কুঞ্জের ঠাকুমা

“বাইন্যা মরিচ ও বাইন্যা মরিচ … কি করতাস ?” নাতি নাতনীদের এ হেন সম্বোধনে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন এক আশী বছরের খুনখুনে বুড়ি; কুঞ্জের ঠাকুমা …
“বাইন্যা মরিচ তর বাপ; তর ঠাকুর্দা … আমারে একদম বাইন্যা মরিচ কবি না …বাইন্যা মরিচ কারে কস শুনি ?”
ছেলে ছোকরার দল আরও মজা পায় ; তারস্বরে চেঁচাতে থাকে ,” বাইন্যা মরিচ ও বাইন্যা মরিচ …” আর কুঞ্জের ঠাকুমা একটা লাঠি নিয়ে তেড়ে যায় ওদের মারতে …
বুড়ির সাত কুলে কেউ নাই …ওই এক কুঞ্জ ছাড়া … পরনে ময়লা সাদা থান, চোখের কোণায় পিচুটি, ফোকলা মুখে একগাল হাসি ,কদম ছাঁট চুল সব মিলিয়ে কুঞ্জের ঠাকুমা যেন পথের পাঁচালি বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা জলজ্যান্ত ইন্দির ঠাকুরণ…গ্রামের এক প্রান্তে মুখুজ্জেদের সাত পুরুষের পোড়ো ভিটে; তাতেই ঠাঁই হয়েছে নাতি -ঠাকমার … গাঁ শুদ্ধু লোক তাকে কুঞ্জের ঠাকুমা নামেই চেনে …বাপ মায়ের দেওয়া আলো রানী নামটা তিনি নিজেও প্রায় ভুলতে বসেছেন … আর ওই নামে তাকে ডাকবার আছেটাই বা কে শুনি ? ছিল এক কুঞ্জের ঠাকুদ্দা …জোয়ান সোমত্থ হরিদাস বাগদী ছিল, এই মুখুজ্জেদের বাড়ির নামকরা পাইক , যার নামে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেত !যৌবনে আলো রাণীর গায়ের রং ছিল চাপা শ্যাম বর্ণ কিন্তু গড়ন ছিল বড় সুডৌল ; এ নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে কম কথা শুনেছেন নাকি !যেমন কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন ইত্যাদি …ফর্সা হলেই কি তার নাম আলো হয় ?কালো মেয়ের চেহারায় যে অপরূপ শ্রী তা আলো রং নয় ?তা যাই হোক তার নিজের মানুষটা বড় ভালোবাসত তাকে… কথায় কথায় চোখে হারাত বড় বৌকে …সেসবও আজ কতযুগের কথা … এই মুখুজ্জে বাড়ির কত্তা রামলোচন মুখুজ্জে হরিদাসের কাজে খুশি হয়ে তার পরিবারকে থাকতে দিয়েছিলেন এই ভিটেতে..সেই থেকেই আলোরানী এ বাড়ির বাসিন্দা …তারপর গঙ্গা দিয়ে কত জল গড়িয়ে গেছে …কালের নিয়মে গত হয়েছেন রামলোচন মুখুজ্জে তার ছেলে যদু মুখুজ্জে … তার নাতি নাতনীরা পৈতৃক ভিটে আলো রানীর জিম্মায় ফেলে রেখে পাড়ি দিয়েছে সুদূর বিদেশে … আলোরানী ও এ ভিটে আগলে পড়ে আছেন কুঞ্জকে নিয়ে …
এখন কুঞ্জ ছাড়া তার সাত কুলে আর কেউ নেইও … সেই কত বছর আগে ভরা বর্ষায় মাঠের কাজ করতে গিয়ে সাপের কামড়ে মারা যায় তার একমাত্র ছেলে আলার … ছেলের শোকে কিছুদিন পরে আত্মঘাতী হয় কচি বউটাও… কুঞ্জ তখন সবে কোলের ছেলে … সেই থেকে আলোরানী কোলে পিঠে করে মানুষ করেন কুঞ্জকে … আর যক্ষিনী হয়ে সামলান এই পোড়ো ভিটে …
বাপের ধারা পেয়েছে কুঞ্জ । বাপের মতোই রোগা ভোগা দুবলা পাতলা মানুষ সে … মাঠের কাজে যায় ঠিকই… তবে কাজে তার মন নাই … কেমন উদাস উদাস ভাব …সময় পেলেই ফুঁ দেয় আড়বাঁশিতে …কারো সঙ্গে আশনাই আছে কিনা ঠিক বোঝা যায় না … তার যত গল্প ওই ঠাকমার সঙ্গে … কখনও ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে কখনও আবার খাওয়ার সময় পাখার বাতাস দিতে দিতে বৃদ্ধা আলোরানী গল্প করেন কুঞ্জের সঙ্গে …তিন ভুবনের গল্প … সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর গল্প…তার নিজের জেবনের গল্প…
তার বাপ ঠাকুদ্দার গল্প… এসব কথা আলোরাণী আর কাকেই বা বলবেন ওই এক কুঞ্জ ছাড়া ? তার আর আছেটাই বা কে ? কুঞ্জও যে সব সময় তার কথা শোনে এমন না ! তবে সে মুখে রা কাটে না … তার সব সময়েই কেমন আনমনা উদাস ভাব…আলোরাণী তাই নিজের মনে একাই বক বক করে যান … এ তার অভ্যাস !
