেশি হবে।। এত মজার মজার গল্প হত। হাসতে হাসতে পেটে ব্যথা হয়ে যেত।
চাকরির সুবাদে বাবার ফরাক্কায় আসা।।
তো যাইহোক রঘুনাথগঞ্জের গল্প এখানেও চলত। আমি ভাই মা হেসে কুল পেতাম না। বাবার হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। আমারও। একটু হাসলেই চোখে জল এসে যায়। বাবা হাসতে হাসতে চোখের জল লুঙ্গিতে মুছত। আমি বাবার পাশেই বসতাম। কখনও উঠে দাঁড়িয়ে আমার জামা দিয়ে বা হাত দিয়ে বাবার চোখ মুছিয়ে দিতাম।। খেয়ে উঠতে উঠতে বেশ রাতই হয়ে যেত।
তারপর স্কুলের টুকটাক বাকি পড়া শেষ করে আমি ডাইরি লিখতে বসতাম। খুব ভাল লাগত ডাইরি লিখতে। সারাদিনের সুখ দুঃখের কথা জমা থাকত এই ডাইরি পাতাতে ।
নিশুতি রাত,,, চারিদিক নিস্তব্ধতার মাঝেও কত শব্দ কত কথায় ভরে থাকতাম আমি। কোনও ফোন নেই, কোনও গান শোনা নেই ফেস বুক নেই, হোয়াটস অ্যাপ ম্যাসেঞ্জার কিচ্ছু নেই। তবুও আমি ভরে থাকতাম ,,, আমার সঙ্গে ।
জানালা দিয়ে ফুলের গন্ধে ঘরটা তখন কেমন মোহময় হয়ে উঠত।
ভেতরের বড়ো ঘরটায় দুটো সিঙ্গল খাটে একটাতে আমি আর একটা তে ভাই শুতাম। পাশের ঘরে বাবা মা। এই সময় টা আমি যেন নিজের মতো করে বাঁচতাম। অনেক রাতে ট্রেনের আওয়াজ পেতাম। কোন সময় কোন ট্রেন আসবে আগে থেকেই জানতাম। বাবার কাছে ট্রেনের নাম, টাইমিং সব জেনে নিয়েছিলাম।
ট্রেন আসার আগেই কান খাড়া করে রাখতাম। নির্দিষ্ট সময়ে ইঞ্জিনের হুশ্ হুশ্ হুশ্ শব্দে ট্রেনটা থামত। আমি বুঝতে পারতাম ,,, তারপর কুউউউউউ ঝিক ঝিক ঝিক করে আস্তে আস্তে ট্রেনটা চলতে শুরু করত।। দার্জিলিং মেল। অনেক রাতে আসত।
তখন মনে হত ট্রেনটাকে একবার ছুঁয়ে আসি। দৌড় লাগাই,,, একা নির্জন রাস্তায় দৌড়ব,,, হাঁফাতে হাঁফাতে ট্রেনটা তে চেপে বসব,,,,
তখন ভূগোল বই তে পাহাড় এর কথা পড়ছি। মনে মনে একটা আইডিয়া করছি। কিন্তু যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করলেও দেখতাম না। কারণ দার্জিলিং হল শুধু স্বপ্নের একটা দেশ। ওটা কী আমার মত এমন সাধারণের জন্য? তবুও মনে হত চলেই যাই দার্জিলিং,,, দেখে তো আসি পাহাড়,,, বাস্তবে কেমন হয় আসলে?
####
ফরাক্কায় তখন খুব শিল পড়ত। আমাদের উঠোন, বাগান সব সাদা হয়ে থাকত বরফে। আমরা দল বেঁধে ছুটোছুটি করে শিল কুড়োতাম। হাতে একমুঠো বরফ এনে বাবাকে দেখিয়ে বলতাম,, দেখ বাবা কত বরফ! বাগানটা দেখিয়ে বলতাম দার্জিলিং এর মতো তাই না বাবা?
