শিবজীর শিবরাত্রি

দুদিন আগে নারী দিবস গেছে। আমাদের শিবজী যে স্ত্রী কে কতটা ভালোবাসতেন সেটার প্রমাণ উনি সতী তাঁর অপমানে প্রাণ ত্যাগ করার পর দুনিয়া লন্ডভন্ড করে বুঝিয়ে দিয়েছেন।
এমনকি সতী যখন তার কথার অমান্য করে শ্বশুর মশাই দক্ষের যজ্ঞে উপস্থিত হলেন, উনি আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, যে কাজটার ফল ভালো না ও হতে পারে, কিন্তু বাধা দেননি। তিনি দেবাদিদেব মহাদেব, তিনি বাধা দিলে সতীর কি সাধ্য যে তা টপকে আসেন? কিন্তু না স্ত্রী কে অঙ্গুলি হেলনে নাচাতে তিনি চান না, স্ত্রী তো একজন স্বয়ং সম্পূর্ণ মানুষ। তার ইচ্ছে অনিচ্ছেকে কে উনি সম্মান করেন।
সে তো গেল একটা এপিসোড। এছাড়া তিনি আশুতোষ কি সাধে, সামান্য একটু জল তার মাথায় দিলেই তিনি প্রসন্ন। এমনকি তিনি ভন্ডামি মোটেই পছন্দ করেন না। তাই তাঁর যেমন ভালো লাগে তেমন থাকেন, দেখনদারি তে মোটেই বিশ্বাসী নন। আর ডাউন টু আর্থ ও বটে। তাই রাজার মেয়েকে বিয়ে করেও তিনি তাঁর নিজস্ব ভাবধারাই বজায় রাখেন। আজকালকার ছেলেদের মত শ্বশুর বাড়ির মত হাবভাব মোটেই ফুটিয়ে তোলেন না।
যেন এভাবে প্রেমের সঠিক বার্তাটাই দেন, “কেউ তোমায় ভালোবাসলে, তুমি যেমন, তোমাকে তেমনই ভালো বাসবে, বদলে নয়।” আর সতী তো তেমনই তাঁকে ভালোবাসতেন।
তো এবার শিবরাত্রির আগে থেকেই শিব ভীষণ চিন্তিত। সতী যাবার পর তার একাকীত্ব কাটাতে পার্বতী এলেন বটে, কিন্তু তিনি যেন বড্ড বেশি ঘরোয়া। তাই সব, মানে ওই তিন ধামের সব দিকে নজর রাখতে গিয়ে সংসার সামলাতে তাঁর একটু প্রেসারটা বেড়েছে। ধন্বন্তরী বলেছেন মা কে যত্নে থাকতে, নো টেনশন, নো ভাবনা। আর সময় মত খাওয়া মাস্ট।
ত্রিভুবনের সবাইকে খাইয়ে, নন্দী ভৃঙ্গি,ভূত প্রেত সবার দিকে তার সমান নজর রেখে তবে তিনি নিজে। এই করতে গিয়ে প্রায় দিনই অবেলায় খাওয়া। এতে মায়ের গ্যাসট্রিকের সমস্যা ও বেড়েছে। তারপর করোনা কালে মানুষের এত দুঃখ দেখে মা একটু ডিপ্রেসড ও ছিলেন। মোটের ওপর ভালো নেই।
তাই শিবজী আগে থেকেই বলে ছিলেন, “আমার নাম করে ওসব উপোস টুপোস করা চলবে না”। তাছাড়া নারী দিবসে বাবা, মা কে পুরো রেস্ট দিয়ে, ত্রিভুবন একাই সামলে ছিলেন। এমনকি সেদিন সরস্বতী, লক্ষ্মীর ও ছুটি। সেদিন ও দিক গুলোও গণেশ, কার্তিক দুই ভাই মিলে সামলেছে।
কিন্তু কে শোনে কার কথা, মা পার্বতী ওই শরীরেই করলেন উপোস! বাবা যতবার জিজ্ঞাসা করেন,”তুমি উপোস টুপোস করনি তো? ” ততো বারই মা এড়িয়ে যান। হয় বাবার গরম লাগছে বলে পাখা আনতে যান, নয়তো জল।
কিন্তু বাবা কে ফাঁকি দেওয়া কি মায়ের সাধ্য? ত্রিকালজ্ঞ বাবা ঠিক বুঝেছেন, মা তাকে এড়িয়ে আবার আজ উপোস করেছেন। বাবা মনে মনে মুচকি হাসেন।
হঠাৎ দুপুরের একটু আগে আগেই বাবার পেটে ব্যথা। ওরে বাবা! সে কি ব্যথা! বাবা প্রায় কেঁপে কেঁপে ওঠেন যন্ত্রনায়। আবার এলেন বদ্যি মশাই, নাড়ী টিপে, চোখ উল্টো, অ্যা….. করে জিভ দেখেও তো কিছু বুঝতে পারছেন না। এমনিতে বাবার দারুণ ইমিউনিটি! অসুখ তো হবার কথা নয়। তবু তিন রকম পাঁচন করে সময়ে সময়ে খাওয়াতে বলে, পার্বতী কে সব বুঝিয়ে চিন্তিত মুখে বিদায় নিলেন বৃদ্ধ। তার বিদ্যে ও তো ফেল! তিনি ওষুধ দিলেন বটে, কিন্তু রোগ ই তো ধরতে পারেন নি। ওই আন্দাজ করেই দিতে হল!
দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। লক্ষ্মী আর সরস্বতী একমুঠো ভাতে ভাত কোনো রকমে ফুটিয়ে নিয়েছে। হেড অফ দ্য ফ্যামিলি ভালো না থাকলে কার আর ভালো লাগে?
তখন বেলা প্রায় মর্ত্যের সময় অনুযায়ী তিনটে। বাবা হঠাৎই কাতরানি থামিয়ে উঠে বসলেন। মা চমকে তাড়াতাড়ি বাবার কাছে এলেন, “কি গো, খুব শরীর খারাপ করছে? উঠে বসলে যে? “, চিন্তিত মা পার্বতী।
বাবা একটু হেসে বললেন, “যাও চতুর্দশী লেগে গেছে, এবার খেয়ে নাও! “, ” তোমার পেটে ব্যথা! “, মা তো হতবাক! ” ও তো এমনি”, শিবজী স্মিত হেসে ভুঁড়িতে হাত বোলান!
“মানে? “, মা এবার রেগে ওঠেন। রাগে মা পার্বতীর নাকের পাটা ফুলতে থাকে, ” সেই কখন থেকে পেটে ব্যথা, পেটে ব্যথা করে কাতরাচ্ছো, আর এখন বলছো এমনি! এর মানে টা কি? “,
” আরে প্রতি বার তুমি আমার জন্য, আমার ভালো চেয়ে উপোস করো, এবার তাই আমি ও করলাম উপোস,তোমার ভালো চেয়ে”,
শিবের কথায় মা রাগে, অভিমানে কেঁদে ফেলেন, ” এভাবে তুমি আমাকে ঠকিয়ে সারাটা দিন উপোস করলে! আমার এতে কষ্ট হয় না? “, মা আঁচলে নাক মোছেন, মায়ের মন বড্ড ভারি বাবার উপর অভিমানে।
শিবজী তার বাঘছাল পাতা পাথরের বিছানা থেকে নেমে মেঝেতে পার্বতীর পাশে বসলেন,মায়ের পিঠে অতি স্নেহে হাত রেখে বললেন,” আর তুমি যে প্রতি বছর করো, তাতে আমার খারাপ লাগে না! কারো ভালো চাইতে গেলে নিজেকে কষ্ট দিতে হবে কেন, পারু? “,
শিবজী অনেক দিন বাদ আবার মা কে, “পারু”, বলে ডাকলেন। মা চোখ মুছতে মুছতে বললেন,” তা হলে? “
“কেন? যদি তোমার অতই ইচ্ছে হয়, তো নিরামিষ খেতে পারো, কিন্তু একেবারে উপোস না। তুমি তো জানো তোমার শরীর ভালো না”, ” কিন্তু… “, মা পার্বতী কি একটা বলতে যান, বাবা শিব তাড়াতাড়ি মা এর কথা ঘোরানোর জন্য বলে ওঠেন, ” ওরে বাবা, কি খিদে পেয়েছে! কিছু খেতে দেবে তো না কি? “,
মা পার্বতী লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি যান ভোলে বাবার জন্য নৈবেদ্য আনতে!