গ্রামেরই মেয়ে বিন্তি… আলোরাণীদের পালটি ঘর … বিন্তির মা বিধুমুখী আলোরাণিকে পিসিমা পিসিমা করে খুব খাতির করে … মা সহজ সরল ভালো মানুষ হলে কি হবে … মেয়ে এক্কেবারে দস্যির গাছ ! গাছে ওঠা , ফুল চুরি করা , কাঁচা আম চুরি করে খাওয়া ,নদীতে ডুব সাঁতার হেন গেছোমি নেই যা বিন্তি করে না …এই যে পাড়ার ছেলে ছোকরা গুলোকে বাইন্যা মরিচ বলতে শেখানো এও বিন্তির কাজ … আর ওই মেয়ে যেমনি চোপায় তেমনি খোঁপায় … টরটরের একসা … আলোরাণীকে বলে কিনা … “এই বুড়ি তোমার তো সাত কুলে কেউ নাই…অসুস্থ হয়ে পড়লে তোমারে দ্যাখব কে শুনি ? আলোরানীও কম যান না … আকাশের দিকে আঙ্গুল তুলে বলেন যার কেউ নাই তার ভগমান আছেন … হুই তিনিই দ্যাখবেন … তুই যা তো নিজের কাজে … ম্যালা ফ্যাচ ফ্যাচ করিস না !
অথচ কুঞ্জের সঙ্গে যে কি ভাব মেয়েটার … বাড়ীতে ভালো মন্দ কিছু রান্না হলেই বাটি করে কুঞ্জ দা তোমার জন্যি নিয়ে এলুম করে লাফাতে লাফাতে হাজির হবে … কুঞ্জ আলাভোলা মানুষ …কিন্তু বিন্তির দস্যিপনা তার বেশ ভালোই লাগে ! বেলা শেষে গাছের ছায়ায় বসে সে যখন আড় বাঁশিতে ফুঁ দেয় বিন্তির মতো দস্যি মেয়েও এক্কেবারে চুপ… তার করুণ চোখ বেয়ে কি যেন এক মায়া নামে …আলোরাণীর চোখ এড়ায় না …মাঝে মাঝে তার মনে হয় দুটিতে মিল হলে বেশ হত ! কিন্তু একথা কুঞ্জের কাছে পাড়ার মত সাহস আর সাধ্য কোনটাই তার নেই… মনের ইচ্ছে মনেই চেপে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন আলোরাণী…
সেবার শ্রাবণ মাসে খুব বৃষ্টি হয়েছে …চাদ্দিক জল থই থই … পোড়ো মুখুজ্জেদের ভিটেও ভগ্ন দশা … চতুর্দিকে আগাছার জঙ্গল … এরই মধ্যে কুঞ্জ ধান বিক্কির করতে গঞ্জে গেছে দু দিনের জন্য …ঘরে তেমন কিছু নেই…আলোরানী গেছেন পুকুর পাড় থেকে কলমী শাক তুলে আনতে … বিন্তি ভাত বসিয়েছে …যাহোক দুটি শাক ভাত খাওয়া হবে … এমন সময়ে কাল কেউটে ছোবল মারে আলোরাণীকে …দাওয়ার কাছে এসে উঃ মাগো বলে পড়ে যান বৃদ্ধা …দৌড়ে আসে বিন্তি… সাপের কামড় বুঝতে পেরেই দড়ি দিয়ে দ্রুত বেঁধে ফেলে পা … পাঁজাকোলা করে আলোরানীকে নিয়ে যায় কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে … দু দিন পরে জ্ঞান ফেরে আলোরাণীর … দেখেন বিছানার কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে বিন্তি… আর পায়ের কাছে কুঞ্জ… ডাক্তার দিদি বিন্তিকে দেখিয়ে বলেন এর জন্য এযাত্রা বেঁচে গেলেন মা … আলোরানী খালি অস্ফুটে বলেন … যার কেউ নাই তার ভগমান আছেন …