শিল কুড়িয়ে আমরা বাটির মধ্যে,, গ্লাসের মধ্যে রাখতাম। তারপর একটা পাতলা কাপড় নিয়ে বাটি বা গ্লাসটাকে মুড়িয়ে বেঁধে রাখতাম। কিছুক্ষণ পর কাপড়টা খুলে উল্টো করে ঝাঁকাতাম। দারুণ একটা বরফের গ্লাস,,,
বরফের ছোট্ট বাটি তৈরি হত। একটা ডিশের উপর বরফের গ্লাস,, বাটি রেখে বন্ধুরা মিলে দেখা দেখি করতাম। কার বরফের গ্লাস টা সবথেকে ভাল হয়েছে। তখন আমাদের কারোর বাড়িতেই ফ্রিজ ছিল না। বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে বসে আমরা সবাই বরফ খেতাম। কি ঠান্ডা জল! এমন ঠান্ডা জল তো সারা বছর খেতেই পেতাম না। তাই শিল পড়লেই বাটি ঘটি যা হাতের কাছে পেতাম উঠোনে,, বাগানে বসিয়ে দিতাম। কিছুক্ষণ পর বাগানের বরফ,, জল হয়ে যেত।।
তারপর পাড়ায় বেরোতাম আম কুড়োতে। আম গাছের তলায় অনেক ছোট্ট ছোট্ট আম পড়ে থাকত। সবাই মিলে খোসা ছাড়িয়ে নুন দিয়ে বেশ রসিয়ে রসিয়ে খেতাম।
আমার মেয়েবেলা প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত ছিল রঙিন। সব কিছুর মধ্যেই আনন্দ খুঁজে নিতাম। ঘড়ির কাঁটার সময় গুলো যেন ছিল জীবন্ত ।। গ্রীষ্ম বর্ষা কোনও ঋতু তেই কখনও খারাপ লাগা ছিল না। যেমন ভাবে আনন্দে বর্ষা কাটিয়েছি। তেমন ভাবেই শীত। ধুলো বালি মাখা আমরা ছিলাম মাটির অত্যন্ত কাছে। কোনও দিন বাবা মা বলে নি বৃষ্টিতে ভিজিস না শরীর খারাপ হবে। জ্বর হবে। আরে দূর আমাদের কিছুই হত না। সারা জীবনে মোটে একবার জ্বর হয়েছিল। প্রায় এক মাস। আমাদের সময়ে জ্বর মানেই ভাত বন্ধ। উফ্ কী যে কষ্ট পেয়েছিলাম! ভাত খেতে খুব ভালোবাসি।। একটু ভাত ডাল আর পেঁয়াজ ভাজা দিয়ে মাখা আলুসেদ্ধ। আর কি চাই জীবনে?
ক্ষিদে যে কী তা স্বচক্ষে দেখেছিলাম কলকাতায়।
আমি তখন সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ল পড়ি। রাজা বাজারে প্রতাপ মঞ্চের পাশে একটা হোস্টেলে থাকি। কলেজে হেঁটেই যাতায়াত করতাম। একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে দেখছি একটা কাল নোংরা ধুলোবালি মাখা, কম্বল গায়ে দেওয়া লোক রাস্তার ডাস্টবিন থেকে একটা একটা করে ভাত কুড়িয়ে কুড়িয়ে খাচ্ছে। উফ্ কোন দিন ভুলতে পারব না সেই দৃশ্য। হোস্টেল এ ফিরে এসে সেদিন খুব কেঁদেছিলাম। আসলে আমি দশ মিনিট ওখানে দাঁড়িয়ে লোকটার নোংরা থেকে খুঁজে খুঁজে ভাত খাওয়া দেখেছিলাম। ওর পাশে দুটো কুকুর ও খুঁজে খুঁজে কি সব খাচ্ছে।। ভগবান কে বলে ছিলাম একে বাঁচিয়ে রাখা কেন? হয় ভাল ভাবে রাখ, নয়তো মেরে ফেল।।
তারপর থেকে আমি খেতে গিয়ে একটা ভাতও যদি মাটিতে পরে, তুলে খাই।। খাওয়ার সময় আমি মনে মনে প্রণাম করি সেই বিশ্বজগত সংসারের মালিক,, দয়াময় ঈশ্বর কে ,,,, যাঁর দয়ায় আমার সুস্থ ভাবে দুটো ভাত অন্তত জুটছে। ঐ লোকটির মতো আমাকে নোংরা থেকে কুড়িয়ে ভাত খেতে হচ্ছে না।। আমি ধন্যবাদ জানাই,,, প্রণাম জানাই সেই সর্ব শক্তিমান ঈশ্বর কে। প্রণাম জানাই। প্রণাম জানাই,, প্রণাম জানাই।
গীতার একটা শ্লোক মনে পড়ে গেল,,,,,
যেখানে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণ কে বলছেন,,,,
বায়ুর্যমোহগ্নির্বরুণঃ শশাঙ্কঃ
প্রজাপতিস্ত্বং প্রপিতামহশ্চ।
নমো নমস্তেহস্তু সহস্রকৃত্বঃ
পুনশ্চ ভূয়োহপি নমো নমস্তে।।
শ্রীমদ্ ভগবদ্ গীতা ,, একাদশ অধ্যায়। বিশ্বরূপদর্শনযোগ
শ্লোক –৩৯,,,
অর্জুন বলছেন,,,,
(আপনি বায়ু,যম,অগ্নি, বরুণ,চন্দ্র ;
আপনি প্রজাপতি ব্রহ্মা এবং ব্রহ্মারও পিতা।
আপনাকে সহস্রবার প্রণাম করি। আপনাকে পুনরায় প্রণাম করি। আপনাকে বারবার প্রণাম করি।)

 ক্রমশ…